রবিবার, মার্চ ২৪

স্পাইডারম্যান ও ইমিগ্রেশনের গল্প/ ৩

জয়ন্ত চক্রবর্তী

সাগরের অপর পারে তত দিনে জন্ম নিয়েছে অন্য প্রেক্ষাপট। ইউরো-র শক্তিশালী মুদ্রা হয়ে ওঠার স্বপ্ন বেশ ধাক্কা খেয়েছে।

২০১১ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে গ্রিসে সার্বিক আত্মহত্যার হার ৩৫%  বেড়ে যায়। বেশির ভাগই মাঝবয়েসী পুরুষ, প্রতিদিন গড়ে দু’জন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যার হারের এই বৃদ্ধির পিছনে মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক সংকট। অথচ ২০০০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ইউরো-জোন অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে গ্রিসের অর্থনীতির বৃদ্ধিই ছিল সবচেয়ে দ্রুত, বার্ষিক গড়ে প্রায় ৪.২%। তখন গ্রিসে হু-হু করে ঢুকছিল বিদেশী মূলধন। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল আর্থিক ঘাটতি। ১৯৯৯ সালে যেখানে বাণিজ্যিক ও আর্থিক ঘাটতি ছিল দেশের সার্বিক আয়ের (জিডিপি) ৫ শতাংশেরও কম, সেখান থেকে ২০০৮-০৯ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়ায় সার্বিক আয়ের ১৫ শতাংশে।

এ দিকে ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা থাবা বসাতে শুরু করেছিল গোটা ইউরোপ জুড়ে। জার্মানির মতো ধনী ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে গ্রিসের মতো সীমান্তবর্তী দেশে যে আর্থিক অনুদান আসত, তাও ক্রমশ কমতে শুরু করেছিল। পর্তুগাল, আয়ারল্যান্ড, স্পেন এবং সাইপ্রাসের মতো ইউরো-জোনের সদস্য দেশগুলো নিজেদের দায়িত্বে সরকারের ঋণ শোধ করতে বা ঋণগ্রস্ত ব্যাঙ্কগুলোর চাপ কমাতে সক্ষম হচ্ছিল না। ফলে তাদেরও ইউরো-জোনের অন্যান্য দেশ, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক, আইএমএফ অথবা বিশ্ব ব্যাঙ্ক (ত্রয়িকা)-এর মতো তৃতীয় পক্ষের সাহায্য নিতে হচ্ছিল।

পড়ুন প্রথম পর্ব : স্পাইডারম্যান ও ইমিগ্রেশনের গল্প

এই অর্থনৈতিক ডামাডোলে গ্রিসে একের পর এক সরকার ত্রয়িকার চাপের কাছে মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়, এবং সমাজকল্যাণ ও বেসরকারিকরণের পিছনে ব্যয় বহুলাংশে কমাতে হয় তাদের। ২০১০-এর মাঝামাঝি থেকে ২০১৪ পর্যন্ত সময়ে গ্রিসে সাধারণ মানুষের বেতনের হার প্রায় ২০ শতাংশ কমে যায়। ২০০৩ সালে যেখানে বেকারত্বের হার ছিল ১০ শতাংশেরও নীচে, সেখান থেকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ শতাংশে। এর ফলস্বরূপ দেশ জুড়ে অশান্তি, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ছড়িয়ে পড়ে। ধনীরা আরও ধনী হতে শুরু করেন। পুঁজিবাদ তার নিজস্ব সংকট কাজে লাগিয়ে এক নতুন রাজনীতির জন্ম দেয়, যার বলি হয় মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্রেরা। এই দুই শ্রেণীর মধ্যে তুমুল দ্বন্দ্ব বেঁধে যায়। দেশে চরম দক্ষিণপন্থীরা মাথা চাড়া দিতে থাকে এবং অভিযাত্রী ও শরণার্থীদের উপরে হামলার ঘটনা বাড়তে থাকে।

পৃথিবীর অন্য প্রান্তে

সিরিয়ার সংকট ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতর হতে শুরু করে, এবং সেই সংকটের কবলে পড়ে সংলগ্ন আরও কিছু দেশ। গণতন্ত্রের প্রসার এবং আসাদের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পতনের ছুতোয় পশ্চিমি শক্তিশালী রাষ্ট্রেরা অভ্যুত্থানকারীদের পাশে দাঁড়াতে চাইছিল। কিন্তু তাদের অন্য নানা উদ্দেশ্য ছিল। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এই ‘মহান’ যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি সৌদি আরব, কাতার, তুরস্কও যোগ দেয়।

পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব : স্পাইডারম্যান ও ইমিগ্রেশনের গল্প/ ২

বস্তুত, ২০০৩ সালে সাদ্দাম হুসেনের পতনের সময়ে গোটা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছিল, কী ভাবে পশ্চিমি শক্তিগুলো ইরাকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে এক অ্যাডভেঞ্চারে মেতে গোটা দেশ জুড়ে এক চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। এই গোলমেলে অবস্থার সুযোগে পুরনো শত্রু আল-কায়দা ক্রমশ আরও গুরুতর বিরুদ্ধ শক্তিতে পরিণত হল ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভ্যান্ট (আইএসআইএল) নামে।

২০১৪ সালের জানুয়ারিতে আইএসআইএল ইরাকি সেনাকে পিছু হঠতে বাধ্য করে এবং ইরাকের দখল নিতে শুরু করে। ৪ জুন বিদ্রোহীরা উত্তর ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুল দখলের লড়াই শুরু করে। ছ’দিনের যুদ্ধের পরে শহরটা শেষমেশ আইএসআইএল-এর দখলে চলে যায়। এই অশান্ত পরিস্থিতিতে প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ শহর ছেড়ে পালান। ২০১৪-র জুনে এই আইএসআইএল গোষ্ঠী নিজেদের ইসলামিক স্টেটের তকমা দেয়। সেই সঙ্গে তারা তামাম দুনিয়ার মুসলিমদের উপরে ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামরিক কর্তৃত্ব দাবি করে।

আইএসআইএস ইরাক ও সিরিয়ার একটা বড় অংশ দখল করে নেয়। তারা বেশ সাফল্যের সঙ্গে নিজেদের ভাবমূর্তি তৈরি করতে পেরেছিল। বেলজিয়াম, ফ্রান্স এবং ব্রিটেনের মতো দেশে থাকা মুসলমাল তরুণ অভিবাসীদের হতাশার সুযোগ নিয়ে আইএসআইএস গোষ্ঠী তাদের কাছে ইসলামের এক ঐশ্বরিক স্বপ্ন বিক্রি করতে সক্ষম হয়ে যায়। আর সেই তরুণরাও জিহাদের জন্য নিজেদের জীবন বলি দিতে তৈরি হয়ে যায়। এর এক অংশ ছিলেন মহিলারাও।

২০১৪-র মধ্যে পশ্চিম এশিয়া গণতন্ত্র বিপ্লবের এক সন্দেহজনক ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল। অন্য দিকে, মালি-র গৃহযুদ্ধ এক ভিন্ন চেহারা নেয়। ইসলামীয় গোষ্ঠী এমএনএলএ পরাজিত হয়ে পিছু হঠতে শুরু করে। ২০১৩-র ১৮ জুন মালি সরকার এবং তুয়ারেগ বিপ্লবী (এমএনএলএ)-দের মধ্যে এক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু সরকার পক্ষ থেকেই নিরস্ত্র প্রতিবাদীদের উপরে গুলি চালানো হয় বলে এমএনএলএ সেপ্টেম্বরে যুদ্ধবিরতি তুলে নেয়। ২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জার্মানি এবং ফ্রান্স ঘোষণা করে, তারা মালি-তে ফ্রাঙ্কো-জার্মান ব্রিগেডের সাহায্য পাঠাচ্ছে যাতে মালি-র সেনাবাহিনী নিজেদের উন্নত ও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে পারে। এই ভাবেই প্রথম আফ্রিকায় ইউরোপীয় বাহিনীর বিস্তৃতি শুরু হয়।

আর ঠিক এই সময়েই আমাদের ‘স্পাইডারম্যান’ মামুদু গাসামা ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে তাঁর স্বপ্নের মহাদেশ ইউরোপে পা রাখতে যাচ্ছিলেন, যেখানে তাঁর বড় ভাই অনেক বছর আগেই চলে এসেছেন এবং সচ্ছল জীবন পেয়েছেন। তা হলে আমরা তাঁর এই অভিযাত্রাকে কোন ভাগে রাখব, রাজনৈতিক নাকি অর্থনৈতিক?

(লেখক প্যারিসের ‘মাল্টিডায়মেনশন’ ম্যাগাজিনের ডিরেক্টর)

Shares

Leave A Reply