সোমবার, এপ্রিল ২২

এক পয়সা! ধনরাশি নয়!

রত্না মুখোপাধ্যায়

কাঁচা শালপাতা দিয়ে বানানো ছোট্ট বাটি। একটু লালচে মতো মাখা-মাখা ঝোল, চার পিস বড় আলুর টুকরো। ধোঁয়া উঠছে অল্প অল্প। সঙ্গে উঠছে মনমাতানো গন্ধ। নেশাতুর ছুটে যাওয়ার মতো গন্ধ। স্কুলের গেট দিয়ে হাত বাড়িয়ে এক বাটি নাগালে পাওয়া গেলেই মিনিট পাঁচেকের জন্য স্বর্গীয় স্বাদে মজে থাকার সুযোগ। ঠিক কী যে ছিল কালুদার ওই আলুরদমে, তা আজও, এই মধ্য পঞ্চাশে পৌঁছেও, সুরাঁধুনি হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় সুখ্যাতি লাভ করেও, বুঝে উঠতে পারিনি। এখন মাঝে মাঝে ছোটবেলার স্বপ্ন ভেসে আসে ভাতঘুমে। সেই স্বপ্নেও আসে গন্ধ।

কালুদার আলুরদমের এত বিস্তারিত বর্ণনা এ লেখায় দরকার ছিল না। কিন্তু যেটা বোঝানোর জন্য বলা, এই এতটা ভাললাগা, এতটা আনন্দ, এতটা সুস্বাদ মিলত কেবল এক পয়সার বিনিময়ে। হ্যাঁ, এক পয়সাই। যদিও শুনতে হাস্যকর রকমের কম দাম হলেও, তখনকার দিনে, আজ থেকে প্রায় আধ শতক আগে এই একটা পয়সার মূল্য অনেক বেশি ছিল। কদাচিৎ দিদিরা আসত শ্বশুরবাড়ি থেকে। হাতে গুঁজে দিয়ে যেত একটা কি দু’টো পয়সা। তা দিয়েই এক দিন কি দু’দিনের রাজা হতাম আমরা। কালুদার আলুরদমে কিংবা নাসিরের জলমালাইয়ে কিংবা কেবোদার দোকানের হজমিগুলিতে ভর করে সব পেয়েছির দেশ গড়তাম মনে মনে।
তার পরে দিন বদলাল। ছোটবেলা ঘুচল। বিয়ে হল। গ্রাম থেকে শহরবাসী হলাম। পয়সা বদলে টাকা হল। যদিও এখনও অভ্যাসের তাড়নায় মাঝে মাঝেই বড়সড় দোকান থেকে বড়সড় শপিং সারার পরেও জিজ্ঞেস করে ফেলি, “কত পয়সা হল?” দোকানের কিশোর মুখ হেসে বলে, পয়সা নয় ম্যাডাম, দেড় হাজার টাকা।
মেয়ে তখন ছোট। নিচু ক্লাসে পড়ে। সদ্য শিখছে টাকা-পয়সার হিসেব। দুলে দুলে পড়ে, একশো পয়সায় এক টাকা হয়। “পয়সা কী হয়, মা?” প্রশ্ন আসে খুদেছাত্রীর থেকে। সত্যিই তো, পয়সা কী হয়, কেমন হয় সে কেমন করে জানবে? তাকে বড়জোর বোঝানো যেতে পারে, এই যে মৌরি লজেন্সটা খাচ্ছো, সেটার দাম এক টাকা। আমাদের ছোটবেলায় এরকম এক টাকায় একশোটা মৌরি লজেন্স পাওয়া যেত। তাই এক একটা লজেন্সের দাম এক পয়সা করে পড়ত। সেই তো হিসেব! এত ছোট মাথায় ঢোকে কেমন করে! স্মৃতির ঝাঁপির সঙ্গে, স্মৃতির তোরঙ্গ হাতড়ে পাওয়া গেল কতগুলো ধাতব টুকরো। এক দিন যে টুকরোগুলো হাতের মুঠোয় থাকলে নিজেকে রাজা ভাবতে বাধা ছিল না, তারাই আজ অচল। বাতিল। নষ্ট। খুঁজে বার করলাম গোলমতো খাঁজকাটা অ্যালুমিনিয়ামের ছোট্ট চাকতি। এক নয়া! দেখালাম মেয়েকে। এই দেখ বাবি, এমনি হয় পয়সা। আসলে এখন আর হয় না, হতো। আগে হতো। এখন আর এর দাম নেই। একশোটা এমনি পয়সা একসঙ্গে করে যে দাম হয়েছে, সেই দামই এক টাকা। মেয়ে কী বুঝেছিল জানি না, কিন্তু তার পরে থেকে পিগি ব্যঙ্কে টাকা ভরতে গিয়ে প্রায়ই বলতো, আজ একশো পয়সা ফেললাম, দু’শো পয়সা ফেললাম, বা আজ মোটকু মতো পাঁচশো পয়সা ফেলেছি।
