মঙ্গলবার, অক্টোবর ২২

ভাঙল বিজেপিডিপি’র হাঁসজারু জোট, সামনে লোকসভা ভোট

শমীক ঘোষ: ভেঙে গেল জম্মু-কাশ্মীরের বিজেপি-পিডিপি জোট। মুখ থুবড়ে পড়ে গেল মেহবুবা মুফতির তিনবছরের সরকার।

আর ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে পড়লেন সবাই। সুব্রমনিয়ম স্বামী বলে বসলেন, আমাদের হিন্দু মুখ্যমন্ত্রী দরকার ছিল। উদ্ধব ঠাকরে বললেন, ৬০০ জন সেনার মৃত্যু লাগল বুঝতে যে এই জোট চলবে না? ওমর আবদুল্লা বললেন, মেহবুবা যখন ফিতে কাটছিলেন সেইসময় বিজেপি তাঁর পা কাটছিলেন। থেমে রইলেন না চেতন ভগতও। তিনিও বেমাক্কা টুইট করে বসলেন, এতে নাকি তিনি খুশি।

কেন ভাঙল এই জোট? উপত্যকার আনাচে কানাচে আর রাজধানী দিল্লির অলিতে গলিতে শোনা যাচ্ছে কারণ। মেহবুবা চেয়েছিলেন রমজান মাসের পরেও মেয়াদ বাড়ুক সঙ্ঘর্ষবিরতির। সেই প্রস্তাবে কিছুতেই রাজি হতে পারেননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। যে হারে উগ্রপন্থী কার্যকলাপ বেড়েছে তাতে সেনা অভিযান ছাড়া কোনও উপায় নেই আর। ফলে, জোট ভেঙে দেওয়া ছাড়া আর উপায় ছিল না কারো।

বিজেপির রাম মাধব অবশ্য বলছেন, সুজাত বুখারির হত্যার কথা। বলছেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিল না সাধারণ মানুষের। বলছেন পিডিপির কারণে নাকি উন্নয়নের অ্যাজেন্ডা কাজেই লাগানো যায়নি জম্মু-কাশ্মীরে। জম্মু আর কাশ্মীর এই দুই অঞ্চলের উন্নয়নেও নাকি ফারাক ছিল অনেক। তা নিয়ে ক্ষোভও বাড়ছিল বিজেপি প্রভাবিত জম্মুতে।

কিম-আশ্চর্যম! এসব কথা তিন বছর আগে জোট গড়ার সময় জানতেন না নাকি বিজেপি নেতারা? কেউ বলতেই পারেন, আহা তখন কি আর চেনাজানা ছিল। কত মিঠে প্রেমই তো বিয়ের পর তেঁতো-কড়া ডিভোর্সে শেষ হয়।

২০১৪ সালে, জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভা ভোটের সময়ে এই বিজেপিই তো পিডিপিকে বলেছিল – ‘নরম বিচ্ছিন্নতাবাদী।’

ভোট শেষ হওয়া মাত্রই কিন্তু তাঁরা ভুলে গেলেন সে সব কথা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তথা বিজেপির জয়রথের চাকা যে কাশ্মীর অবধি গড়িয়েছে এই প্রচারের ঢক্কানিনাদে ঢেকে গেল পিডিপি-র এতদিনের রাজনীতি। বিজেপি-পিডিপির এই হাঁসজারু, পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য জোটকেই সবার হঠাৎ মনে হতে লাগল খুব স্বাভাবিক।

তারপরেই হঠাৎ মঙ্গলবার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল নরেন্দ্র মোদীর দলের। মনে হল জোট চলতে পারে না। যে সাধারণ কর্মসূচি নিয়ে পিডিপির সঙ্গে জোট গড়েছিল বিজেপি, তার সিকিভাগও এতদিনে না করতে পারা নিয়ে কিন্ত চুপ করে ছিলেন সবাই।

ইতিহাস বলে, কাশ্মীরের পাহাড়ি রাজনীতিকে গোটা দেশের সমতলে আনার চেষ্টা বিজেপির অনেকদিনের। সেই ’৫৩ সালে জনসঙ্ঘের আমলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কাশ্মীর গিয়েছিলেন, ‘এক দেশ মে দো বিধান, দো প্রধান অউর দো নিশান নেহি চলেঙ্গে’ স্লোগান তুলে। ’৯২ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসে কাশ্মীরের লাল চকে তেরঙা তুলতে গিয়েছিলেন মুরলী মনোহর যোশী। সেইদিন তাঁর সঙ্গে ছিলেন তরুণ উজ্জ্বল এক যুবনেতাও। তাঁর নাম নরেন্দ্র মোদী।

আর প্রতিবারই এই সব আন্দোলনের রেশ ঝড় তুলেছে দেশের প্রান্তে।

নয়দিল্লির অনেকেই মনে করছেন, মঙ্গলবারের জোট ভেঙে বিজেপির বেরিয়ে আসা আসলে সেই ট্র্যাডিশনেরই পুনরাবৃত্তি।

