বুধবার, মার্চ ২০

স্পাইডারম্যান ও ইমিগ্রেশনের গল্প/ ২

জয়ন্ত চক্রবর্তী

১৭ ডিসেম্বর, ২০১০, সকাল ১১-৩০। পেশায় ফেরিওয়ালা, বছর ছাব্বিশের এক যুবক মোহামেদ বুয়াজিজি সিদি বুজিদের গর্ভনর অফিসের সামনে নিজের গায়ে আগুন দেন। তিউনিশিয়ার এক ছোট্ট শহর সিদি বুজিদ। সেখানকার পুরসভার এক দুর্নীতিগ্রস্ত অফিসার ও তাঁর সহকারীরা জোর করে বুয়াজিজি-র ফেরি করার গাড়ি কেড়ে নিয়ে তাঁকে চূড়ান্ত অপমানিত করেছিলেন। সেই অসম্মানের প্রতিবাদেই এমন কাণ্ড ঘটান বুয়াজিজি।

প্রাণে বাঁচেননি মোহামেদ বুয়াজিজি। আর তাঁর এই ঘটনায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সিদি বুজিদের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ-বিপ্লব শুরু হয়ে যায়। পরবর্তী দু’সপ্তাহ ধরে বিপ্লব আরও জোরালো হয় এবং গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিপ্লবীদের স্লোগান ছিল, ‘কাজ, খাবার আর জাতীয় মর্যাদা’। প্রসঙ্গত, তিউনিশিয়া এমন এক দেশ যেখানে যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বাক্ষরতার হার ৯৫ শতাংশ এবং বেকারত্বের হার ৩০ শতাংশ। প্রেসিডেন্ট জিনে এল-আবিদিনে বেন আলি-র জমানায় রাষ্ট্র শক্ত হাতে যে কোনও প্রতিবাদের কণ্টরোধ করত, যা থেকে পরবর্তীতে প্রবল এক রক্তক্ষয়ী বিপ্লব জন্ম নেয়। সেই প্রতিবাদ-বিপ্লবে ফেসবুক, টুইটারের মতো সোশ্যাল মিডিয়ারও বড় ভূমিকা ছিল। সরকার-শাসিত সংবাদমাধ্যমে সব সময়ে সঠিক খবর তুলে ধরা হতো না। তাই সাধারণের জন্য বিকল্প গণমাধ্যম হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। সেই প্রতিবাদ-বিপ্লব এমন ভয়াবহ চেহারা নেয় যে ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি সপরিবার তিউনিশিয়া ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন প্রেসিডেন্ট বেন আলি। তাঁর ২৩ বছরের শাসনকালে হঠাৎ দাঁড়ি পড়ে যায়। উত্তর আফ্রিকার ফরাসি উপনিবেশের এক অংশ ছিল তিউনিশিয়া, ১৯৫৭ সালে তা স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৮৭ সালে বেন আলি ক্ষমতায় আসার পর থেকে পরপর সব ফরাসি সরকারেরই সাহায্য পেয়ে আসছিলেন, কারণ তিনিও উপনিবেশ-উত্তর স্বাধীন তিউনিশিয়া থেকে ফ্রান্সকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তাই দেশ থেকে পালিয়ে প্রথমে প্যারিসে যাওয়ার চেষ্টা করলেন বেন আলি। কিন্তু ফ্রান্সেও তিউনিশিয়া থেকে আসা মানুষের সংখ্যা নেহাৎ কম নয়। তাই ফরাসি সরকারের আশঙ্কা ছিল বেন আলিকে আশ্রয় দিলে জনগণের মধ্যে প্রবল বিরুদ্ধ মনোভাব তৈরি হতে পারে। তাই প্যারিসে খুব একটা সুবিধে হল না, শেষমেশ সৌদি আরবে ঠাঁই পেলেন বেন আলি।

পড়ুন প্রথম পর্ব : স্পাইডারম্যান ও ইমিগ্রেশনের গল্প 

এত দিন ধরে মিশর, আলজিরিয়া, মরক্কো, লিবিয়া, ইয়েমেন, সিরিয়া, বাহরিনের মতো আরব দেশগুলোর যুবসমাজের মধ্যে গণতন্ত্র পাওয়ার খিদেয় যে আগুন জমছিল, তিউনিশিয়ার এই পরিবর্তন সেই আগুনে ঘি ঢালল। মিশরে হোসনি মুবারকের ৩১ বছরের শাসনের পতন হতে মাত্র ১৮ দিন সময় লেগেছিল। পশ্চিমি শক্তিগুলো ‘নাটো’ তকমার আড়ালে এই অশান্ত পরিস্থিতির সুযোগ নিতে শুরু করল, সেই সঙ্গে জন-অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের শত্রুদের একের পর এক সরিয়ে দিতে শুরু করল।

