শনিবার, ডিসেম্বর ৭
TheWall
TheWall

নাগরিকপঞ্জি: গৃহযুদ্ধ না লাগলে ফ্যাসিবাদ ক্ষমতায় আসবে কী করে

শামিম আহমেদ

অসম নাগরিকপঞ্জির হালনাগাদ নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলাম একটি বাংলা টিভি চ্যানেলে।

৪০, ০৭,৭০৭ জন মানুষের নাম অসমে ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনশিপের চূড়ান্ত খসড়া থেকে বাদ পড়েছেন। একটি অংশ প্রচার করছে, এর মধ্যে নাকি ৩৭ লক্ষ বাঙালি মুসলমান। এটা করা হয়েছে এই মর্মে যে মুসলমানদের তাড়ানো হবে, হিন্দুদের নয়। এমন কথা উড়ছে। ওড়াচ্ছেন বিজেপির নেতারা। কয়েক দিন আগেও অসম বিজেপির হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেছেন, হিন্দু বাঙালি অসমীয়াদের সঙ্গে থাকতে পারবেন কারণ কেন্দ্রীয় সরকার প্রত্যেক হিন্দুকে ভারতীয় হওয়ার একটা অধিকার দেওয়ার জন্য বিল পেশ করেছে। ইজরায়েল রাষ্ট্রের কথা মাথায় এল। পৃথিবীর সব ইহুদির দেশ হল ইজরায়েল যা অ-ইহুদিদের নয়।

বোঝাই যাচ্ছে যে এই বিষয়টিকে বিজেপি দল মেরুকরণের চূড়ান্ত এক দিকে নিয়ে যাচ্ছে — গরু, বাবরি মসজিদ নিয়ে যারা ক্ষমতায় এসেছে তাঁদের পক্ষে এটাই দস্তুর। এটাও বুঝতে পারছিলাম যে ‘এথনিক ক্লিনজিং-এর দিকে এগোচ্ছে বিজেপির ভারত।

টিভির ওই অনুষ্ঠানে একজন সাংবাদিক, এক বিজেপি নেতা, আমি ও সঞ্চালক। সঞ্চালক আমাকেই প্রথমে জিজ্ঞাসা করলেন। আমি সঙ্গতভাবেই অসমের একটা ইতিহাস—কামরূপ, প্রাগজ্যোতিষপুর, রাজা ভগদত্ত, ৬৪০ খ্রিস্টাব্দে ভাস্কর বর্মার রাজত্ব, পালবংশীয় বৌদ্ধ রাজাদের কথা দিয়ে শুরু করলাম। তার পর কেটে গিয়েছে ছ’সাতশো বছর। বহু হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান বাস করছেন এই রাজ্যে। এমন সময় এল আহোম ট্রাইব, বর্মা ও চীন থেকে। ১৮২৬ সালে বর্মার কাছ থেকে অসম রাজ্য জয় করলেন লর্ড আর্মহাস্ট, অসম ঢুকল ব্রিটিশ ভারতে। ১৮৭৩ সালে রাজভাষা বাংলা গেল পালটে, হল অসমিয়া। ১৮৭৪ সালে বরাক-উপত্যকা, কাছাড়, গোয়ালপাড়াকে ব্রিটিশরা বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে বের করে অসমের সঙ্গে জুড়ে দেয়। দাঙ্গা হল ১৯৪৮, ১৯৫৬, ১৯৬০, ১৯৭২, ১৯৮০, ১৯৮৩-৮৪। বাঙালিদের হত্যা, বিতাড়ন। সেই চক্রান্তের সাম্প্রতিকতম অংশ হল জাতীয় নাগরিকপঞ্জির হালনাগাদ। বেছে বেছে বাদ দেওয়া হয়েছে বাঙালিদের — আছেন হিন্দু ও মুসলমান বাঙালি। অল্প কিছু অবাঙালি। যা শোনা যাচ্ছে।

