মঙ্গলবার, অক্টোবর ২২

স্পাইডারম্যান ও ইমিগ্রেশনের গল্প/ ৪

জয়ন্ত চক্রবর্তী

লাম্পেদুসা দ্বীপটার আয়তন ২০.২ বর্গ কিলোমিটার, ৬০০০ মানুষের বাস। বাসিন্দাদের মূল জীবিকা মাছধরা আর পর্যটন শিল্প।

২০১১ সালের মে মাসের মধ্যে উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ায় পুরোদমে শুরু হয়ে গেল ‘আরব স্প্রিং’ বা আরব বিপ্লব। ফলে তিউনিশিয়া ও লিবিয়া থেকে প্রায় ৩৫০০০ অভিবাসী এসে পৌঁছল লাম্পেদুসা দ্বীপে। অগস্ট শেষ হতে না হতে সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়াল ৪৮০০০-এ। তাদের মধ্যে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী মুসলিম তরুণদের সংখ্যাই ছিল সবচেয়ে বেশি। এত সংখ্যক শরণার্থীদের জায়গা দেওয়ার জন্য ইতালি বারবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে সাহায্য চেয়েও বিফলমনোরথ হল, আর তার ফলস্বরূপ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশের সম্পর্কের মধ্যে ভাঙন ধরতে শুরু করল। ইতালিতে ভাল ভাবে থাকার বা সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পথে অনেক অসুবিধে। তাই এই অভিবাসীরা ফ্রান্স বা জার্মানির মতো অপেক্ষাকৃত ধনী দেশে ছড়িয়ে যেতে শুরু করল। ব্রিটেনে চলে যাওয়ার পরিকল্পনাও শুরু করল অনেকে।

২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি সশস্ত্র দুই জঙ্গি (সৈয়দ ও শেরিফ কুয়াশি) প্যারিসে ‘শার্লি এবদো’ পত্রিকার অফিসে ঢুকে গুলি চালিয়ে ১২ জনকে হত্যা করল। বহু দিন ধরেই নবী মহম্মদকে নিয়ে নানা ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদীদের ক্রোধের কবলে পড়েছিল এই পত্রিকা। এই ঘটনার দু’দিন পরে আর এক আইএস জঙ্গি এবং কুয়াশি ভাইদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমেদি কুলিবালি সশস্ত্র অবস্থায় ইহুদিদের এক ফুড সুপারমার্কেট (কশের ফুড সুপারমার্কেট) আক্রমণ করে বেশ কিছু সাধারণ মানুষকে আটক করে। চার জন মারা যান। তখন ওই সুপারমার্কেটের এক কর্মী লাসানা বাথিলি (মালি থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী) আটক হওয়া অনেক মানুষকে কোল্ড স্টোরেজে লুকোতে সাহায্য করে তাঁদের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। এই ঘটনার ১১ দিন পরে ফ্রান্স সরকার বাথিলি-কে ফরাসি নাগরিকত্ব দিয়ে সম্মানিত করে। এই সন্ত্রাসবাদী হামলাগুলোর পরে চরম দক্ষিণপন্থী দল ন্যাশনাল ফ্রন্টের পক্ষে ফ্রান্সে তাদের ঘাঁটি শক্ত করাটা সহজ হয়ে গেল, এবং নিজেদের ইউরোপ-বিরোধী, অভিবাসন-বিরোধী, মুসলিম-বিরোধী তকমাটাকে আরও শক্তিশালী করে তুলল। তবে এ কথাটা কেউ তেমন একটা উল্লেখ করল না যে লাসানা বাথিলি-ও আদতে একজন মুসলিমই।

পড়ুন প্রথম পর্ব : স্পাইডারম্যান ও ইমিগ্রেশনের গল্প

পুরো ২০১৫ সাল ধরেই ইউরোপে অভিবাসীদের সংখ্যা প্রবল ভাবে বাড়তে শুরু করল। প্রধানত সিরিয়া, এ ছাড়া পশ্চিম এশিয়া, এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে প্রায় দশ লক্ষেরও বেশি অভিবাসী ইউরোপের সীমান্তে হাজির হল। আর এদের সিংহভাগই ছিল মুসলিম। সে বছর ভূমধ্যসাগর পেরোতে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন ৩,৭৭০-এরও বেশি মানুষ।

