শনিবার, অক্টোবর ১৯

পশ্চিমবাংলা কেন এক জন বাঙালি প্রধানমন্ত্রী পাবে না?

সমীর চক্রবর্তী

১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই, সিপিএমের পুলিশের গুলিতে খুন হন তৎকালীন যুব কংগ্রেসের ১৪ জন কর্মী। শনিবার সেই মর্মান্তিক ঘটনার পঁচিশ বছর পূর্তি। ২০১১ সালের আগে অবধি, এই দিনটিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল পরিবারের সবাই স্মরণ করতাম সিপিএমকে বাংলার ক্ষমতা থেকে সরানোর শপথ নিতে।

তখন সেই একুশের দাবিটা ছিল খুব ন্যায়সঙ্গত,- সিপিএমের জাল ও ছাপ্পা ভোট আটকাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটার কার্ডের জন্য আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। সেদিনের স্লোগান ছিল, ‘নো আইডি নো ভোট’। গোটা ভারতবর্ষে সচিত্র ভোটার কার্ডের প্রয়োজনীয়তার কথা প্রথম তুলে ধরেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। তাঁর সেই দাবিকেই মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল ভারতের নির্বাচন কমিশন। চালু হয় ভোটার আইডি।  ২০১১ সালে ২০ মে সিপিএমের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান করে, বাংলায় প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সে দিনও তিনি বলেছিলেন, কোনও বিজয় উৎসব করার দরকার নেই। তার বদলে পাড়ায় পাড়ায় বেজে উঠুক রবীন্দ্রসঙ্গীত। তিনি আরও বলেছিলেন, এই দিনটাকে পালন করা হোক ২১ জুলাইয়ের শহিদদের স্মৃতির উদ্দেশে।

প্রতিবারই ২১ জুলাইয়ের দিনটিতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সেই অমর শহিদদেরই স্মরণ করা হয়। সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস একটি রাজনৈতিক দল। ফলে এই অনুষ্ঠানে সব সময়েই শহিদদের স্মরণ করার সঙ্গে সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও আলোচনায়-বক্তৃতায় প্রাধান্য পায়।

সামনেই লোকসভা নির্বাচন। সেটাই এই মুহূর্তে সব থেকে বড় বিষয়। এই নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে বিজেপি বাংলার বুকে এক ধর্মান্ধ রাজনৈতিক আবহাওয়া তৈরি করার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। বিজেপি চায়, বাংলার বিরোধী রাজনৈতিক পরিসরটিকে আরও ছোট করে, সমস্ত তৃণমূল বিরোধী ভোটকে নিজেদের ঝুলিতে পুরতে। তার মাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানোটাই ওদের লক্ষ্য। এর বিরুদ্ধেই আমাদের লড়াই।

বিজেপি এই জন্য একটা ত্রিমুখী কৌশল নিয়েছে। এর প্রথমটা হল রাজ্যের প্রতি বৈমাত্রেয় সুলভ আচরণ। বাংলার ন্যায্য প্রাপ্য আটকে দিয়ে, মুখ্যমন্ত্রীর জনমুখী প্রকল্পগুলোর কাজ ব্যাহত করে, তাঁর জনপ্রিয়তা কমানোর মরিয়া চেষ্টা করছে বিজেপি।

দ্বিতীয়ত, সিবিআই, ইডি-র মতো বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করে তৃণমূল কংগ্রেস ও তার নেতাদের গায়ে কালি লাগানোর অন্যায় চেষ্টা করছে তারা।

এবং তৃতীয়ত, মেরুকরণের ন্যক্কারজনক রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে বাংলায় অন্ধ ধর্মীয় তাস খেলতে চাইছেন মোদী-অমিত শাহরা।

এর বিরুদ্ধে একা লড়ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে আছেন বাংলার সাধারণ মানুষ। ২০১৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনে, একই রাস্তায় হাঁটার চেষ্টা করেছিল বিজেপি। তাদের সেই জঘন্য রাজনীতির বিরুদ্ধে মমতার স্লোগান ছিল, ‘কুৎসা বনাম উন্নয়ন।’ বাংলার মানুষ কুৎসাকে হারিয়ে উন্নয়নের পক্ষেই রায় দিয়েছিলেন। দুই তৃতীয়াংশ আসনে জিতেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

একথা এখনই নিঃসন্দেহে বলে দেওয়া যায়, যে এবারের লোকসভা নির্বাচনের স্লোগান হতে চলেছে, ‘মমতার উন্নয়ন বনাম বিজেপির ধর্মান্ধতা’।

বাংলার ছ’কোটি ৫৫ লক্ষ ভোটার মনে করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সঠিক উন্নয়নের রাস্তায় চলেছে বাংলা। সেই উন্নয়নকে রুখে দিয়ে, শান্ত পশ্চিমবাংলাকে অশান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে বিজেপি। ২১ জুলাইয়ের সভা থেকে তার বিরুদ্ধে দিক নির্দেশ করবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

