স্পাইডারম্যান ও ইমিগ্রেশনের গল্প

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    জয়ন্ত চক্রবর্তী

    চোখের নিমেষে বদলে গেল ‘সুপারহিরো’ মামুদু গাসামা-র জীবন!

    এত দিনে ঘটনাটা সম্ভবত দুনিয়ার লোক জেনে ফেলেছে। মালি থেকে ফ্রান্সে আসা ২২ বছরের মামুদু গাসামা অবিকল স্পাইডারম্যানের কায়দায় মাত্র ৫০ সেকেন্ডে একটা বিল্ডিং-এর চার তলা বেয়ে উঠে ব্যালকনি থেকে ঝুলতে থাকা চার বছরের এক ফরাসি শিশুর জীবন বাঁচিয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মোবাইল ফোনে ধরা পড়েছে সেই মুহূর্ত, আর তার পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেয়ে গিয়েছে। মুহূর্তে হাজারে হাজারে, লাখে লাখে শেয়ার, প্রশংসা আর স্তুতির বন্যা, পরের দিনই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মিটিং, ফরাসি নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি, দমকল থেকে চাকরির অফার, বিশেষ সাক্ষাৎকারের জন্য তাবড় তাবড় মিডিয়া হাউসের কাড়াকাড়ি, রাস্তাঘাটে লোকজনের সেলফি তুলতে চাওয়ার আবদার! মামুদু গাসামা-র জীবনটা সত্যিই চোখের নিমেষে একদম বদলে গিয়েছে। অবৈধ অভিবাসী (ইমিগ্র্যান্ট) থেকে এক লহমায় ফরাসি নাগরিক হয়ে গিয়েছেন তিনি! স্বাধীনতা, সমতা ও সৌভ্রাতৃত্বের দেশ ফ্রান্স দু’হাত বাড়িয়ে আপন করে নিয়েছে তাঁকে। তিনি হলেন ‘ভাল অধিবাসী’ (গুড ইমিগ্র্যান্ট)। তাঁর মতো বিদেশীদেরই প্রয়োজন ফ্রান্সের, যাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিঃস্বার্থ ভাবে এমন কাজ করতে পারেন!

    পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব : স্পাইডারম্যান ও ইমিগ্রেশনের গল্প/ ২

    এ ঘটনার শেষটা সুন্দর। এমনটা অবশ্য নতুন নয়। এর আগে লাসানা বাথিলি নামে মালি থেকেই আসা আর এক অবৈধ অভিবাসীকে নাগরিকত্ব দিয়েছিল ফ্রান্স সরকার। ২০১৫ সালের ৯ জানুয়ারি, প্যারিসের শার্লি এবদো পত্রিকার অফিসে হামলার দিনে যখন সন্ত্রাসবাদীরা এক ইহুদি সুপারমার্কেটে বেশ কিছু মানুষকে আটকে রেখেছিল, তখন এই লাসানা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। এ রকম ঘটনা আরও ঘটেছে। ইন্টারনেট ঘাঁটলে উদাহরণ খুঁজে পাওয়া আজকের দিনে এমন কিছু দুরূহ নয়।

    তা হলে এই গল্পের মোদ্দা বক্তব্যটা কী? ফ্রান্সে বা ইউরোপে আসা অভিবাসী বা শরণার্থীদের আগে অসাধারণ কিছু করে দেখাতে হবে, তবেই তাঁরা একটা ভদ্রসভ্য জীবন উপহার পাবেন? এই অধিবাসীরা সংখ্যায় ঠিক কত? কেন আসছেন তাঁরা? কী ভাবে? কোন পরিস্থিতিতে?