জার্মানিতে ২০১৫ সালে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আবেদন জমা পড়ে, নতুন আবেদনের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লক্ষ। এ দিক থেকে হাঙ্গেরি ছিল দু’নম্বরে, কারণ গ্রিস ও পশ্চিম বালকান পেরিয়ে বিপুল সংখ্যায় সেখানে পৌঁছেছিলেন অভিবাসীরা। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ পর্যন্ত প্রায় ১,৭৭, ১৩০ আবেদন জমা পড়ে, হাঙ্গেরি-র মোট জনসংখ্যার তুলনায় এই পরিসংখ্যান ছিল বেশ বেশি। সর্বোপরি হাঙ্গেরিতে গোঁড়া খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী অনুভূতি বেশ শক্তিশালী। ফলে হাঙ্গেরি শরণার্থী সমস্যাকে কঠোর হাতে দমন করতে শুরু করল। সীমানা বন্ধ করে দিয়ে, অবৈধ অভিবাসীদের আটক করতে শুরু করল হাঙ্গেরি সরকার। তবে হাঙ্গেরির এই ‘অমানবিক’ কার্যকলাপ নিয়ে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট উত্তপ্ত হয়ে উঠল। ফ্রান্সে সে বছর এই আবেদনপত্রের সংখ্যাটা ৯০০০০ ছুঁয়েছিল।

পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব : স্পাইডারম্যান ও ইমিগ্রেশনের গল্প/ ২

২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বর আইএসআইএস জঙ্গি সংগঠন এক সঙ্ঘবদ্ধ সন্ত্রাসবাদী হামলা চালায় ফ্রান্সে। এই হামলাগুলোর পিছনে ফ্রান্সের অধিবাসী এবং বিদেশী দু’ধরনের মুসলিম জঙ্গিদেরই হাত ছিল। পুরনো ফরাসি উপনিবেশগুলো থেকে শরণার্থী হিসেবে ফ্রান্সে আসা পরিবারের তরুণ প্রজন্মদের মূল স্রোতে নিয়ে আসার বিষয় নিয়ে ফরাসি সরকার আগে থেকেই যথেষ্ট সমস্যায় ভুগছে। পরপর সন্ত্রাসবাদী হামলার ফলে আরও একবার সেই সমস্যা বৃহত্তর আকারে সামনে চলে আসে। ২০১৬ সালের ১৪ জুলাই আবার ফ্রান্সে এবং সেই সঙ্গে বেলজিয়াম, জার্মানি এবং ইংল্যান্ডে একই ধরনের সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়।

সাগরের অপর পারে তখন পশ্চিম এশিয়ার সংকট ইয়েমেন পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। আর শিয়া রাষ্ট্র ইরান এবং সৌদি আরব পরিচালিত সুন্নি ফ্রন্টের মধ্যেকার ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ আরও ভয়াবহ আকার নেওয়ায় সিরিয়ায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগমন সিরিয়ার যুদ্ধে এক নতুন মোড় আনল। রাশিয়া আরও জোরালো ভাবে আসাদ-এর সহযোগিতা শুরু করল যাতে বিক্ষোভকারীদের হাত থেকে তিনি তাঁর এলাকা পুনর্দখল করতে পারেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খোলাখুলি ঘোষণা করতে শুরু করল যে আইএস জঙ্গিগোষ্ঠীর দমনকেই তারা সবচেয়ে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, আসাদের ক্ষমতা থেকে অপসারণকে নয়।

পড়ুন তৃতীয় পর্ব : স্পাইডারম্যান ও ইমিগ্রেশনের গল্প/ ৩

২০১৭-র মে মাসে ফ্রান্সে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অদ্ভুত ভাবে দুই প্রধান রাজনৈতিক দল, ডান ও বাম, নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় কোয়ালিফাই করতে ব্যর্থ হয়। পুঁজিবাদী অর্থনীতির সংকটের সুযোগে ফাইনাল রাউন্ডের দুই প্রতিপক্ষের মধ্যে ছিলেন নব্য উদারপন্থী ইম্যানুয়েল মাকরঁ- যাঁর লক্ষ্য বৃহত্তর ইউরোপ, সেই সঙ্গে বাজারকে মুক্ত করে বেসরকারিকরণকে শক্তিশালী করে মানুষের জীবনে রাষ্ট্রের ভূমিকা কমিয়ে আনা। অন্য দিকে ছিলেন জাতীয়তাবাদী ও চরম অভিবাসন-বিরোধী মারিন লো পেন- যাঁর লক্ষ্য এক শক্তিশালী রাষ্ট্র যেখানে শুধুমাত্র ফরাসি নাগরিকেরা যাবতীয় সরকারি পরিষেবা ও সুযোগসুবিধা পাবেন এবং ফ্রান্সের খ্রিস্টান চরিত্র বজায় থাকবে। মারিন লো পেন যদিও বিপুল ভোটে হারলেন, তবে ভোটের সার্বিক ফলে তাঁর দলের অস্তিত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো (২০০২ সালের থেকে ২ গুণ বেশি)। ফলে বোঝা গেল যে ফরাসি জনমানসে বড়সড় পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা ক্রমশ বাড়ছে।

