শিক্ষার শেষের সে দিন এখন মধ্যযামে

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

অরূপকুমার দাস

আমাদের ছোটবেলায় ক্যানসার রোগ সম্পর্কে মানুষের অসহায়তা এবং চিকিৎসাহীনতার কথা পড়তাম, শুনতাম। পরে সচেতনতাই নাকি প্রতিকারের পথ, এই জাতীয় প্রচার সামনে এল। রোগের বৃদ্ধি থেমে ছিল না। গত কয়েক  বছরে তার বৃদ্ধি বিধ্বংসী আকারে এগোচ্ছে শুনি। কিন্তু এখন যেটা ভয়ঙ্কর লাগে তা হল কীসে ক্যানসার হতে পারে, সে সম্পর্কে নতুন নতুন তত্ত্ব ও তথ্য সামনে আসায়। অলসতায়, বেশি খাওয়ায়, প্রস্রাব চেপে রাখায়, রেগে যাওয়ায়, নৈরাশ্যে, প্লাস্টিকের ধোঁয়ায়, এমনকী, মন খারাপ করে থাকার অতিরেক থেকেও নাকি ক্যানসার হতে পারে, এমনটাই শোনাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাঙ্গনগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, সেখানে যেন মানুষের জৈব-যাপনের কর্কট সহবাস দিন দিন স্থায়ী হয়ে চেপে বসছে। নানান মাত্রায় তা নতুন নতুন রোগ লক্ষণে আত্মপ্রকাশ করছে। কেমন তার নতুন প্রকাশগুলো? প্রাথমিক থেকে পিএইচডি – সর্বস্তরেই দেখা যাচ্ছে বিকার ও লালসার চরিতার্থতা, দিন দিন স্থায়ী হয়ে চেপে বসছে। স্বার্থে-স্বার্থে নির্লজ্জ দ্বন্দ্ব, দুর্নীতি, কর্তব্য না করে ব্যবসা-বুদ্ধিকে জীবনসত্য করে তোলা; ব্যাভিচার চরিতার্থতা – এসব সমাজব্যাধি শিক্ষাঙ্গনকে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরে পেড়ে ফেলতে চাইছে।

গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন জেলায় এমন বেশ কয়েকটা খবর সামনে এসেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে স্কুলের ছোট্ট পড়ুয়া (মেয়ে) শিক্ষকের যৌন লালসার শিকার হয়েছে। তার আগে এই প্রবণতার আগমনী ঘোষণা হয়েছিল সেই সব খবর এবং ছবিতে, যেখানে দেখা গিয়েছিল মদ্যপ মাস্টার অতিরিক্ত মদ বা অন্য নেশার ঘোরে স্কুলের পাশে রাস্তায় গড়াগড়ি দিচ্ছে – আর ছাত্রছাত্রীরা অসহায় ভাবে তা দেখছে এবং হাসছেও জড়ো হওয়া আমুদে মানুষদের সঙ্গে মাতাল-মাস্টারকে ঘিরে দাঁড়িয়ে!

আরও পড়ুন : ক্লাসঘরে প্যান-অপটিকন আর সিসিটিভি – একসঙ্গে চলে না যে 

মনে কু ডেকেছিল: স্কুলমাস্টারিতে কোন গলি দিয়ে ঢুকে পড়ল এমন পেঁচিমাতাল শ্রেণির একাংশ? যে পথ দিয়ে ঢুকেছে এরা, সে পথ আপাতঃ ভাবে সরল এবং সোজা হলেও, তা যে অন্ধকার পথ তা সামাজিক কানাঘুষোয় সবারই জানা। যেহেতু, ছয় থেকে বারোলাখি সে সব ‘গল্প’ লোকের মুখে মুখে প্রচারিত এবং প্রসারিত – তাই তা নিয়ে প্রামাণ্য গল্প লেখার মালমশলা কারও হাতেই আছে বলে শুনিনি!

