সোমবার, ডিসেম্বর ১৬
TheWall
TheWall

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মমতার নৈতিক জোর নেই, বিশ্বাসযোগ্যতাও নেই

একুশে জুলাইয়ের সভার নামে প্রবল তাম ঝামের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলে বসলেন, পশ্চিমবাংলায় ৪২ টার মধ্যে ৪২ টা আসনই নাকি পাবেন তাঁরা। আর এই কথাও বলা হল সেটা পেলেই নাকি দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন তৃণমূলের নেত্রী।

কিন্তু উনি বোধহয় ভুলে গিয়েছেন যে দেশে প্রধানমন্ত্রী হতে গেলে লোকসভায় ২৭২টা আসন দরকার হয়। ৪২টা নয়। সে যাক। স্বপ্নের পোলাওয়ে ঘি ঢালতে কে বাধা দিচ্ছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের অনেক মানুষ এ সব শুনে নিশ্চয়ই হাসছেন। এবং অনেকেরই মনে হচ্ছে, ৪২ এর পর আরও একটা শূন্য বসলে ৪২০ হয়।

অধীর চৌধুরী

একুশের মঞ্চে দাঁড়িয়েই মমতা বার্তা দিতে চাইলেন যে উনি হিন্দুদেরও নেতা। ২১ জুলাইয়ের সভা থেকে তিনি বললেন, আমরা সব হিন্দু দেবদেবীকেই মানি। সন্তোষীমা, কালী-দুর্গা, রাম এমনকি বিষ্ণু কাউকেই বাদ দিলেন না। এটা লক্ষ্য করতে হবে সে দিন কিন্তু উনি কোনও ইমাম, কোনও মুয়াজ্জেমকে নিয়ে কথা বললেন না।

আসলে উনি এখন ভাবছেন মুসলমানদের নিয়ে কথা বললে যদি হিন্দুরা চটে যায়! উনি এখন একবার মুসলমানদের খুশি করার রাজনীতি করছেন। পরক্ষণেই হিন্দুদের খুশি করার রাজনীতি করছেন। এমনকী হিন্দুত্ব নিয়ে বিজেপির সঙ্গে টক্কর দিতে যাচ্ছেন – কে বেশি হিন্দু উনি নাকি বিজেপি?

আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঠাওর করতে পারছেন না শ্যাম রাখবেন না কুল রাখবেন। আর এটা করতে গিয়ে উনি নিজেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাতাবরণকে ধর্ম দিয়ে আছন্ন করে ফেলছেন।

হিন্দু-মুসলমান দিয়ে বাংলায় কখনও রাজনীতি হয়নি। কখনও ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে রাজনৈতিক নেতাকে মানুষ চিনতে চায়নি। কিন্তু সেই সাম্প্রদায়িকতার বীজ পুঁতে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। আর এ ভাবেই উনি বাংলার রাজনীতিতে ধর্মকে স্বীকৃতি দিয়ে বসলেন। উনিই বাংলার সব থেকে বড় সাম্প্রদায়িক নেতা।

পাশাপাশি আবার দেখছি, ‘বিশ্ববাংলা’, বাঙালি প্রধানমন্ত্রী এই সবও বলছেন মমতা। কারণটা কী? আসলে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তো তৃণমূল মোকাবিলা করতে পারছে না। সেই নৈতিক জোর বা বিশ্বাসযোগ্যতা কোনওটাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আর নেই। তাই বাঙালি আবেগ জাগিয়ে নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার কথা ভাবতে হচ্ছে তাঁকে। সেটা করতে গিয়ে ধর্মীয় রাজনীতির বিকল্প হিসেবে সংকীর্ণ প্রাদেশিকতার রাজনীতির বাতাবরণ সৃষ্টি করতে চাইছেন উনি।

এক সময়ের চিরশত্রু সিপিএমকে এখন নিজে অনুরোধ করছেন, দেখবেন আপনাদের পার্টির লোক যেন বিজেপিতে না যায়। এটাতো ওঁর বলার কথা নয়! আসলে এখন ওঁর নিজেরই বাংলার মানুষকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। বাংলার মানুষ বিজেপি করবেন নাকি করবেন না সেটার বিরুদ্ধে কিন্তু ওঁর নিজের কোনও রাজনৈতিক বক্তব্য নেই।

পাশাপাশি মমতা নিজেই পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক ডাকাতি করছেন। সব দলকে ভাঙিয়ে লুঠ করে তাঁর দলে ভরতে চাইছেন। আর তা করতে গিয়ে গোটা দলটাই চোর ডাকাতদের দলে রূপান্তরিত হয়েছে। তৃণমূলে নাম লিখিয়েই পয়সা রোজগারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাচ্ছে। ওরা বুঝতে চাইছেন না যে ওঁদের দল একদিন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।

