বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

রাজীব কুমার ও সিবিআই, শাসকের নতুন চাল নয়তো

প্রসেনজিৎ বসু

রবিবার এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হল কলকাতা।

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই-এর আধিকারিকরা কলকাতা পুলিশ কমিশনারের বাড়িতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেলে, কলকাতা পুলিশ তাদের বাধা দেয় এবং জোর করে থানায় নিয়ে যায়। এমনকী, সিবিআই-এর দপ্তর এবং আধিকারিকের বাড়ি পুলিশ ঘেরাও করে রাখে বলে অভিযোগ।

ভারতের সংবিধানের ও আইন-শৃঙ্খলাকে রক্ষা করার গুরুদায়িত্ব যাদের উপর তারা কলকাতার রাস্তায় গুন্ডাদের মত কু্স্তি লড়ছে দেখে আপামর জনসাধারণের মাথা হেঁট হয়ে গেছে।

সিবিআই এবং কলকাতা পুলিশের মধ্যে যা চলছে, তা দেশের রাষ্ট্রকাঠামো এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্কটকেই সামনে নিয়ে এসেছে। সিবিআই হোক বা কলকাতা পুলিশ, দুজনেরই বিশ্বাসযোগ্যতা আজ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। একজন চলছে মোদী সরকারের অঙ্গুলি হেলনে, আর অন্যজন পরিণত হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের শাখা সংগঠনে।

আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য কোনো রীতিনীতির তোয়াক্কা করেন না। তিনি সমস্ত সাংবিধানিক শিষ্টাচারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সটান কলকাতা পুলিশ কমিশনারের বাড়ি চলে গেলেন এবং সেখান থেকেই সাংবাদিক সম্মেলন করলেন, দলীয় বিবৃতি দিলেন। শুধু তাই নয়, তাঁর ধর্না মঞ্চে কলকাতা তথা রাজ্য পুলিশের সর্বোচ্চ আধিকারিকদের বসে থাকতে দেখা গেল। বোঝাই যাচ্ছে যে কলকাতা ও রাজ্য পুলিশ তথা তৃণমূল কংগ্রেস দল বর্তমানে সমার্থক হয়ে গেছে। দল, প্রশাসন ও সরকারের মধ্যে এই রাজ্য আর কোনও বিভাজন নেই। রাজ্যের গণতন্ত্র এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাকে প্রহসনে পরিণত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী ও শাসক দল।

অন্যদিকে, সিবিআই মোদী সরকারের আমলে তাদের দলদাসে পরিণত হয়েছে, যার প্রমাণ বহুবার পেয়েছেন দেশবাসী। সারদা কেলেঙ্কারি নিয়ে তদন্ত চলছে প্রায় ছ’বছর ধরে। মোদী ক্ষমতায় এসেছেন পাঁচ বছর হয়ে গেল। কিন্তু এতদিন সিবিআইয়ের এই চিটফান্ড কাণ্ডে কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা মনে পড়ল না। লোকসভা ভোটের কয়েক মাস আগে এই নাটক কেন? চিটফান্ড কাণ্ডে মুকুল রায়ও জড়িয়ে আছে এবং বিজেপির সভ্য হিসেবে বহাল তবিয়তে রয়েছে। মুকুল রায়কে কেন তদন্তের আওতা থেকে বাদ রাখা হচ্ছে?

সমস্ত সাংবিধানিক রীতিনীতিকে বিসর্জন না দিয়ে, রাজ্য সরকার যদি মনে করে সিবিআই কলকাতা পুলিশের স্বাধিকার ভঙ্গ করছে তাহলে তারা আদালতে না গিয়ে সিবিআই অফিসারদের সঙ্গে রাস্তায় ধস্তাধস্তি করার নির্দেশ দিল কীভাবে? পুলিশ প্রশাসনের এই ধরণের আচরণ কি সংবিধান সম্মত?

সুপ্রিম কোর্ট কী করবে জানা নেই । সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ও আজকাল কতটা ন্যায় বিচার করছে তা নিয়ে জনমানসে সন্দেহ জন্মেছে, বিচারক লোয়ার মৃত্যু, নাগরিকপঞ্জি, রাফাল কেলেঙ্কারি ইত্যাদি নিয়ে দেওয়া একের পর এক রায়ের ফলে।

আসলে কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ হওয়ার ঠিক পরেই, আর রাজ্য বাজেট পেশ হওয়ার মুখে এই ধরণের কেন্দ্র-রাজ্য সরকারি সংঘাত দেখে মনে প্রবল সন্দেহ জাগছে। ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, কৃষকদের দুর্দশা, জীবন-জীবিকার সঙ্কট — এই সমস্ত কিছু থেকে জনগণের নজর সরিয়ে দেওয়ার এটা শাসকদের কোন চাল নয় তো?

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

লেখক অর্থনীতিবিদ

Comments are closed.