    পড়ুন তৃতীয় পর্ব : স্পাইডারম্যান ও ইমিগ্রেশনের গল্প/ ৩

    আমাদের এই ‘স্পাইডারম্যান’ যেমন লিবিয়ায় জেলে কিছু কাল কাটানোর পরে পশ্চিম আফ্রিকার নাইজের ও বুরকিনা ফাসো পেরিয়ে, ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করে দ্বিতীয় বারের চেষ্টায় ইতালিতে এসে পৌঁছেছিলেন। মামুদু-র জন্ম পশ্চিম মালি-র কায়েস অঞ্চলের ইয়াগিনে-তে। গরিব চাষি পরিবার। ন’ভাইবোনের মধ্যে মামুদু ষষ্ঠ। পরিবারকে বাঁচাতে খুব কম বয়সেই মাঠে নেমে কাজে লাগতে হয়েছে তাঁকে। মালি-র মতো অনগ্রসর দেশে (যা কি না এককালে ফরাসি কলোনির অংশ ছিল) এই একই গল্প ঘরে ঘরে। মামুদু-র মা মারা যান ২০১১ সালে। আইভরি কোস্টে কাজে পাঠানো হয় মামুদু-কে। কিন্তু তত দিনে গৃহযুদ্ধ শুরু, অগত্যা ঘরে ফিরে আসতে বাধ্য হন মামুদু।

    গৃহযুদ্ধ এড়ানোর পক্ষে মালি মোটেই খুব একটা অনুকূল ছিল না। ২০১২-র জানুয়ারি থেকে উত্তর এবং দক্ষিণ মালি-র মধ্যে সশস্ত্র দ্বন্দ্ব শুরু হয়। দ্য ন্যাশনাল মু‌ভমেন্ট ফর দ্য লিবারেশন অফ আজাওয়াড় (এমএনএলএ) নামে এক সংগঠন  দীর্ঘ দিন ধরেই মালি-র অংশটিকে তুয়ারেগ প্রজাতির মানুষদের স্বাধীন বাসভূমি বানানোর লক্ষ্যে লড়াই করছিল। প্রেসিডেন্ট আমাদু তুমানি তুরে পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হন, তাই ২০১২-র ২২ মার্চ তাঁকে তাঁর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করে বিদ্রোহী সেনারা, এবং ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য রেস্টোরেশন অফ ডেমোক্রেসি অ্যান্ড স্টেট (সিএনআরডিআর)’ নামে সমগ্র মালি-র শাসনব্যবস্থা ও সংবিধান নিজেদের হাতে তুলে নেয় তারা।

    এর পরে মালি-র উত্তরের তিন বড় শহর কিডাল, গাও এবং টিম্বুকটু পুরোপুরি এমএনএলএ-র কব্জায় চলে যায়। অবশেষে ২০১২-র ৫ এপ্রিল এমএনএলএ ঘোষণা করে যে তারা তাদের লক্ষ্যপূরণ করতে পেরেছে। তাই তারা তাদের আক্রমণাত্মক অবস্থান থেকে সরে আসছে। পরের দিন উত্তর মালি-কে বাকি দেশের থেকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করা হয়, এবং স্বাধীন রাষ্ট্রটির নাম দেওয়া হয় আজাওয়াড়।

    প্রথম দিকে আনসার দিনে নামে এক মুসলিম গোষ্ঠী এমএনএলএ-কে সাহায্য করত। কিন্তু উত্তর মালি দখলের পরে আনসার দিনে এব‌ং ইসলাম অধুষ্যিত আফ্রিকায় আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ইসলাম গোষ্টীরা স্থানীয় মানুষের উপরে শরিয়তি আইন কায়েম করতে শুরু করে। এমএনএলএ এবং আনসার দিনে-র দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যে বড়সড় ফারাক থেকে যাচ্ছিল, এবং নতুন রাষ্ট্রের সূচনাতেই তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাঁধছিল। ২০১২-র ১৭ জুলাইয়ের মধ্যে এমএনএলএ উত্তর মালি-র প্রায় সব শহরের দখল হারায় এবং কর্তৃত্ব চলে যায় ইসলামিক গোষ্ঠীর হাতে।

    এর পরে উত্তর মালি পুনর্দখলের জন্য মালি সরকার বিদেশি রাষ্ট্রের মধ্যস্থতা চায়। ফলে ২০১৩-র ১১ জানুয়ারি ফরাসি সেনাবাহিনী ইসলামিক গোষ্ঠীর মোকাবিলায় নামে। আফ্রিকান ইউনিয়নের অন্যান্য দেশও দ্রুত সেই পথে আসতে থাকে। (ক্রমশ)

    লেখক প্যারিসের ‘মাল্টিডায়মেনশন’ ম্যাগাজিনের ডিরেক্টর)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More