শনিবারেই তো তৃণমূল মেদিনীপুরে সভা করল। সেটাকে তো ওঁরা তৃণমূলের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি বলে থাকেন। সেখানে ওঁদের সভায় মানুষের ভিড় অত কম হল কেন? কেউ কেউ আবার বলছেন এর কারণ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ছে। সে কথা ভাবার দায়িত্ব অবশ্য ওঁদেরই।

সারা ভারতবর্ষে যখন বিজেপির বিরুদ্ধে সব দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে চাইছে, রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে এই ঐক্যবদ্ধ বিরোধীদের সামনে ত্রাহি ত্রাহি রব তুলতে হচ্ছে বিজেপিকে। তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন কংগ্রেসকে ছাড়াই আঞ্চলিক দলগুলোকে নিয়ে ফেডারেল ফ্রন্ট গড়বেন।

এই তো ওমর আবদুল্লা কলকাতায় এলেন। প্রথমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ফেডারেল ফ্রন্টের কথা বললেন। কয়েক ঘন্টা পরেই উনি সুর বদলে বললেন কংগ্রেসকে ছাড়া বিজেপির বিরোধিতা হতে পারে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো ভুলে গিয়েছেন, ওমর রাজনৈতিক ভাবে রাহুল গান্ধীর কাছে কতটা ঋণী। কংগ্রেসের সমর্থনেই জম্মু কাশ্মীরে প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন ওমর।

পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেসই হোক বা কেন্দ্রের কংগ্রেস, হাতে ভিক্ষার পাত্র নিয়ে রাজনীতি করে না। কেউ যেন মনে না করে যে কারও সঙ্গে জোট হল কী না হল, সেই নিয়ে কংগ্রেসের কিছু যায় আসে। কারণ আগামী দিনে ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ কংগ্রেস এবং রাহুল গান্ধী। ভারতবর্ষের রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটা স্পষ্ট এবং সাধারণ মানুষের কাছে এটা অনস্বীকার্য। তাই পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস দলের প্রথম এবং প্রধান শর্ত নিজেকে শক্তিশালী করতে হবে। রাহুল গান্ধীরও তাই স্পষ্ট নির্দেশ। তাতে আমরা কটা আসন পাব সেটা বড় কথা নয়।

এবং তা এই কারণেই যে আসন দিয়ে রাজনীতি কংগ্রেস করেনা। সেটা যদি করত তাহলে ৪৪টা আসন নিয়ে কংগ্রেস সারা ভারতবর্ষে নিজেকে নরেন্দ্র মোদীর বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারত না। সংখ্যার থেকেও আমাদের কাছে বড় কথা হল কংগ্রেস দলের মতাদর্শ এবং ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখে এ ভারতবর্ষকে সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত আক্রমণ থেকে রক্ষা করা। সেই কাজটা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে সুচারুভাবে, উদারতার সঙ্গে সারা ভারতবর্ষ জুড়ে হচ্ছে।

রাহুল গান্ধীর সেই উদ্যোগের পরিণামে তাঁর সমমনোভাবাপন্ন দলগুলো যেমন সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজবাদী পার্টি প্রমাণ করে দিয়েছে যে নরেন্দ্র মোদী অপরাজেয় নয়। তাঁকে পরাস্ত করা যায়। গোরক্ষপুর, ফুলপুর, কৈরানা লোকসভার উপনির্বাচনে বিজেপি-র পরাজয় তার সব থেকে বড় প্রমাণ।

রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে নরেন্দ্র মোদীর নিজের রাজ্য গুজরাতেও বিজেপিকে কঠিন প্রতিযোগীতার মধ্যে ফেলেছে কংগ্রেস। আরেকটু হলেই হেরেই যেত বিজেপি। সমস্ত শক্তি ব্যবহার করে প্রাণ রক্ষা করতে হয়েছে মোদী-অমিত শাহদের।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাই আমি বলি আনরিলায়েবল, আনপ্রেডিক্টেবল রাজনৈতিক নেতা। কাজের বেলা কাজি, কাজ ফুরলেই পাজি। উনি নিজে যাই ভাবুন না কেন, ওঁর ওপর ভরসা করে কংগ্রেস চলে না। একথা আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি।

এই যে উনি এখন এত বড় বড় কথা বলছেন, বিজেপির বিরোধিতা করছেন, ওঁর নিজের অতীতটা বাংলার মানুষ নিশ্চয় বিচার করে দেখবেন।

এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই বিজেপিকে হাত ধরে, লাল কার্পেট বিছিয়ে, পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। বিজেপির সঙ্গে জোট করে তিনিই প্রথম তাদের বাংলায় আসন জিতিয়েছিলেন। মমতাই একদিন বলেছিলেন, বিজেপি দল হিসেবে অস্পৃশ্য নয়। তাদের সঙ্গে সমঝোতা করা যেতে পারে। মমতার কাছে সব থেকে বড় রাজনৈতিক শত্রু ছিল সিপিএম। তাই তাকে পরাজিত করার জন্য মতাদর্শ বা নীতির কথা না ভেবেই যে কোনও দলের সঙ্গে সমঝোতা করা যেতে পারে এই ছিল মমতার বক্তব্য। আর এটা করতে গিয়ে তিনি বিজেপির নেতৃত্বে তৈরি কেন্দ্রের এনডিএ সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন। একবার নয়, দু’-দু’বার।