তাই প্যারিসে খুব একটা সুবিধে হল না, শেষমেশ সৌদি আরবে ঠাঁই পেলেন বেন আলি।

পড়ুন তৃতীয় পর্ব : স্পাইডারম্যান ও ইমিগ্রেশনের গল্প/ ৩

২০১১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি লিবিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বেনগাজি-তে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল, শুরু হল আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ। বিক্ষোভ ক্রমশ বিপ্লবের আকার নিল। মুয়াম্মার গদ্দাফি-র বিরোধী পক্ষ অন্তর্বর্তী এক ‘ন্যাশনাল ট্রানসিশনাল কাউন্সিল’ প্রতিষ্ঠা করল, আর ফলস্বরূপ লিবিয়ায় পুরোদমে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। ত্রিপলি-তে বিক্ষোভকারীদের উপরে বোমা ফেলার অভিযোগ উঠল গদ্দাফি-বাহিনীর বিরুদ্ধে। আর ২৬ ফেব্রুয়ারি নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘রেজলিউশন ১৯৭০’-র প্রস্তাব রাখল। বেনগাজি-র অভ্যুত্থানের পরে রাষ্ট্রপুঞ্জে লিবিয়ার রাষ্ট্রদূত আব্দুর রহমান মোহামেদ শালগাম গদ্দাফি-র পক্ষ ছেড়ে বিক্ষোভকারীদের পক্ষ নিয়েছিলেন। তিনি বৈঠকে চিন, ভারত ও রাশিয়াকে অনুরোধ করেন প্রাথমিক রেজলিউশনে সহযোগিতা করার জন্য। গদ্দাফির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ও তাঁর গতিবিধির উপরে বিধিনিষেধ আরোপ করার প্রস্তাব দেন আব্দুর রহমান। এর পরে বিষয়টিকে তদন্তের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্টে পাঠানো হয়। ইতিমধ্যে গদ্দাফি-বাহিনী দেশের বেশির ভাগ অংশ পুনর্দখল করে নেয় এবং প্রায় বেনগাজি-র দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। ২০১১ সালের ১৭ মার্চ ফ্রান্স, লেবানন ও ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য ‘রেজলিউশন ১৯৭৩’-এর প্রস্তাব আনে এবং নিরাপত্তা পরিষদ লিবিয়ার জন্য একটি ‘নো-ফ্লাই’ জোন নির্দিষ্ট করে দেয়। তবে স্থায়ী সদস্য রাশিয়া, চিন এবং অস্থায়ী সদস্য ব্রাজিল, জার্মানি ও ভারত ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে। রেজলিউশনের নামে ন্যাটো শক্তি বম্বিং ক্যাম্পেন শুরু করে, যার পুরোধায় ছিলেন তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি। এই সময়ে কানাঘুষো শোনা যায়, সারকোজি-র নির্বাচনী প্রচারের সময়ে লিবিয়া সরকার ৫০ মিলিয়ন ইউরো (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা) দান করেছিল।

সরকারের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এলেও বিরোধী পক্ষ তা নাকচ করে দেয়। ন্যাটো-র বোমাবৃষ্টির সহযোগিতায় ২৪ অগস্ট বিক্ষোভকারীরা রাজধানী ত্রিপলি দখল করে নেয়। গদ্দাফি গা ঢাকা দেন। তাঁর বাহিনী দেশের বিভিন্ন অংশে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। ১৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপুঞ্জ ‘ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’কে স্বীকৃতি দেয়। ২০ অক্টোবক গদ্দাফি ধরা পড়েন এবং মারা যান। কিন্তু বহু উপজাতি অধ্যুষিত লিবিয়া, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোল খনি লিবিয়া শান্তি ফিরে পায় কি? গদ্দাফি-পরবর্তী সময়ে লিবিয়া বিভিন্ন সশস্ত্র বাহিনীর হাতে চলে যায়। তাদের আগ্রহ ও লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। তারা ন্যাশনাল কাউন্সিলের কর্তৃত্ব অস্বীকার করে। ফলে লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ ও অরাজকতা গভীরতর হয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে চলে যায়। লিবিয়া মূল ইউরোপের ভূখণ্ডের সীমানা, মাঝে শুধু এক সমুদ্রের ব্যবধান। মাঝে রয়েছে লাম্পেদুসা নামে এক দ্বীপ, যেটা ইতালির অংশ। সেই পর্যন্ত পৌঁছতে পারলেই স্বপ্নের মহাদেশ ইউরোপের হাতছানি, সুস্থ-সুন্দর দারিদ্র্যমুক্ত জীবনের প্রতিশ্রুতি।

অন্য দিকে, ২০১১-র জুলাইয়ে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ বাঁধে। সেই গৃহযুদ্ধ এখনও চলছে। প্রায় ৫০ লক্ষ রিফিউজি সিরিয়ার বাইরে অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন। দেশের মধ্যেও প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ বাস্তুহারা। আর তিউনিশিয়ার বিপ্লবের পরেও সরকার সাধারণ জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে বা সাধারণ মানুষের মনে জমে ওঠা অসন্তোষের মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়। ফলে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ রয়েই যায়।

এমন সময়েই আমাদের সুপারহিরো, স্পাইডারম্যান মামুদু গাসামা (তখন মালি থেকে আসা বছর আঠেরোর তরুণ) বিভিন্ন দেশের শরণার্থীতে ঠাসা ভাঙাচোরা এক নৌকায় চড়ে ইউরোপে পৌঁছন। সময়টা ছিল ২০১৪-র শীতের শুরু। আর লিবিয়ায় শুরু হয়েছে দাসব্যবসা। তার থেকে বাঁচতে কত মানুষ যে ওই সমুদ্র পেরোতে গিয়ে প্রাণে মারা গিয়েছেন!

অবশ্য গণতন্ত্রের স্বাদ পেতে গেলে কিছু তো দিতেই হয় বিনিময়ে! কিন্তু পশ্চিমি সভ্যতায় গণতন্ত্রের মানে আসলে কী? (ক্রমশ)

লেখক প্যারিসের ‘মাল্টিডায়মেনশন’ ম্যাগাজিনের ডিরেক্টর)

Shares

Leave A Reply