বঙ্কিমচন্দ্রের প্রত্যাবর্তন বিষয়ে কয়েকটি জরুরি কথা

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

 

আবার সে এসেছে ফিরিয়া। হ্যাঁ, সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কথাই বলছি।বহুবছরের দ্বীপান্তর পেরিয়ে এসে বঙ্কিম অবশেষে একটু জায়গা পেলেন। বঙ্কিমকে নিয়ে সভা হচ্ছে খাস কলকাতার বড় হলঘরে, বসে আছেন জনপ্রিয়তম সাহিত্যিকদের অন্যতম বুদ্ধদেব গুহ, বলছেন বঙ্কিমের শ্রেষ্ঠতম জীবনীকারদের মধ্যে শীর্ষে যাঁর অবস্থান সেই অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য ছাড়াও পূরবী রায় বা অচিন্ত্য বিশ্বাস এই দৃশ্য কয়েকবছর আগেও স্রেফ ভাবা যেত না।যেমন ভাবা যেত না, কলকাতা থেকে দিল্লি “বন্দেমাতরম এক্সপ্রেস”এর দাবিতে অনেক মানুষ আওয়াজ তুলবেন। কিন্তু এই ব্যাপারগুলো যখন ঘটছে এবং ঘটে চলেছে তখন রাজনৈতিক কচকচি বাদ দিয়েও বলা যায় যে বঙ্কিমের অস্পৃশ্যতা কিছুটা হলেও ঘুচল। অমিত্রসূদনের ভাষায়, যাঁকে দীর্ঘদিন পরিকল্পিতভাবে, ‘নৈহাটির বঙ্কিম’ করে রাখা হয়েছিল, তিনি আবার কলকাতার বঙ্কিম, বাংলার বঙ্কিম বা বলা যায় ভারতের বঙ্কিম হয়ে উঠলেন।

মোটামুটি পঞ্চাশবছর আগে থেকে বঙ্কিমের একঘরে হওয়া শুরু হয়েছিল। কী কুক্ষণে তিনি ‘ঋষি’র শিরোপা পেয়েছিলেন আর কেন মরতে জাতীয়তাবাদের উদগাতা হয়েছিলেন! ব্যাস, “চীনের চেয়ারম্যানই আমাদের চেয়ারম্যান” আওড়াতে-আওড়াতে, “দক্ষিণ কলকাতার ফ্ল্যাটগুলোই আমাদের ফ্ল্যাট”  বলার দিকে যারা এগিয়ে গেলেন তারা বঙ্কিমকে একেবারে বড় দরজা থেকে বার করে পিছনের ঘোরানো  সিঁড়ির দিকে ঠেলে দিলেন। বঙ্কিম হয়ে দাঁড়ালেন সেই লোক , যে ভারতবর্ষের ইতিহাসে সেই সবচেয়ে অপশব্দটি(!) উচ্চারণ করেছেন , ‘দুর্গা’। যে দুর্গাকে অশ্রাব্য গালিগালাজ না দিয়ে চিন এবং রাশিয়ার মন্ত্রদীক্ষায় দীক্ষিত বাবুরা ত্রিসন্ধ্যা আহ্নিক করেন না, সেই ‘দুর্গা’কে মা বলা? আরাধনা করা? দেশমাতৃকার মধ্যে তাঁর মূর্তি দেখা? “ স্তালিনকে মা বলিয়া ডেকেছিল যারা”, তারা এই অনাচার সহ্য করতে পারে কখনও? ভাগ্য ভাল যে বঙ্কিম, একশোবছর পরে জন্মাননি। জন্মালে, কবে কোতল হয়ে যেতেন।

অথচ বঙ্কিমের লেখা গভীরভাবে পড়লে কোথাও তাঁকে একপেশে বলে দায়ী করার জায়গা নেই। তিনি রামা কৈবর্তর কথা যেমন বলেছেন , হাসিম শেখের কথাও বলেছেন। আর বারবার করে, প্রায় চোখে আঙুল দিয়ে যা বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তা হল, হিন্দু হলেই লোকে ভাল হয় না, মুসলমান হলেই খারাপ হয় না , কিংবা মুসলমান হলেই ভাল হয় না আর হিন্দু হলেই খারাপও হয় না। কিন্তু বিদেশের রূপোর ঝনঝনানি যে তহবিলে ঢুকেছে তার মালিকের চোখে ভারতীয়তা মানেই সাম্প্রদায়িকতা। এবং তাদের চোখে তাদের রঙে না রাঙানো যে কোনও সমাজ বর্ণনা  ওই একটি শব্দের মধ্যেই ঠাই পেয়ে যাবে। সেই যুক্তিতে শরৎচন্দ্র সাম্প্রদায়িক, তাঁর লেখালিখির জন্য, শরদিন্দুও সাম্প্রদায়িক কারণ তিনি ‘আদিম রিপু’তে খোলাখুলি  লিখেছেন যে হিন্দুর লাশ পড়ে থাকলে সোহরাবর্দির সরকার কোনও ভূমিকা নেয় না, বরং দু একটা হিন্দুকেই উল্টে মেরে যায়। বলাই বাহুল্য যে দুহাজার দুইয়ের গুজরাত কিংবা দু’হাজার সতেরোর সিরিয়ায় থাকলে শরদিন্দু সম্পূর্ণ অন্য কথা লিখতেন এবং অন্য প্রশাসনকে দায়ী করতেন কিন্তু ৪৬ সালের কলকাতা সম্পর্কে তিনি তাই লিখেছেন, যা সত্য।