দুই দলের মূল আদর্শ যতই আলাদা হোক না কেন। এই জোট যে আসলে চলতে পারে না প্রথম দিন থেকে সেই দেওয়াল লিখন যতই স্পষ্ট হোক না কেন। মোদী ঝড়ে কাশ্মীরও যে কাবু সে কথা দেশের মানুষকে বোঝানোই ২০১৪ সালে বেশি জরুরী ছিল বিজেপির কাছে।

কিন্তু তিনবছর পর, লোকসভা নির্বাচনের সামনে দাঁড়িয়ে, এখন বদলে গিয়েছে প্রয়োজনটা।

একের পর এক সীমান্ত সঙ্ঘর্ষ, বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর গোটা কাশ্মীর জুড়ে জনরোষ, পেলেট গানের গুলি, পাথর ছোঁড়া, কাঠুয়া কাণ্ডের নির্যাতিতার গণধর্ষক-ঘাতকদের সমর্থনে হিন্দুত্ববাদীদের বিরাট মিছিলে বিজেপির মন্ত্রীদের অংশগ্রহণ বুঝিয়ে দিচ্ছিলই – ডাল মে কুচ কালা নেহি, পুরা ডাল লেকই কালা হ্যায়।

তারপর হল মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। রমজানের সঙ্ঘর্ষবিরতি ঘোষণার পর এখন অবধি মারা গিয়েছেন ৪০ জন ভারতীয় সেনা। জম্মু, সাম্বা আর কাঠুয়ায় পাক বাহিনীর অবিরাম অস্ত্রবর্ষণ থেকে বাঁচাতে সরাতে হয়েছে প্রায় এক লাখ মানুষকে।

তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন যে নরেন্দ্র দামোদরভাই মোদী কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে ফিদিনই লম্বা লম্বা লেকচার দিতেন, তিনি নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়ে কী করলেন?

না কমল সীমান্ত সঙ্ঘর্ষ, না বদলাল কাশ্মীরের রাজনৈতিক অবস্থা। হাতে রয়ে গেল সেই পেনসিল।

বরং এখন জোট ভেঙে বেরিয়ে এসে, রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করলে সব দোষ চাপিয়ে দেওয়া যায় মেহবুবার পিডিপির ওপরেই।

উত্তাল কাশ্মীরে ক্র্যাকডাউন, সেনা নামানোর দায়টাও সহজেই ঝেড়ে ফেলে দেওয়া যায় নিজেদের ঘাড় থেকে।

আবার এখন এটাও বলা যায় পিডিপির জন্যই শান্তির পথে কিছু করা গেল না। তাই এখন কড়া হাতে দমন করতে বাধ্য হলেন মোদী।

বলা যায় না, সীমান্ত ও দেশের অভ্যন্তরীন নিরাপত্তার স্বার্থে কাশ্মীরের এই কড়া দমন, গোটা দেশের সমতলে দেশাত্মবোধের জিগির হয়ে উঠে পরের লোকসভা ভোটে লাভও দিতে পারে বিজেপিকেই।

২০১৪ এর লোকসভা ভোট তো স্পষ্টই করে দিয়েছে যে মেরুকরণ শুধু ধর্মের রাজনীতি দিয়েই হয় না। হয় উন্নয়নের তোড়ে রাতারাতি দেশ বদলে দেওয়ার স্লোগান তুলেও।

কাশ্মীর এখন সেই মেরুকরণেরই নতুন রসদ হয়ে উঠতে পারে। পাকিস্তান, জঙ্গি, বিছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমের লড়াইকে কোন ভারতীয়ই আর না সমর্থন না করে পারবেন। ভেতরে ‘ইয়ে কেয়া হুয়া, ক্যায়সে হুয়া’ প্রশ্নের তুফান উঠলেও অন্তত বাইরে দেশপ্রেমের জোয়ারে ভাসতে তো তাকে হবেই।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ কাশ্মীরের সিঁদুরে রামমন্দিরের মেঘও দেখতে পাচ্ছেন। কে বলতে পারে, এককাট্টা বিরোধীদের সামনে, দেশজুড়ে গোরক্ষপুর বা কর্নাটকের পুনরাবৃত্তি আটকাতে আর ক’মাস পরেই নতুন করে আবার রামমন্দিরের জিগির উঠবে না?

অতএব নিজেদের সমর্থনে গড়া জোট সরকারকে ফেলে দিয়ে, রাজ্যপালের কাছে রাষ্ট্রপতি শাসন চাইতে চলে গেলেন বিজেপির বিধায়করা।

গত তিনবছরের সমস্ত ভুল, সব অকর্মণ্যতার দায় নিঃশব্দে ঝেড়ে ফেলে।

রাজনীতি তো হল। তার জন্য যদি সেনাবাহিনীর ভারী বুটের কুচকাওয়াজ, পাকিস্তানের ভারী গোলা আর জঙ্গিদের গুলি চালানোর আওয়াজ শুনতে শুনতে কাশ্মীরের শান্তি শ্রীনগরের ডাল লেকের শিকারায় পা দোলাতে দোলাতে বসে আঙুল চোষে, তাহলে কার কীই বা করার আছে?

Leave A Reply