বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

জাতীয় নেতার মুখেও প্রাদেশিকতা, বলকানাইজেশনের পথেই কি হাঁটছে ভারতবর্ষ?

শমীক ঘোষ

শেষ পর্যন্ত কি টুকরো টুকরো হয়ে যাবে ভারতবর্ষ? ছোট ছোট স্বাধীনরাষ্ট্রের জন্ম দেওয়াই নিয়তি এই দেশের?

কোনও উগ্রপন্থী নেতা নয়, এই ভয় ধরিয়ে দিলেন মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী, খোদ কমলনাথই।

দীর্ঘ দিন ধরে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় নেতা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছেন বেশ কয়েকবার। সর্বভারতীয় রাজনীতির কুশীলব হিসেবেই তাঁকে চেনে সবাই।

মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হতে না হতেই ভোল বদল করলেন সেই তিনিই। প্রাদেশিকতা উস্কে বলে বসলেন, মধ্যপ্রদেশে যথেষ্ট শিল্প গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু সেই চাকরি নিয়ে নিচ্ছে বিহার ও উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা বহিরাগতরা। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ হারাচ্ছে মধ্যপ্রদেশের যুবা।

আরও জানিয়েছেন, যে সমস্ত কোম্পানি শুধু মধ্যপ্রদেশের মানুষের জন্যই মোট কর্মসংস্থানের ৭০ শতাংশ সংরক্ষিত রাখবে, তাদের বিশেষ সাহায্য দেবে তাঁর সরকার।

হঠাৎ শুনলে মনে হতে পারে, এ যেন মারাঠি মানুষের অস্মিতা নিয়ে শিবসেনা বা এমএনএসের মতো আঞ্চলিক দলেরই কথার প্রতিধ্বনি। আর সেই কথাই হঠাৎ সর্বভারতীয় দলের সর্বভারতীয় পরিচিতি সম্পন্ন নেতার মুখ থেকে।

খাস হিন্দি বলয়েই।

কেউ বলতেই পারেন, আসলে এটাই রাজনীতির বাস্তব। রিয়েলপলিটিক। কর্মসংস্থানের প্রশ্নে জনমানসের অসন্তোষেরই প্রতিধ্বনি করলেন তিনি। করতে বাধ্য হলেন।

এই দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এমন ক্ষোভ নতুন কিছু নয়। সাম্প্রতিক অতীতে বরং খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

কখনও গোর্খাল্যান্ডের ইস্যুতে বিমল গুরুংকে নিয়ে সিকিমের সঙ্গে মন কষাকষি হচ্ছে বাংলার। কখনও বা ডিভিসির জল ছাড়া নিয়ে প্রতিবেশী ঝাড়খণ্ডকে স্পষ্ট দুষছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কাবেরী নদীর জল নিয়ে পড়শি রাজ্য কর্নাটক ও তামিলনাড়ুর বিবাদের কথাও জানেন সবাই।

কিন্তু সাম্প্রতিক অতীতে সেই বিবাদ বাড়তে বাড়তে ক্রমশ আক্রমণের চেহারা নিয়েছে।

গুজরাতে এই কর্মসংস্থান জনিত অসন্তোষ থেকে আক্রান্ত হয়েছেন  উত্তরপ্রদেশ ও বিহার থেকে আগত মানুষরা। বাঙালি এবং বিহারীদের ওপর আক্রমণ হয়েছে অসমে। দিল্লিতে উত্তর পূর্বের পড়ুয়াদের ওপর আক্রমণও সর্বজনবিদিত। কয়েক বছর আগে, একই ভাবে সফটওয়্যার নগরী বেঙ্গালুরুও ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তারা।

এই প্রাদেশিকতা ও সংকীর্ণতার মাঝে সত্যিই কি অটুট ভারতরাষ্ট্রের ভিত্তি? নাকি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, ইউরোপে, অস্ট্রিও হাঙ্গেরিয়ান এবং অটোমান সাম্রাজ্য যেমন টুকরো টুকরো হয়ে অসংখ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল, তেমনটাই হবে এই দেশেও?

