ক্লাসঘরে প্যান-অপটিকন আর সিসিটিভি – একসঙ্গে চলে না যে

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

কণিষ্ক ভট্টাচার্য

পশ্চিমবঙ্গে কলেজে অ্যাডমিশনের মরসুম চলছে।

যোগ্য ছাত্রছাত্রীদের মেধা তালিকার বদলে তোলাবাজদের হাতে টাকা তুলে দিয়ে ভর্তির খবর সমস্ত মিডিয়ায় পদ্মার ইলিশের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে উঠে আসছে। মুখ্যমন্ত্রী আর শিক্ষামন্ত্রীর এই তোলাবাজদের কবলে না পড়ার সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন, পুলিশ প্রশাসন তোলাবাজির ঘটনা তাদের নজরে আনার জন্য প্রচার করেছে, পাশাপাশি শাসকদলের ছাত্র সংগঠনের সভানেত্রীর অপসারণের খবরে ভুক্তভোগীর বাইরে থাকা বাকি রাজ্যবাসী নিশ্চিত হয়েছে যে খবরগুলি মিথ্যে নয়। তার মধ্যে নাকি আবার দশ-পঁচিশের ছকের ব্যাপার আছে। এর মধ্যে ৭৯ শতাংশ নম্বর পেয়েও টাকা দিতে না পারার কারণে কোথাও ভর্তি হতে না পেরে অম্লান সরকার নামে এক ছাত্র আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে।

খোলাবাজারের হাওয়া খোলাখুলি ধাওয়া করার পর থেকে সামগ্রিক ভাবেই শিক্ষার খরচ বেড়েছে বহুগুণ। কল্যাণকামী রাষ্ট্র কাঠামোর শিক্ষা বিস্তারের জন্য যে যে প্রস্তাব একের পর এক শিক্ষা-কমিশন দিয়ে এসেছে তার ভগ্নাংশ মাত্র মান্যতা পেয়েছে সরকারগুলির কাছ থেকে। মুদালিয়র কমিশনের শিক্ষা খাতে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যয়ের দশ শতাংশের কথা আমাদের ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। খোলাবাজার এসে শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রেই ভর্তুকিকে একটি ঘৃণিত শব্দ হিসেবে জনসম্মতি নির্মাণের জন্য ব্যয় করেছে অজস্র শব্দ।

আরও পড়ুন : শিক্ষার শেষের সে দিন এখন মধ্যযামে

আর তা জন্ম দিয়েছে সরকারি ক্ষেত্রে সেলফ ফিন্যান্সিং কোর্স নামে এক অযাচিত সন্তানের। বেসরকারি শিক্ষার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের থেকে শিক্ষা কেনার খরচ জোটানোর অবস্থা সিংহ কেন শশকভাগ ভারতীয়ের নেই। তাই এসেছে শিক্ষাঋণের টোপ। তা নেওয়ার যোগ্যতা শৃগালভাগ ভারতীয়ের আছে কিনা সন্দেহ। সরকারি স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনের বাইরে সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েদের জায়গা নেই কোথাও। আর সেখানে তাদের হাতে একমাত্র অস্ত্র তাদের যোগ্যতায় প্রাপ্ত নম্বর। এই অবস্থায় পরীক্ষা দিয়ে নম্বর পেয়ে মেধার বিচারের পরিবর্তে বিরাট পরিমাণ কালোটাকার হাত বদলের মধ্যে দিয়ে সেই ছেলেমেয়েদের যদি সুযোগ পেতে হয় আর না পেলে আত্মহত্যা করতে হয় তখন এই লজ্জা আমরা রাখব কোথায়!