বঙ্কিম থেকেই এই সত্য বর্ণনার ধারা বাংলা সাহিত্যে এসেছে, কোনও ডলার, রুবল বা দিনার দিয়ে যাকে পালটানো যায় না। কিন্তু কালের ফেরে মিথ্যাটাই যখন হয়ে দাঁড়ায় সত্য, পালিয়ে আসা উদ্বাস্তু সাহিত্যিক বুঝে যান যে দেশ ছেড়ে এলেও দেশের মার্কেটটি তিনি ছেড়ে আসেননি। সেই মার্কেটের কতিপয় মুরুব্বিকে খুশি করে থলি ভরে নেওয়ার জন্য তখন মিথ্যাকেই নানান রঙে সত্যি বলে চালাতে হয় এবং বঙ্কিমকে হেয় করার ষড়যন্ত্রে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হয়।

কিন্তু মিথ্যার ফানুস বেশিক্ষণ উড়তে পারে না তাই, কালের সম্মার্জনী এসে কত কত নাম হাপিশ করে দেয়, অথচ একশো আশি বছরে পৌঁছেও স্মরণীয় এবং বরণীয় হয়ে থাকেন বঙ্কিম। কিন্তু কোন বঙ্কিম?  “আনন্দমঠ” রচয়িতা, “বন্দেমাতরম” প্রণেতা বঙ্কিম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তিনিই তো একমাত্র বঙ্কিম নন। স্বনামধন্য আশিস নন্দী রুডিয়ার্ড কিপলিং সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বলেছিলেন যে কিপলিং’এর ভেতরে একটা স্যাক্সোফোন আর ওবো একসঙ্গে বাজে। প্রথমটা আগ্রাসী মনোভাবের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী কিপলিং, দ্বিতীয়টা ভারতীয় সংস্কৃতি আর পরম্পরার সামনে নতজানু কিপলিং । বঙ্কিম একটি পরাধীন দেশের মুক্তির স্বপ্নবীজ বুনছিলেন তাঁর লেখার অক্ষরে অক্ষরে। তাঁকে যতটা পড়েছি,  আধিপত্যকামী বলে মনে হয়নি। কিন্তু ওই স্যাক্সোফোন আর ওবো বঙ্কিমের ভিতরেও বিদ্যমান। ‘বন্দেমাতরম’এর বঙ্কিম আর “হায় রজনী পাথরেও এত আগুন’’এর  বঙ্কিম তো এক নন।

কিন্তু যে সুর যার ভাল লাগুক বা না লাগুক একটা জায়গাতে এসে আমাদের মাথা নত করতেই হয় আর সেই জায়গাটা হল, বঙ্কিম ছাড়া আজকের বাংলা গদ্য আমরা পেতাম না।তিনি পথপ্রদর্শক না হলে বাংলা সাহিত্য হামাগুড়ি দিত আজও। তবুও সেই বঙ্কিম একশ্রেণির বিড়াল তপস্বীর কাছে ব্রাত্য হয়ে রইলেন কেন?