শুধু তাই নয় যখন গুজরাতে দাঙ্গা হচ্ছে, হাজার হাজার মানুষ খুন হচ্ছে, বিচলিত বোধ করছেন বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী। তিনি মোদীকে বলেও দিচ্ছেন রাজধর্মের পালন কর। তখনও কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একবারও মনে হয়নি যে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার দরকার আছে। তিনি তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়ে চুপ করে বসে ছিলেন।

এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই দিল্লিতে আরএসএসের দফতরে হাজির হয়ে বলেছেন, আরএসএস দেশপ্রেমী। কদিন আগেই তো তিনি বলেছেন,বিজেপি পার্টির সবাই খারাপ নয়, আরএসএসের সবাই খারাপ নয়, কিছু লোক ডার্টি গেম করে।

এইসব দেখে মনে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াইটা আসলে বিজেপির বিরুদ্ধে নয়, ওই দলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে?

আমেরিকার এক প্রেসিডেন্টকে বলতে শুনেছিলাম, তালিবান দু’ধরণের – খারাপ তালিবান ও ভালো তালিবান। আমরা কিন্তু জানতাম আসলে তালিবানকে এই ভাবে ভাগ করা যায় না। ব্যক্তি ভালো খারাপের এটা প্রসঙ্গই নয়। আসলে প্রসঙ্গ তালিবানী তত্ত্বের। তেমনই বিজেপিও একটা তত্ত্বের প্রবক্তা।

কংগ্রেসের লড়াই কিন্তু বিজেপির কোনও ব্যক্তি নেতার বিরুদ্ধে নয়। বরং বিজেপির মতাদর্শ, নীতির বিরুদ্ধে। আমরা বিজেপির রাজনৈতিক মডেলের বিরোধিতা করি। কারণ আমরা জানি এই মডেল ভারতবর্ষের ক্ষতি করবে। এটাই কংগ্রেসের বক্তব্য।

অটল বিহারী বাজপেয়ীর কথাই ভাবুন না। আমরা তো ব্যক্তি হিসেবে তাকে ভালো চোখেই দেখি। কিন্তু তাঁর মতাদর্শ? তিনি তো বলতেন,ভারতবর্ষের মুসলমানদের শুদ্ধ হিন্দুত্ব গ্রহণ করা উচিত। হিন্দুত্ববাদের তত্ত্বকে তাঁদের মেনে নেওয়া উচিত।

কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য হল কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তিনি তো বলেই দিলেন, রাজনাথ সিংহ, এল কে আডবাণী, সুষমা স্বরাজদের সঙ্গে রাজনীতি করা যায়। বাকিদের সঙ্গে যায় না। তাঁর বোধহয় মনে ছিল না যে এই আডবাণীর নেতৃত্বেই ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপণ করা হয়েছিল। এর পরিণামেই অযোধ্যা কাণ্ড।

তার মানে কী দাঁড়ায়? মমতা কি আগামী দিনে আবার বিজেপির হাত ধরার রাস্তাটা প্রশস্থ করে রাখলেন?

এটা সুবিধাবাদী রাজনীতি নয়?

সারা ভারতবর্ষে যখন বিজেপির বিরুদ্ধে সব দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে চাইছে, রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে এই ঐক্যবদ্ধ বিরোধীদের সামনে ত্রাহি ত্রাহি রব তুলতে হচ্ছে বিজেপিকে। তখন বারবার ফেডারেল ফ্রন্টের কথা বলে মমতা আসলে বিজেপি বিরোধী জোটে ফাটল ধরিয়ে বিজেপিকেই অক্সিজেন দিতে চাইছেন। উনি যেন সেই ট্রয় নগরীর ঘোড়া।

বিরোধী ভোট বিভাজিত হলে লাভ আসলে যে বিজেপিরই। মমতা সেটাই নিশ্চিত করতে চাইছেন।

এই কৌশলে আখেরে খুশি হবেন কে? নরেন্দ্র মোদী। আসলে মমতা নরেন্দ্র মোদীর কাছে বার্তা পাঠাতে চাইছেন, বেড়ার সামনে হলেও, বেড়ার পেছনে হলেও, আমি কিন্তু ফেন্স সিটার হয়ে আছি।

উনি যেন বিজেপিকে বোঝাতে চাইছেন, আমি আপনাদের পুরনো সঙ্গী। আমাকে যেন ভুলে যাবেন না। এটাই যেন আজ মমতার বিজেপির কাছে বার্তা।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

অধীর চৌধুরী পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি, রেল মন্ত্রকের প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী ও মুর্শিদাবাদের বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে সর্বভারতীয় কংগ্রেসের এক টানা চার বারের সাংসদ।

Leave A Reply