শিক্ষা বর্ণে বর্ণে একটি রাজনৈতিক শব্দ। সেই প্রাচীন কালে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় শিক্ষাকে কতিপয়ের মুষ্টিবদ্ধ করে রাখার পিছনে যেমন রাজনীতি ছিল, তেমনই ধনতন্ত্রের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পুঁজির রাজনীতির কারণেই সেই বদ্ধমুষ্টি আলগা করা হয়। কারণ সাম্রাজ্য চালনার জন্য অল্প মজুরিতে দেশীয় কর্মচারী পাওয়ার এর থেকে লাভজনক ব্যবস্থা যে ছিল না তা রবীন্দ্রনাথ তাঁর অন্তর্দৃষ্টিতে বুঝেছিলেন বলেই ঔপনিবেশিক শিক্ষাকে ‘কেরানি তৈরির ইস্কুল’ বলেছিলেন। উপনিবেশের প্রভু কোনও কিছুকেই তার ক্ষমতা প্রয়োগ পরিধির বাইরে যেতে দেয় না। দক্ষিণ আমেরিকায় সে উপনিবেশের ভাষাকেই ভুলিয়ে দেয় আর বাংলায় ভাষার অন্তর-বয়নকে বিধ্বস্ত করে তাকে ঢালাই করে নেয় একদিকে সংস্কৃতর ছকে, অন্য দিকে ইংরেজির কাঠামোয়। তাই ‘মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে আসছে’ হয়ে যায় ‘রোরুদ্যমানা বালিকা আসিতেছে’।

স্বাধীন ভারতে কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ভূমিকা শিক্ষাক্ষেত্রে খানিকটা পালিত হয়েছিল, যদিও মেকলের কাঠামোটি অস্বীকৃত হয়নি। বাজার অর্থনীতি আসার পর থেকেই পড়াশোনাকে কেবলমাত্র উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জুতে দেওয়ার এবং যে বিষয় উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় তাকে অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা চায় পুঁজির স্বার্থেই। সম্প্রতি বিশিষ্ট সাংবাদিক সরাসরি সে কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ তুলে দেওয়ার প্রস্তাব সহকারে।

তোলাবাজির মাধ্যমে ভর্তির এই মরসুমে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন নানা তোলা হল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্বে হিউম্যানিটিজের কয়েকটি বিভাগে দীর্ঘকাল প্রবেশিকা পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি হয়। যে যে প্রশ্নগুলি তোলা হল, তা কত দূর প্রাসঙ্গিক সেটা আগে দেখে নেওয়া যাক। প্রথমত, যাদবপুর পশ্চিমবঙ্গের বাইরে নয়, তাহলে অন্যান্য সব কলেজের মতো সেখানেও উচ্চ মাধ্যমিক বা সমতুল পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি প্রক্রিয়া হবে না কেন?

প্রসঙ্গত খবরে প্রকাশ, এই বছরেও ঐতিহ্যময় স্কটিশ কলেজ এবং রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালিত কলেজে প্রবেশিকা পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তির প্রক্রিয়া চলেছে এবং মানচিত্র অনুসারে দুটি কলেজই পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত। যদিও এই বিষয়ে প্রশ্নকর্তাদের নীরবতার কারণ অজ্ঞাত।

দ্বিতীয়ত, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সব বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি হয় না, তাহলে নির্দিষ্ট কিছু বিভাগে পরীক্ষা হবে কেন?

প্রসঙ্গত, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগেই উচ্চ মাধ্যমিক বা সমতুল পরীক্ষার ফল নয় বরং প্রবেশিকা পরীক্ষার মাধ্যমেই ভর্তি প্রক্রিয়া চলে, সেই পরীক্ষার নাম জয়েন্ট এন্ট্রান্স একজামিনেশন। এহ বাহ্য, কিন্তু অধিকারীভেদ বলে একটি কথা আছে বাংলা ভাষায়। তার অনুসারে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়টি বিভাগে এবং কোন কোন বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষা নেওয়া হবে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী এক এবং একমাত্র সেই বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ সেটি একটি স্বশাসিত সংস্থা। কারও সে প্রক্রিয়া অপছন্দ হলে তিনি সমালোচনা করতে পারেন কিন্তু কখনও কোনও অবস্থাতেই হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। কারণ সেই অধিকারীভেদ।

