মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৩

লাভ হলো সঙ্ঘেরই

রাজীব সাহা: প্রণবদা, আপনাকে এমনটা মানায় না।

সোনিয়ার নির্দেশেই নাকি এরকম টুইট করেছিলেন আহমেদ প্যাটেল। বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা প্রণব মুখোপাধ্যায় আরএসএসের সদর দফতরে যাচ্ছেন শুনে অসন্তোষ চেপে রাখতে পারেননি প্রাক্তন কংগ্রেস সভানেত্রী। ক্ষোভ ছিল কংগ্রেসের সর্বস্তরেই। প্রণববাবু এ কী করলেন? যে আরএসএসকে কংগ্রেস চিরকাল মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী বলে এসেছে তিনি ভেটারেন কংগ্রেসি হয়ে কিনা তাদেরই আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন?

বিপরীত মতও ছিল। অনেকে  বলছিলেন, প্রণববাবু তো এখন আর কংগ্রেসের কর্মী নন যে তাঁকে দলের হুইপ মেনে চলতে হবে।

কংগ্রেসের বাইরেও অনেকে ভ্রু কুঁচকেছিল, প্রণব মুখোপাধ্যায় চিরকাল ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে এসেছেন। এখন পরিণত বয়সে এ কী করতে চলেছেন?

অনেকে বলছিলেন, আরএসএসের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতার সঙ্গে প্রণববাবুর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব রয়েছে। উনি তাঁদের অনুরোধ এড়াতে পারেননি।

প্রণববাবু নিজে জানিয়েছিলেন, যা বলার বলবেন নাগপুরে গিয়েই।

সেইমতো বৃহস্পতিবার সবকটি মিডিয়ার চোখ ছিল নাগপুরে আরএসএসের সদর দফতরের দিকে। আচমকাই যেন খুব বেশি মিডিয়া ফ্রেন্ডলি হয়ে উঠেছিল আরএসএস-ও।

বিকালে জানা গেল প্রণববাবু গিয়েছেন কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের বাড়িতে। আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতাকে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বলেছেন। অনেকে ভাবল, এই রে, উনি তো আরএসএসের লাইনেই চলছেন দেখছি।

তারপর কয়েকশ টিভি ক্যামেরার সামনে প্রণববাবু ভাষণ দিলেন। আরএসএসের ঘাঁটিতে দাঁড়িয়ে বললেন সহিষ্ণুতা ও বহুত্ববাদের কথা। দেশের আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস, সেই মহাজনপদ থেকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য হয়ে অশোক, গুপ্তবংশ, মুসলমান বিজয়, পলাশীর যুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা উল্লেখ করলেন। তাঁর প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল, ভারতবর্ষের মাটিতে বহু রাজশক্তির উত্থান ও পতন ঘটেছে। কিন্তু তার মধ্যে দিয়ে অক্ষুন্ন রয়ে গিয়েছে ভারতীয় সভ্যতার ধারা।

তিনি কৌটিল্য থেকে মেগাস্থিনিস, ফা হিয়েন হয়ে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সকলের উদ্ধৃতি দিয়েছেন, কিন্তু একবারও উচ্চারণ করেননি আরএসএসের কোনও তাত্ত্বিকের নাম। এমনকী আরএসএসের নামও উল্লেখ করেননি।

তিনি বললেন, প্রাচীনকালে আমাদের দেশে উদার পরিবেশ ছিল বলেই শিল্প, সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল।

আরও বললেন, এখন আমাদের দেশের অর্থনীতি বিকশিত হচ্ছে খুব দ্রুত। কিন্তু হারিয়ে গিয়েছে সুখের চাবিকাঠি। আসলে বৈচিত্রের মধ্যেই আছে জীবনের আনন্দ।

প্রণববাবুর ভাষণ শুনে তখনকার মতো স্বস্তি পেয়েছে কংগ্রেস। ভাষণ শেষ হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে কংগ্রেসের মুখপাত্র বলেছেন, তিনি আরএসএসের সামনে একটা আয়না ধরে দেখিয়ে দিয়েছেন তাদের আসল চেহারাটা কী।

কিন্তু তার পরে  যত সময় যাচ্ছে, ক্রমশ অসন্তোষের সুর হয়ে উঠছে স্পষ্ট।

শুক্রবার সকাল থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা ছবি ভাইরাল হয়েছে, যাতে দেখা যাচ্ছে প্রণববাবুর মাথায় আরএসএসের টুপি। ফোটোশপের কারিকুরি। প্রণবকন্যা শর্মিষ্ঠা বলেছেন, এই ভয়টাই করছিলাম। শুরু হয়ে গিয়েছে নোংরা খেলা।

অনেকে বলছেন, প্রণববাবু গতকাল আরএসএসের সদর দফতরে যে কথাগুলো বলেছেন, তা প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় সভ্যতা ও পরম্পরা নিয়ে নেহরুর দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিধ্বনি। এই কথাগুলোই আগে সংসদের যৌথ অধিবেশনেও একবার বলেছিলেন। তিনি হয়তো মনে করেন, বহুত্ববাদের কথা বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের মানুষকে আরও একবার মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। কিন্তু তিনি কোনও সেকুলার মঞ্চ থেকে ভাষণ দিলে ভালো হত। আরএসএস তো তাঁর কথা শুনে বহুত্ববাদ শিখবে না। আগের মতোই হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের স্লোগানেই আস্থা রাখবে।

প্রশ্ন উঠেছে, সঙ্ঘ তাঁকে ডেকেছিল কেন? তারা নিশ্চয় জানত, প্রণববাবু নাগপুরে এসেও ধর্মনিরপেক্ষতার কথাই বলবেন।

অনেকের ধারণা, প্রণববাবুর সুবাদে ব্যাপক প্রচার পেয়ে গিয়েছে সঙ্ঘ। প্রচার পাওয়ার জন্যই তাঁকে ডেকেছিল।

সঙ্ঘের কর্তারা জানতেন,  প্রণববাবু নাগপুরে এলে দেশের সব মিডিয়ার দৃষ্টি সেদিকে আকর্ষিত হবে। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি কীভাবে হিন্দুত্ববাদীদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন এই নিয়ে জল্পনা-কল্পনা হবে। এর মধ্যে দিয়ে ব্যাপক প্রচার হয়ে যাবে সঙ্ঘের।

হয়েছেও তাই।  বৃহস্পতিবার সংঘের তৃতীয় বর্ষ বর্গের সমাবর্তন অনুষ্ঠান যেভাবে জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে দেখিয়েছে, ইতিহাসে কখনও তেমন ঘটেনি।

কিন্তু প্রাজ্ঞ রাজনৈতিক হয়েও কি প্রণববাবু বোঝেননি যে তিনি আরএসএসের মঞ্চে গেলে সুবিধা তাদেরই?

তাহলে তিনি গেলেন কেন?

উত্তরটা তিনিই জানেন। আর কেউ জানে বলে মনে হয় না।

Shares

Leave A Reply