শাসক দলের বিরুদ্ধে জনসাধারণের ক্ষোভকে হাতিয়ার করে ইম্যানুয়েল মাকরঁ-র নতুন দল ‘‘লা রেপুবলিক অঁ মার্শ’’ (রিপাবলিক এগিয়ে চলেছে) সত্যি সত্যি রাষ্ট্রশক্তি দখলের লড়াইতে বহু পা এগিয়ে গেল অন্য দলগুলোর তুলনায়। তাঁর এই নতুন দলে বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী দুই দলের মাথারাই ছিলেন। জুন মাসে পার্লামেন্ট নির্বাচলে বিপুল ভোটে জয়ী হল মাকরঁ-র দল। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের উদ্দেশ্যে নানাবিধ পদক্ষেপ নিতে শুরু করল। ফ্রান্সে বিদেশীদের আশ্রয় দানের ক্ষেত্রেও আইনে বদলের প্রস্তাব এল।

আমাদের গল্পের সুপারহিরো মামুদু গাসামা ইতিমধ্যে ইতালিতে কয়েক বছর কাটিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু সেখানে নিরাপদ ভবিষ্যতের কোনও আশ্বাস নেই। মানুষজন অভিবাসীদের প্রতি বড়ই বিরূপ। তাই গাসামা অবশেষে ফ্রান্সে এসে পৌঁছলেন। তাঁর বড় ভাই অনেক দিন ধরেই শান্তিতে বসবাস করছেন ফ্রান্সে। গাসামা আশায় ছিলেন যে তিনিও তাঁর ভাইয়ের মতোই পাকাপাকি ভাবে থেকে যেতে পারবেন ফ্রান্সে।

২০১৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফরাসি সরকারের মন্ত্রিসভা রাজনৈতিক আশ্রয়ের নিয়মকানুন আরও কড়া করে দেওয়ার প্রস্তাব-সহ এক খসড়া বিল আনল। যাঁরা অবৈধ ভাবে ফ্রান্সে রয়েছেন, তাঁরা পুলিশের হাতে ধরা পড়লে ৯০ দিন পর্যন্ত আটক থাকতে পারেন। বিতাড়িত করার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এই আটকের সময়সীমা ১৩৫ দিন পর্যন্ত বাড়তে পারে। এ ছাড়া অবৈধ ভাবে ফ্রান্সে প্রবেশ করলে ১ বছরের কারাদণ্ড ও ৩৭৫০ ইউরো জরিমানার প্রস্তাব করা হয়। বহু বিতর্কের পরে কিছু সংশোধনী-সহ বিলটি পার্লামেন্টের নিম্ন কক্ষে পাশ হয়ে যায় গত ২২ এপ্রিল এবং আলোচনার জন্য উচ্চ কক্ষ সেনেটে পাঠানো হয়।

২৬ মে সাধারণ অবৈধ এক অভিবাসী মামুদু গাসামা স্পাইডারম্যানের মতো একটা বিল্ডিং-এর চার তলা বেয়ে উঠে ব্যালকনি থেকে ঝুলতে থাকা চার বছরের এক ফরাসি শিশুর জীবন বাঁচালেন। আর তাঁর এই সুপারহিরো-সুলভ কাজ এক লহমায় বদলে দিল তাঁর জীবনটা। মামুদু গাসামা এখন ফরাসি নাগরিক, এক জন ভাল মুসলিম। তাঁর আর বিতাড়িত হওয়ার ভয় নেই।

(লেখক প্যারিসের ‘মাল্টিডায়মেনশন’ ম্যাগাজিনের ডিরেক্টর)

Leave A Reply