তৃতীয়ত, কুকুরকে মারতে হলে আগে তাকে বদনাম করো – ইংরেজি ভাষায় এমন একটি প্রবাদ আছে। বদনামের প্রয়োজন তখনই পড়ে যখন যুক্তির পাল্লা থাকে খালি আর কুযুক্তি দিয়ে সেই শূন্যটা ভরানো যায় না। তাই এর পরে বলা হল, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশিকার মাধ্যমে ভর্তির প্রক্রিয়া স্বচ্ছ নয়। যদি বা প্রবেশিকা নেওয়া হয় তাহলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা সেই প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকতে পারবেন না।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে এখনও বারশো টাকায় উচ্চমানের মেধাবী পড়াশোনা হয়, যেখানকার ছাত্রছাত্রীরা সারা পৃথিবীতে নিজের নিজের বিষয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে কাজ করছেন, যেখানকার ‘নাক’ রেটিং অত্যন্ত ভালো, যেখানে ভর্তির জন্য কোনও তোলাবাজ দাদাদিদিকে কালোটাকা আর মদের বোতল দিতে হয় না, ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনের দিন বোমা বন্দুকে সেজে রাজ্যের গুণ্ডারা একত্রিত হয় না, পুলিশ কর্মীর প্রাণ যায় না, সেটাকে বদনাম করার পক্ষে এই যুক্তি বড় দুর্বল কিন্তু অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ যে আচার্যকুলকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করা হল ওই বক্তব্যের মাধ্যমে, এই ইন্টিগ্রেটেড প্রতিষ্ঠানে সেই শিক্ষকদের কাছেই কিন্তু আগামী পাঁচ বছর পড়াশোনা করবে ছাত্রছাত্রীরা। তাদের যদি উপযুক্ত প্রমাণ ব্যতীত তাদেরই শিক্ষকদের সম্পর্কে এমন বিষাক্ত মনোভাব ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয় সর্বোচ্চ মহল থেকে তা দুর্ভাগ্যজনক এবং দুরভিসন্ধিমূলক।

খবরে প্রকাশ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, যাদবপুরে প্রবেশিকার মাধ্যমে ভর্তির প্রক্রিয়ায় তাঁর ব্যক্তিগত আপত্তি আছে। অবশ্যই পার্থবাবুর ব্যক্তিগত আপত্তি থাকতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের তথা ভারতের যে কোনও নাগরিকের তা থাকার এবং সেই আপত্তি প্রকাশ্যে জানানোর অধিকার আছে। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর পদাধিকারেও সেই আপত্তির কারণে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই।

ইতিমধ্যে আমরা জানি ছাত্রছাত্রীদের অনশনের কথা, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজিকিউটিভ কাউন্সিলের সভায় পুনরায় প্রবেশিকা পরীক্ষার সিদ্ধান্তের কথা। কিন্তু কেন এমন হল, কেন এমন হয় তা আমরা প্রতিবেদনের পরবর্তী পর্বে প্রকাশ করার চেষ্টা করব। এই পর্ব বরং শেষ করা যাক অন্য প্রশ্নে।

দার্শনিক বেন্থামের একটি স্বল্প পরিচিত বইয়ের নাম প্যান অপটিকন। এই প্যান অপটিকনের ধারণা থেকে ফুকো একটি নতুন তত্ত্বের সৃষ্টি করেন। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র সমস্ত নাগরিকদের শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখতে জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি প্রতিটি মানুষের প্রতিটি মুহূর্তের ওপর নজর রাখার ব্যবস্থা করে। এই কথা যে ক্লাসঘরে পড়া হয় সেই ক্লাসঘরের দেয়ালে, করিডোরে, প্রবেশিকায়, পাঠ্যক্রমে কী আর নিরবচ্ছিন্ন নজরদারীর সিসিটিভি বসানো যায়! না বসালে সেই ক্লাসঘরের ছেলেমেয়েরা সেটা মেনে নেবে!

(শেষাংশ আগামীকাল)

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

কণিষ্ক ভট্টাচার্য। শিক্ষক ও সাহিত্যকর্মী।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু সরকার 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More