স্কুলগুলোতে গত দু’দশকের কাছাকাছি সময়ে ‘মধ্যদিনের ভোজ’ (মিড ডে মিল) অন্য দুই মহা সমস্যার আগাছা বিষ-পার্থেনিয়াম নিয়ে হাজির হয়েছে। তা হল দুর্নীতি এবং আসল কাজ ‘শিক্ষাদান’ ভুলে যাওয়া ও ভুলিয়ে দেওয়া। মিড-ডে মিলে ছাত্র-ছাত্রীদের মাথা পিছু বরাদ্দ যৎসামান্য টাকা আত্মসাৎ, চাল-ডালের বস্তা লুকিয়ে বিক্রি করে দেওয়া, দ্রব্য না কিনে নকল হিসেব দিয়ে টাকা আত্মসাৎ – এসব শিক্ষক শ্রেণির একাংশকে তাদের সামাজিক সম্মান ভুলিয়ে চরিত্রভ্রষ্ট করেছে। প্রায়শই এমন কেলেঙ্কারির জন্য এফআইআর, শিক্ষক-শিক্ষিকার গ্রেফতার, জনতার স্কুলে চড়াও হওয়া, স্কুল ভাঙচুর, খাদ্য পাচার করার সময় মাস্টার বা দিদিমণিদের ধরা পড়া, নষ্ট খাবার খেতে দেওয়ায় ছাত্র বা অভিভাবকদের ক্ষোভ, বিক্ষোভ ভাঙচুরের গল্স-ত্য খবরের কাগজে, টিভি চ্যানেলে পড়তে ও দেখতে হয়। মনে হয় যেন স্কুলগুলো হয়ে উঠেছে মাছবাজার বা পাইকারি হাট অথবা জুয়ার আড়ত, যেখানে নৈতিকতা ছাড়া আর সবই আছে।

কলেজ শিক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয় একই মুদ্রার দুটো দিক। এ ব্যাপারে আবার জুন মাসটা গত কয়েক বছরে প্রকটিত হচ্ছে ‘নিষ্ঠুর মাস’ হিসেবে। ওই সময় উচ্চমাধ্যমিক রেজাল্ট বেরোবার পর ভর্তির মরসুম আর ভর্তি মানে এখন আড়ালের রফা, তার জন্য কলেজ গেট জ্যাম করে দিয়ে যথেষ্ট নাম্বার পাওয়া ছাত্রছাত্রীদের ভেতরে ঢুকতে না দিয়ে ভাগিয়ে দেওয়া, প্রহসনমূলক অনলাইন ব্যবস্থা, গুণ্ডা ও তোলাবাজদের বশীভূত ভর্তি কমিটির চেয়ারম্যান – অধ্যাপকদের প্রকাশ্যে মিথ্যাভাষণ, দিনের পর দিন ‘ছাত্রনেতা’ থেকে যাওয়া মাফিয়া নেতার চেলাদের ‘অনার্স’ পাওয়ানোর বিনিময় মূল্যে আঙুল ফুলে কলাগাছ হাওয়া। মাত্র মাস খানেকের এই ভর্তি-পুজোর দুর্নীতি সমাজ, সরকার সবার কাছে প্রকটিত। কিন্তু এর সমাধান যাতে (কেন্দ্রীয় ভাবে ‘অনলাইন’ ভর্তি পরিচালনার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়ন্ত্রণ), সেটাকে উড়িয়ে দিয়ে আসছে বছর আবার হবে, তখন ভেবে দেখা যাবে – এমন কথায় ভর্তি দুর্নীতিকে পরম্পরা করে তোলা হচ্ছে।