এমনিতে, প্রথম দিন থেকেই ভারতবর্ষের একতার ধারণা নিয়ে সন্দিহান অনেকে। তামিলনাড়ু বা কেরালার সঙ্গে রাজস্থান বা বাংলার ততটাই তফাত যতটা ইউরোপে ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে স্পেনের বা ব্রিটেনের সঙ্গে রাশিয়ার। সংস্কৃতিতে যতটা না মিল, অমিল তার থেকে অনেক বেশি। বহু জাতি, বহু ভাষা। অমিল জনবিন্যাসেও।

স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে, কাশ্মীর বা উত্তরপূর্বে অনেক রাজ্যেই বারবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে উগ্রপন্থা।

প্রাকৃতিক রসদ বা আয়তনেও সমান নয় এই দেশের রাজ্যগুলো। অর্থনীতির মাপকাঠিতেও মোটেও একই সারণীতে বসানো যায় না তাদের। বরং, স্বাধীনতার পরে ক্রমশ বেড়েছে তাদের অর্থনৈতিক তফাৎ।

অর্থনীতির সহজ নিয়মেই, কাজের খোঁজে, বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে এমন জায়গায় পা বাড়ান অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের মানুষ। এদের মধ্যে যেমন আছেন অদক্ষ শ্রমিকরা, তেমনই আছেন শিক্ষিত উচ্চমেধার ডাক্তার ইঞ্চিনিয়াররাও। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত বাঙালির মুম্বাই, হায়দ্রাবাদ, বেঙ্গালুরুতে এক্সোডাস দেখলেই সে কথা বোঝা যায়।

উলটোদিকে কাজ না পাওয়া স্থানীয়রা সহজ সমীকরণে দায়ী করে বসছে অন্য রাজ্য থেকে আসা এই কর্মোন্মুখ স্রোতকেই। এর থেকেই জন্ম নিয়েছে বঞ্চনার বোধ।

স্থানীয় এই বঞ্চনার বোধকে ভোটে পরিণত করার সুযোগকেই পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করেছেন রাজনীতির কারবারীরা। আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোও।

শুধু সংকীর্ণতা বা প্রাদেশিক বলে নিন্দা করলেই কিন্তু সমাধান হবে না এই বিপজ্জনক প্রবণতার। ঠিক যেমন বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতির দেশে ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’- এর এক দেশ, এক ভাষা, এক জাতির ইউটোপিয়াও চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।

ব্রিটিশদের আসার আগে গোটা দেশের অখণ্ড এককের ধারণাও খুব স্পষ্ট ছিল না। এই উপমহাদেশের অনেকটাই নিজেদের শাসনে আনতে পেরেছিল মোঘলরা। কিন্তু তারপরও এই দেশের বহু অংশেই তারা ছিল বহিরাগত, বিধর্মী শত্রু।

ইতিহাস জুড়েই এই দেশ আসলে ছিল আঞ্চলিক স্বাধীন রাজ্যের সমাহার।

স্বাধীনতার পরেই প্রথমবার জন্ম নেয় এক ভারতরাষ্ট্রের ধারণা সেই চিন্তার জনক এই দেশের সংবিধান প্রণেতারাই। বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতির এই রাষ্ট্রকে এক রাখতে গেলে যে সহনশীলতার পরিচয় দিতে হয় সে কথাই ভালোই জানতেন তাঁরা।

সেই সহনশীলতার ছিটেফোটাও কিন্তু নেই বর্তমান ভারতের বহু নেতার আচরণে।

কিন্তু এই সহনশীলতার সঙ্গে সঙ্গে বা তার থেকেও বেশি দরকার গোটা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।

দেশের বিভিন্ন অংশে অর্থনৈতিক সমতা বা রোজগারের সমান সুযোগ থাকলে, কমত কাজের খোঁজে এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে যাওয়ার প্রবণতা। যথেষ্ট কর্মসংস্থান থাকলে কম হত সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এবং এই প্রশ্নে মেরুকরণের সম্ভাবনাও।

এই অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখিয়েই কিন্তু ২০১৪ সালে  আসমুদ্রহিমাচল জনতাকে এক করে ঝড় তুলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদী।

কিন্তু শুধু বললেই তো হবে না, বাস্তবে করতে হবে।

জাতি, ধর্ম, প্রাদেশিকতা থেকে মুনাফা লুটতে উদ্যোগী রাজনীতির কারবারীরা আদৌ কি সেটা পারবেন?

Comments are closed.