কারণ একটাই আর সেটা হল, বঙ্কিম সারাজীবন সমস্ত দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে বলে গেছেন। একথা মনে রাখতে হবে যে রামকৃষ্ণদেবের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, বঙ্কিম সাহেবের মারের চোটে ব্যাঁকা;  মানুষের কাজ কী জিজ্ঞেস করায়, ব্যাঙ্গ করে জানিয়েছিলেন যে, আহার-নিদ্রা-মৈথুনই মানুষের কাজ। ঘনঘোর সুবিধাবাদের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থাকা একটা লোক বঙ্কিম যিনি বরাবর বলে এসেছেন যে সত্য ভালো, সত্যের ভান ভাল না। তাঁকে তো তাদের খারাপ লাগবেই যারা মানবতার বাণী দিতে দিতে ফুটপাথের অভুক্ত বাচ্চাদের মধ্যে দিয়ে নিজের ছেলের জন্য কমপ্ল্যান কিনে বাড়ি ফেরেন। প্যালেস্টাইন কিংবা ভিয়েতনাম নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বলতে পারেন  কিন্তু নোয়াখালি বা চুকনগরের গণহত্যা নিয়ে সম্পূর্ণ নীরব থাকাই পছন্দ করেন। যারা  নিজেদের ভণ্ডামির দৌলতে এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে রামচন্দ্রকে গালি দিতে দিতে শেষে মাথায় কলসি নিয়ে পথ হেঁটে কেরালায় রামায়ণ মাস পালন করতে হয়; মাত্র চল্লিশ শতাংশ ভোট পেয়ে কোনও জোট কেন দেশ শাসন করবে বলতে বলতে যারা অক্লেশে ভুলে যায় যে নিজেরা চার শতাংশ ভোটও পায়নি, তারা স্বাভাবিকভাবেই বঙ্কিমকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, আগামীতেও করবেন।

কিন্তু তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ করে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আবার আলোয় আলোকময় হয়ে উঠেছেন। সেই আলোর এমনই রোশনাই যে ভারতের  সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতাকে তিনজন  বাঙালি শিক্ষাবিদের বাংলা ভাষণ শুনতে হয়েছে একঘণ্টার উপর চুপ করে বসে। বঙ্কিম আবারও বাংলাকে, বাঙালিকে একটা কেন্দ্রীয় জায়গায় নিয়ে এসেছেন। যারা  ‘বন্দেমাতরম’ শব্দটাকে অবমাননা করতেন , কংগ্রেসি গুন্ডাদের স্লোগান বলে, তাদের তাই আজ মুখ লুকোবার জায়গা নেই।

এত অবধি ভীষণ ভালো । কিন্তু এরপর যদি ভাবা হয় যে বঙ্কিম সর্বহারা বাঙালির, উদ্বাস্তু বাঙালির, ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হয়ে দণ্ডকারণ্যে কিম্বা কুপার্স ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া বাঙালির পরিত্রাতা হয়ে উঠবেন তাহলে কোথাও একটা ফাঁক থেকে যাবে । বাঙালির জন্য কিছু করতে হলে শুধু বঙ্কিম দিয়ে চলবে না , রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আসতে হবে। একথা বঙ্কিম নিজে থাকলেও বলতেন। মাছ যেরকম জল ছাড়া থাকতে পারে না, বাঙালিও সরকারি চাকরি ছাড়া থাকতে পারে না। যারা বঙ্কিমকে কেন্দ্রে রেখে বাঙালিকে আবেগোদ্দীপ্ত করবেন ভাবছেন, তারা রবীন্দ্রনাথের একশো ষাট বছরে রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখানোর কোর্স চালু করুন দেশের এক হাজার স্কুলে। হাজার-দেড়হাজার রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইয়ে সরকারী চাকরি পাক। বঙ্কিমের নামে অবশ্যই একটা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হোক কিন্তু রবীন্দ্রনাথের নামে চালু হোক স্কলারশিপ। যা বাঙালি পড়ুয়া-গবেষক এবং সংস্কৃতিকর্মীরা পাবেন।

মোদ্দা কথা হল, বাঙালির চাকরি চাই, আর চাকরির জন্য চাই প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠান তৈরি না করে বঙ্কিমকে কেবলমাত্র একটি মন্ত্র হিসেবে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা হলে তা বেশিদিন স্থায়ী হবে না। মানুষ নিয়মের ক্রীতদাস নয় যে তার জীবনে কোনও কল্পনার বিস্তার থাকবে না । আর আজকের কল্পনাই কালকের বাস্তব। তাই  বিশ্বভারতীর মতো একটা ‘বঙ্কিমভারতী’র দরকার। যা বহু মানুষের কর্মসংস্থান করবে। নয়তো শুধু হাওয়ায় ‘বন্দে মাতরম’ ভাসিয়ে দিয়ে তরী তীরে ভেড়ানো যাবে না।

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় কবি, উপন্যাস ও গল্প লেখেন। নিজের কলামে সমাজ এবং জীবনের সেই সেই বিষয়গুলো ছুঁতে চান যা আমরা পড়তে চাইলেও লিখতে চাই না। লেখালেখির জন্য গিয়েছিলেন আইওয়া লেখক শিবিরে গিয়েছিলেন বাংলাসাহিত্যের প্রতিনিধি হয়ে। পেয়েছেন কৃত্তিবাস, বাংলা আকাদেমী ও ভাষানগর পুরস্কার।   

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More