কলেজগুলোয় আজকাল ‘প্রাইম টাইম’-এও ক্লাসে পর্যাপ্ত ছাত্রছাত্রী থাকে না। তখন তারা ‘স্যার-ম্যাডাম’দের প্রাইভেট টিউশন এর ঠেকে বসে ‘নোট’ নিতে চলে যায়! এ-ও যে ব্যাধি, এবং সে ব্যাধিও ‘ক্যানসার’ হয়ে উঠেছে; সে সম্পর্কে পরিবার, সমাজ ও সরকার সবাই নির্লিপ্ত। টিউশনের ছাত্র-ছাত্রীকে বাড়তি সুবিধা পাওয়ানোর দুষ্টচেষ্টা মাত্রাছাড়া হয়ে উচ্চশিক্ষার সমস্যাকে আরও গভীর সঙ্কটের খাদে ফেলবে নতুন শুরু হওয়া CBCS (পছন্দভিত্তিক বিষয় নিয়ে পড়ার ব্যবস্থা) পাঠ্যক্রমের ২০ শতাংশ নম্বর কলেজ থেকেই দেওয়ার ব্যবস্থা হওয়ায়।

সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানেরও ধারাবাহিক ক্রমাবনতি। যেখানে পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি ব্যবস্থা রয়েছে তেমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অগ্রগণ্য ‘যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।’ একটি মিডিয়া হাউজ এখানে সমস্যার অভিমুখ হিসেবে ‘স্বাধিকার’ রক্ষা ও কেড়ে নেওয়ার দ্বন্দ্বকে প্রধান হিসেবে যতই দেখাক না কেন, এই সমস্যার আসল শিকড় আরও গভীরে এবং সেদিকটি সযত্নে আড়াল করে রাখা থাকছে। ‘স্বাধিকার’ রক্ষার জন্য ছাত্রদের আন্দোলন ও অনশনে যুক্তফ্রন্ট-এ সামিল হয়েছে ক্ষয়িষ্ণু বামপন্থীদের সঙ্গে চিরযোদ্ধা বামপন্থী এবং জয়নগর-বাসন্তী-কুলতলির সামন্ততান্ত্রিক বামেরাও।

কিন্তু যে কোনও ভর্তি প্রক্রিয়ার প্রাথমিক শর্তটা কেন যে ভোলাতে চাইছেন তা দুর্বোধ্য নয়। স্বচ্ছতা কোনও বিজাতীয় চাহিদা নয়। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩৮টা বিদ্যবিষয়ের ১৩৪টাতে উচ্চমাধ্যমিকে মার্কশিট থেকে মেধাবী ‘মুক্তা’ খুঁজতে অসুবিধা হয় না, সেখানে মাত্র চারটেতে চলত ভর্তি পরীক্ষা। এ বছর আরও দুটোয় বাড়ানো হয়েছে। এক মাস ধরে নাটকীয় টানাপোড়েনের পর ‘স্বাধিকার’বাদীরা আবার ঐকবদ্ধ হয়েছে। উপাচার্যদ্বয় পদত্যাগ করতে চেয়েছেন। কিন্তু যদি সত্যিই এখানে ভর্তির পরীক্ষাটাকে দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ব্যবস্থা করে তুলতে হয়; তবে প্রশ্ন তৈরি, খাতা কোডিং থেকে উত্তরপত্রের মূল্যায়ণে অভ্যন্তরীণ অধ্যাপকদের সম্পৃক্ত থাকার অত্যুগ্র বাসনাই মারাত্মক সন্দেহটাকে বিশ্বাস্য করে তুলছে।

সব মিলিয়ে ভারতীয় বাঙালির শিক্ষার পরিপার্শ্ব বেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন। এখানে দিশা দেখানোরও কোনও ক্ষুদ্র শক্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। দুশো বছরের মেকলের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তঃসারশূন্য অর্জনগুলোই লুঠ হয়ে রাস্তায় প্রকাশ্যে বখরা হচ্ছে। শেষের সেদিন বোধহয় মধ্যযামে।

পথ দেখাবে কে?

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

লেখক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক। তাঁর গবেষণার বিষয় ‘ ষাট ও সত্তর দশকের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলা কথাসাহিত্য ‘ ।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু সরকার 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More