এর পর সঞ্চালক গেলেন ওই বিজেপি নেতার কাছে। প্রশ্ন রাখলেন। আমার কথার মাঝখানে তিনি অনেক কিছু বলছিলেন। বাধা দিচ্ছিলেন। ‘এত ইতিহাসের কী আছে!’ এর পর তিনি যখন বলার সুযোগ পেলেন, তখন বললেন, এটা হিন্দু-মুসলমানের ব্যাপার নয়। সাম্প্রদায়িক চেহারা দেওয়া হচ্ছে এসবের। তার পর এটা-সেটা। যা বিজেপি নেতারা বলে থাকেন। অনেকটা সেই গরুর রচনা। বেশ দুর্বল বক্তব্য। যদিও ওই চ্যানেলের এক কর্তাব্যক্তি অনুষ্ঠানের শুরুতে বলেছিলেন, এই বিজেপি নেতা নাকি খুব বড় তার্কিক। উনি ‘তর্ক’ কাকে বলে তাই জানেন না। সম্ভবত আন্বিক্ষীকির নাম শোনেননি। আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান কাকে বলে, তা জানার কথা নয় ওঁর। জানলে এই দলে আসতেন না।

এর পর এল নানা প্রসঙ্গ — ডি ভোটার, ডিটেনশন ক্যাম্প, লিগেসি ডেটা, বংশবৃক্ষ, ফরেনার্স ট্রাইবুনাল প্রভৃতি। এই বার দেখলাম তাঁর (বিজেপি নেতার) মূর্তি।  তিনি প্রথমে বলেছিলেন, হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-অবাঙালির বিষয় এটা নয়। এই বার বললেন, আমি এখানে কথা দিয়ে গেলাম, কোনও হিন্দু বাঙালিকে তাড়ানো হবে না। হিন্দু খাঁতরে মে নেহি হ্যায়—শুনেও ভাল লাগল।

বিজ্ঞাপনের বিরতি।

বিজেপি নেতা বলেন, একটা দেশ তো নিয়েছেন, আর কটা দেশ নেবেন? বংশবৃদ্ধি তো কী হারে করছেন, তা তো জানি।

বিরতির পর।

বিজেপি নেতা জানান, ১৯৭১ সালে অসমে ৫ শতাংশ মুসলমান ছিল, এখন তা বেড়ে কত হয়েছে জানেন?

আমি জবাব দিই, আপনি ভুল তথ্য দিচ্ছেন।

তিনি রেগে কাঁই! খুব চেঁচামেচি! তাঁকে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না!

শেষে বললেন, ১৯৭১ নয়। মনে হচ্ছে, ১৯৫১।

উত্তর দিলাম, সেটাও ভুল।

বেরিয়ে পড়ল স্বরূপ। তাঁর পূর্বপুরুষকে বাংলাদেশ থেকে চলে আসতে হয়েছে, ফলে সে চায় না, এই দেশে মুসলমান থাকুক। সে কী মূর্তি! আমি ভীত-সন্ত্রস্ত। এঁরা নাকি প্রধান বিরোধী দল হতে চলেছে বাংলায়! হা ঈশ্বর!

ইতিমধ্যে বিরতি। বিজ্ঞাপনের নয়, বাইটের।

কংগ্রেস নেতা আবদুল মান্নান জানালেন, তাঁরা অসহায়দের পাশে আছেন। সিপিএম সুজন চক্রবর্তীও বিজেপির কড়া সমালোচনা করলেন। মুখ্যমন্ত্রী বললেন, তিনি এবং পশ্চিমবঙ্গ বিপন্ন মানুষের পাশে আছেন। বিজেপি দিলীপ ঘোষ বললেন, ক্ষমতায় এলে বিজেপি সব কটাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করবে। আজ যারা ‘বিপন্ন’-দের পাশে আছে বলছে, তাদেরও ঘাড় ধাক্কা দেব।

সঞ্চালক (উপস্থিত বিজেপি নেতাকে): আপনি কি দিলীপ ঘোষকে সমর্থন করেন?

বিজেপি নেতা: হ্যাঁ! অবশ্যই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেব। একদা আমার পিতা-পিতামহকে চলে আসতে হয়েছিল। আমি ছেড়ে দেব ভেবেছেন?

পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত। এমন হলে নাকি টিভির অনুষ্ঠানে টিআরপি বাড়ে।

আমার ঘেন্না পাচ্ছিল। ওই চ্যানেল, এই নেতা, ওই বিজেপির ভারত!

আমি দাড়িহীন মুসলমান। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়েছি। মহাভারত নিয়ে গবেষণা করেছি। রামকৃষ্ণ মিশনে হিন্দু দর্শন পড়াই। বহু ছাত্রের গবেষণার তত্ত্বাবধান করি, যার বেশির ভাগের বিষয় ভারতীয় বৈদিক দর্শন। আমাকে ওই সাম্প্রদায়িক বিজেপি ক্ষুদ্র নেতার কী রোষের মুখে পড়তে হল, অন স্ক্রিন এবং অফ স্ক্রিন ভাবতে পারবেন না। লোকটা (সচেতনভাবে ‘ভদ্রলোক’ লিখলাম না) মিথ্যে তথ্য দিয়ে গেলেন সমানে। কী ঘৃণা ওর! ও বিজেপি! এই দলকে সহ্য করতে হচ্ছে আমাদের! কারা এরা?

ভাবি এখন, দাড়িটুপি মুসলমানরা এই দেশে তবে কতটা নিরাপদ! এটাও বুঝলাম যে একজন মৌলবি বা মৌলানা সাহেবের কথার সামান্য বিচ্যুতি ঘটলে এই দেশে কী ঝড় বয়ে যায়! ভাবুন তো, এই কথা আমি অন স্ক্রিন বলছি, “এই দেশে হিন্দুদের থাকতে দেব না। এই দেশকে দার-উল-ইসলাম বানাবো। হিন্দুদের আমি ঘৃণা করি!’’

আমি বাড়ি ফিরতে পারব? আমার নামে মামলা হবে না? যদি না হয়, কেন হবে না? কে জবাব দেবে!

অসমের বাকসা জেলার ইব্রাহিম আলির দাদুর নাম ছিল ১৯৫১ সালের ভোটার লিস্টে, ১৯৬৬-র তালিকায়ও। ব্রিটিশ সরকারকে দেওয়া খাজনার রশিদ আছে, রয়েছে ভদ্রাসন ও জমিজমার দলিল। তাঁর পরিবারের নাম চূড়ান্ত খসড়ায় নেই। অসম ছাত্র-যুব ফেডারেশনের সভাপতি সম্রাট ভাওয়াল বললেন, যাঁরা পর পর কয়েক বার ভোট দেননি বা গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র বাস করছেন, তাঁদের নাম সীমান্ত পুলিশকে দেওয়া হয়েছে, মামলা হয়েছে ফরেনার্স ট্রাইবুনালে। ট্রাইবুনালে গরহাজির থাকলেই ‘বিদেশি’ বলে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ের পূর্বে যিনি ছিলেন ‘পলাতক’, রায় ঘোষণার আধ ঘন্টার মধ্যে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ—এমন নজির অনেক।

কোথায় ঠাঁই হয়েছে সেই পলাতকদের? ডিটেনশন ক্যাম্পে। ৩৭টি দেশে ওই নাগরিকদের জমা পড়া নথি গিয়েছে। যাচাইয়ের জন্য। ২২০  কোম্পানি আধা-সেনা টহল দিচ্ছে। সৈন্যবাহিনী সতর্ক।

নবারূণ ভট্টাচার্যের ‘যুদ্ধপরিস্থিতি’ মনে পড়ছে?

আর এমন পরিস্থিতির গ্রাউন্ড ওয়ার্ক সেরে রাখছেন বিজেপির ওই নেতা, তাঁর সতীর্থদের দল, বিজেপি আর বড়-মেজ-ছোটো গোস্বামীর দল!

গৃহযুদ্ধ না লাগালে ২০১৯-এ ক্ষমতায় আসবে কী করে ফ্যাসিবাদের নয়া অবতার!

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

ফাইল চিত্র 

শামিম আহমেদ দর্শনের অধ্যাপক। উপন্যাস, গল্প ও প্রবন্ধ লেখেন।  

Leave A Reply