মঙ্গলবার, অক্টোবর ২২

যতই কাঁদুক দুধের শিশু, ট্রাম্পের মনে অনেক ঘৃণা

শর্মিষ্ঠা গোস্বামী নিধারিয়া: ডোনাল্ড ট্রাম্প যে সুবক্তা, এমন কথা কেউ কোনওদিন বলেননি। তিনি প্রচুর কথা বলেন, আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলেন, অনেক শব্দ ব্যবহার করেন, যার অর্থ কেউ কোনওদিন খুঁজে পায়নি। ট্রাম্প মানবিকতার ধার ধারেন না। তাঁর টুইটার বা বক্তৃতাতেও  নানা অমানবিক শব্দ শোনা যায়। যেমন প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে প্রচার করার সময় তিন-চারটি কথা তাঁর মুখে খুবই শোনা যেত—দ্য ব্ল্যাক, দ্য মুসলিমস, দ্য গে। এবং দ্য হিসপ্যানিকস্। ট্রাম্পের মনে অনেক ঘৃণা। মূলত এই চার শ্রেণির জন্য। তাই তিনি তাঁদের  ‘দ্য’ বলে আলাদা শ্রেণিভুক্ত করে রেখেছেন।

এ বার ট্রাম্প বলেছেন, অভিবাসীরা আমেরিকায় পোকামাকড়ের মতো ছেয়ে যাচ্ছে। এই ‘পোকামাকড়ের’ মধ্যে রয়েছে অন্তত হাজার দুয়েক শিশু, যাদের মা-বাবার কাছ থেকে সীমান্তে আলাদা করে দিয়েছে ট্রাম্পের সৈনিকরা। এরই মধ্যে ট্রাম্পের এক বিশ্বস্ত সৈনিক ভারতীয় বংশোদ্ভুত নিকি হেলি আবার ঘোষণা করেছেন, রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার পরিষদ থেকে আমেরিকা নাম তুলে নিল!

ট্রাম্পের কাছ থেকে প্রত্যাশা কম। কিন্তু অবৈধ অভিবাসী ও শরণার্থীদের আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে আটকাতে তিনি যা করছেন, তা কার্যত হলোকাস্টের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। আমেরিকার দক্ষিণে সীমান্ত পেরোতে চাওয়া অবৈধ অভিবাসীদের কাছ থেকে তাঁদের সন্তানদের আলাদা করে দেওয়া হচ্ছে। মা-বাবার কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে তাদের আলাদা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বাচ্চাগুলো ‘মা’ ‘বাবা’ বলে আকুল হয়ে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ছে। সম্পূর্ণ অচেনা এক জগতে, অজানা ভাষায় কারা সব কথা বলছে, তাদের হাতে অস্ত্র, তাদের চোখের চাহনি কঠিন। মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত  তারা একটা দুনিয়া দেখেছে। জোর করে  ঘুম ভাঙিয়ে দেওয়ার পর তারা ছিটকে যাচ্ছে অন্য কোথাও। কারণ, তাদের বাবা-মায়েদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ডিটেনশন সেন্টারে। আমেরিকান ড্রিম দেখার চেষ্টা করার জন্য। বেআইনি ভাবে সীমান্ত পেরোনোর চেষ্টা করার জন্য।

এই সবের জন্যই রয়েছে ট্রাম্পের অভিবাসন সংক্রান্ত জ়িরো টলারেন্স নীতি। কান্নাকাটি করা বাচ্চাগুলোর ছবি আর ফুঁপিয়ে কান্নার ভিডিও প্রকাশ করে ইতিমধ্যেই মার্কিন প্রশাসনের কোপে রয়েছে প্রোপাবলিকা নামে সংবাদসংস্থা। আর এই সব ভিডিওর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রিপাবলিকানদের একাংশ। এই ব্যাপারে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে কড়া ভাষায় ঘৃণা উগরে দিয়েছেন হোমল্যান্ড সিকিওরিটির সচিব ক্রিস্টিনা নিয়েলসেন। যদিও সাংবাদিকরাও তাঁকে ছেড়ে কথা বলেননি। তবে এ সবের তোয়াক্কা কবেই বা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প!

এ সবের মধ্যে একটা ছোট্ট মেয়ের ছবি ঘুরছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। গোলাপি জ্যাকেট আর গোলাপি জুতো পরা বছর দুয়েকের ছোট্ট একটা মেয়ে আতঙ্কিত কান্না কান্না মুখে তাকিয়ে আছে তার পাশে দাঁড়ানো মায়ের দিকে। হন্ডুরাস থেকে আসা এই পরিবারকে জেরা করছে মার্কিন রক্ষীরা। এই ছবিটি তুলেছেন গেটি ইমেজেস-এর ফোটোগ্রাফার জন মুর। তাঁর বুক ভেঙে গেছে এই ছবি তুলতে গিয়ে। ট্রাম্পের বুক ভাঙে না, মন ভেজে না। কিন্তু এক মার্কিন দম্পতি একটি ফেসবুক পেজ খুলেছেন অভিবাসীদের সাহায্য করে এমন একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার জন্য। তাঁরা ভেবেছিলেন ১৫০০ ডলার তুলতে পারবেন। কিন্তু তিন দিনে ৫০ লক্ষ ডলার উঠেছে। সারা পৃথিবী থেকে অর্থ সাহায্য করেছেন ১ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষ।  ক্রাউডফান্ডিং-এর মাধ্য়মে ফেসবুকে এর আগে  এই পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ হয়নি।

কোনও দেশের নিরাপত্তা নিয়ে তার নিজস্ব নীতি থাকতেই পারে। সেই নীতিতে শরণার্থী ও অভিবাসীদের জায়গা থাকতে পারে, না-ও পারে। অবৈধ অভিবাসনের সমস্যা পৃথিবীর অনেক দেশেই আছে। কয়েক বছর আগে সিরিয়া সঙ্কট শুরু হওয়ার পর আমরা দেখেছি কী ভাবে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করা নৌকোবোঝাই শরণার্থীদের সলিলসমাধি হয়েছে।  মানবসভ্যতার এই মাপের সঙ্কটের সমাধানের জন্য যে ধরনের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন, দুর্ভাগ্যবশত তা নেই।

তুরস্কের সমুদ্রতীরে উপুড় হয়ে শোয়া ছোট্ট আলান কুর্দিকে মনে আছে?  বালিতে মুখ গোঁজা তার নিথর দেহের ছবিটা আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল সারা বিশ্বে। কিন্তু সিরিয়ার শরণার্থী সঙ্কট মিটেছে কি?

জন মুরের তোলা হন্ডুরাসের বছর দুয়েকের মেয়েটার কান্নামাখা মুখের ছবি ভাইরাল হয়েছে। ট্রাম্পের জিরো টলারেন্সের ভিত কি একটুও টলবে!

Leave A Reply