আজ সকাল থেকে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে সেই মেয়ে। আর খুদে নেই, রীতিমতো চাকরিজীবী আধুনিকা তরুণী। হেসে হেসে বলছে, “কালকেই তেল ভরলাম স্কুটির, আজ হলে কত সাশ্রয় হতো!” তেলের অস্বাভাবিক দাম বাড়া নিয়ে তোলপাড় ক’দিন ধরেই শুনছিলাম। রোজ রাতেই খাবার টেবিলে বাপ-মেয়ের লাগছিল একপ্রস্থ করে রাজনৈতিক কচকচি। রুটি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল, তবু তাদের মাথা ঠান্ডা হচ্ছিল না। এরকম সরকার থাকলে নাকি আর দু’দিন পরেই সোনার দোকানে ফোঁটায় ফোঁটায় বিক্রি হবে পেট্রোল-ডিজেল। আরও কত কী!
আজ মেয়ের হাসি আর আফশোস শুনে ভাবলাম, তা হলে একটু সুরাহা হল। কিন্তু খানিক পরে টিভি খুলতে আর ফোনে ফেসবুক খুলতে বোঝা গেল আসল বিষয়টা। এক লিটার পেট্রোলে মাত্র এক পয়সা করে দাম কমেছে। আরও কয়েকটা চ্যানেল ঘোরালাম টিভির, ফেসবুকেও স্ক্রল করলাম আরও কিছু পোস্ট। না, কিছু ভুল নয়, এক পয়সাই কমেছে। একটি মাত্র পয়সা। দেশের এই চরম দুর্দিনেও, রাশি রাশি মোদীর ছবিওয়ালা তেল-মিম দেখতে দেখতেও কেন জানি না দুম করে কালুদার মুখ মনে পড়ে গেল আমার। শালপাতা ভরে অমৃতসম আলুরদম শীর্ণ হাতে এগিয়ে দিচ্ছেন এক প্রৌঢ়, লোভাতুর চোখে সে দিকে তাকিয়ে, হাতের ছোট্ট মুঠোয় একটি নয়া পয়সা ধরে আছে ক্ষুদ্র বালিকা। মনে মনে ভাবছে, এই একটি পয়সার বিনিময়ে এখুনি পেতে চলেছি পৃথিবীর এক সেরা আস্বাদ। ছোটবেলায় সেই এক পয়সায় একপ্লেট আলুর দম খেতে পারার ছেলেমানুষি আহ্লাদটুকু যেন চলকে উঠল মুদ্রাস্ফীতির ভার সইতে সইতে তেল-নুন-হলুদ-মাংসের সাপ্তাহিক হিসেব কষে ক্লান্ত এক মাঝবয়সি গৃহিণীর চোখে।
চোখে পড়ল, অমিতাভ বচ্চনের ছবি দিয়ে বানানো একটি মিম। ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি শো’-এর সেই পরিচিত সেটে গম্ভীর মুখে বসে শাহেনশা, জিজ্ঞেস করছেন, “কেয়া করোগে আপ ইস ধনরাশিকা?” প্রচুর হাসির প্রতিক্রিয়া। আমার হাসি পেল না। বড্ড ভাল লাগল। ভাল লাগার ‘লাভ’ রিঅ্যাকশনই দিয়ে এলাম। এ ভাল লাগার অর্থ ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। সত্যি করেই যে এই একটি পয়সা এক সময়ে কতটা ধনরাশি ছিল, তার হিসেব এখনকার সময়ে কে রাখেন! আমাদের জনদরদী প্রধানমন্ত্রী রেখেছেন, এ কী কম ভাল লাগার মতো বিষয়? তবে দুঃখ একটাই, মোদীজির এই কালজয়ী পদক্ষেপকে সাদরে মেনে নিতে হলে, আরও পঞ্চাশটা বছর পেছনে হাঁটতে হবে আমাদের। খারাপ কী!
তবে পেছোতে শুরু করলে আর ৫০ বছরে থামব কেন! আরও পিছিয়ে যেতে পারি। পুরাণ যুগে। এখন তো এই মোদীজির দল বিজেপির কিছু নেতা-মন্ত্রীদের কল্যাণে এ-ও জানা হয়ে গিয়েছে, সে যুগে ইন্টারনেট থেকে শুরু করে এরোপ্লেন— আধুনিকতার সবটুকুই উপস্থিত ছিল। তবে আর ক্ষতি কী, এই একটি পয়সা মূল্যহ্রাসের নৌকোর পালে আচ্ছে দিনের হাওয়া লাগিয়ে আমরা না হয় ভাসান দিই উল্টো পথে!
Shares

Leave A Reply