গত লোকসভা নির্বাচনে, বিজেপি বিহারে ৪০টির মধ্যে ৩২টি আসন, উত্তরপ্রদেশে ৮০টির মধ্যে ৭৩টি আসনে জিতেছিল। দিল্লিতে সাতে সাত, হরিয়ানায় দশে দশ, উত্তরাখণ্ডে পাঁচে পাঁচ, হিমাচল প্রদেশে চারে চার, রাজস্থানে ২৫-এ ২৫, গুজরাতে ২৬-এ ২৬, মধ্যপ্রদেশে ২৯-এ ২৭ এবং ছত্তিশগড়ে ১১টির মধ্যে ১০টি আসন পেয়েছিল বিজেপিই।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ এবং অন্য নেতারা স্পষ্টভাবে জানেন, এই ফলাফল উনিশের ভোটে আর সম্ভব নয়। এখান থেকে তাদের আসন সংখ্যা এই বার অনেক কমে যাবে। সুতরাং যে সব রাজ্যে তাদের আসন সংখ্যা গতবারে কম ছিল সেইগুলোকেই পাখির চোখ করে ঝাঁপাচ্ছে বিজেপি।

এর মধ্যে প্রথমেই আছে পশ্চিমবাংলা। যেখানে ৪২টি আসনের মধ্যে মাত্র দু’টিতে জিততে পেরেছিল বিজেপি। এই দু’টির মধ্যে দার্জিলিং যে তাদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে সে কথা এখনই নিশ্চিত করে বলে দেওয়া যায়। আসানসোলেও ক্রমশ তাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরছে।

অন্য দিকে, মমতার জন-উন্নয়নের জোয়ারে তৃণমূল এইবারের নির্বাচনে ৪২-এর মধ্যে ৪২টি আসনেই জেতার জায়গায় পোঁছে গিয়েছে। সেটাই এখন চক্ষুশূল বিজেপি-র। তারা চাইছে যেনতেন প্রকারে এখানে আঘাত হানতে। এবং সমস্ত ন্যায় নীতি রাজনৈতিক শিষ্টাচার শিকেয় তুলে যে কোনও ভাবে বাংলায় আসন বাড়াতে।

উনিশে লোকসভা ভোটে বাংলার গুরুত্ব বিজেপির কাছে কতটা সেটা বোঝা যায় বিজেপি নেতাদের দেখলেই। জুন মাসেই অমিত শাহ এসেছেন। জুলাই মাসে এলেন নরেন্দ্র মোদী। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয় একদম বিজেপির নেতা হিসেবেই। শোনা যাচ্ছে, অগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহেই আবার আসবেন অমিত শাহ।

বিজেপি ছলে বলে কৌশলে, নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করতে ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উপর আঘাত হানার চেষ্টা করছে। কখনও শোনা যাচ্ছে, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়ের বিধানসভা নির্বাচনকে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস থেকে পিছিয়ে দিয়ে মার্চ-এপ্রিল মাসে লোকসভা ভোটের সঙ্গে করতে চাইছেন তাঁরা। কখনও আবার শোনা যাচ্ছে লোকসভা নির্বাচনকেই নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে এগিয়ে আনা হবে।

এর কারণ হল, নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহরা জানেন, ওই তিন রাজ্যে তাঁদের ভরাডুবি অবশ্যম্ভাবী। আর তার ফল যে সুদূরপ্রসারী, লোকসভা নির্বাচনেও তা প্রভাব ফেলবে, একথাও স্পষ্ট তাঁদের কাছে।

আজকে বাংলার মানুষের সামনে এখন মূল প্রশ্ন হল – মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নের এই জোয়ারেই কি আস্থা অটুট রাখবেন তাঁরা, নাকি সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে বিজেপির এই ধর্মান্ধ রাজনীতি দিয়ে বাংলায় আসন বাড়ানোর অপপ্রয়াসের ফাঁদে পা দেবেন?

এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলার আছে। পশ্চিমবাংলা বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়কে পেয়েছে। পেয়েছে বাঙালি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুধীরঞ্জন দাস। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে পেয়েছে বাঙালি সুকুমার সেনকে। নোবেল পুরস্কারের মতো আন্তর্জাতিক সম্মানও পেয়েছে বাঙালি। শুধু একটি জিনিসেই বাঙালি আজও বঞ্চিত – সেটা হল প্রধানমন্ত্রীর পদে একজন বাঙালিকে পাওয়া।

গুজরাত যদি বলতে পারে যে একজন গুজরাতিকে তাঁরা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান, তাহলে আমরা বাঙালিরাই বা কেন বলতে পারব না যে আমাদের একজন বাঙালি প্রধানমন্ত্রী চাই পশ্চিমবাংলা থেকে?

একথা এখন থেকেই নিশ্চিত, যে নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন,তৃণমূলই লোকসভায় তৃতীয় বৃহত্তম শক্তি হতে চলেছে। তাই সরকার গঠনের চাবিকাঠি বা নির্ণায়ক শক্তি থাকবে আমাদের দলেরই হাতে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই বার্তাই দেবেন আগামী ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে। সুস্পষ্ট নির্দেশ দেবেন, বাংলার শান্ত বাতাবরণ অশান্ত করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার বিজেপির কূটকৌশলের বিরুদ্ধে।

বাংলার সব মানুষের জননেত্রী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ২১ এর মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলে দেবেন, ‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত’। কারণ তিনি জানেন, হাজার চেষ্টার পরেও বিজেপির লড়াই আসলে সিপিএমের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করার লড়াই।তাও প্রথমের থেকে অনেক অনেক দূরের দ্বিতীয়।

ফাইল চিত্র 

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

সমীর চক্রবর্তী বাঁকুড়ার তালড্যাংরা থেকে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক

Leave A Reply