Latest News

বিদেশে প্রথম তেরঙা উড়িয়েছিলেন, তাঁর সাহায্যেই পালিয়েছিলেন সাভারকর! কে এই সাহসিনী

দ্য ওয়াল ব্যুরো: এক শতাব্দীরও আগের কথা। সালটা ১৯০৭, দিনটা ২১ অগস্ট। ভারতের মাটিতে তখন স্বাধীনতা আন্দোলন চলছে জোর কদমে। দেশের। নানা প্রান্ত থেকে আন্দোলনের প্রবাহে গা ভাসাচ্ছেন ভারতীয়রা। লক্ষ্য একটাই, ব্রিটিশ রাজ থেকে মুক্তি। ভারতবাসী তখন ব্রিটিশ পতাকা হটিয়ে নিজেদের পতাকা উত্তোলন করতে তৈরি হচ্ছেন। এমন সময়ে বিদেশের মাটিতে জার্মানির স্টুটগার্টে প্রথম বার ‘জাতীয় পতাকা’ (Indian flag) উত্তোলন করা হয়।

সেই গল্পটা একটু অন্যরকম। আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে সেবছর ভারতের জাতীয় পতাকা হিসেবে ব্রিটিশ পতাকা তোলা হচ্ছিল। তখন সেখানে দাঁড়িয়ে সেই ঘটনার প্রতিবাদ জানান এক মহিলা (Bhikaji Cama)। ভিড়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসে সেই মহিলা নিজের ব্যাগের মধ্যে থেকে বার করে দিলেন একটি তেরঙা পতাকা। শেষে সেটাই জায়গা পেল ওই সম্মেলনে।

কে সেই মহিলা? জানা গেলে, তাঁর নাম ভিকাজি রুস্তম কামা (Bhikaji Cama)। মাদাম কামা নামেই বেশি পরিচিত। সেই সম্মেলনে তিনিই তখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ালেন। মানুষের মধ্যে কৌতূহল দেখা দেয় তাঁকে নিয়ে। সম্মেলনের ইতিউতি আলোচনা হতে থাকে। সেদিন সম্মেলনে তাঁর একটাই উক্তি ছিল, ‘দেখুন, এটা ভারতের জাতীয় পতাকা!’ সম্মেলনে উপস্থিত সকলকে বিস্মিত করে দিয়েছিলেন তিনি সেদিন। এই পতাকাই পরে জাতীয় পতাকার বিচারে মান্যতা পাওয়া নকশাগুলোর মধ্যে অন্যতম হয়ে দাঁড়ায়।

মাদাম কামা, আজীবন জনহিতকর এবং সমাজসেবামূলক কাজে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন। তিনি শুধুমাত্র ব্রিটিশ শাসন থেকে মানবাধিকার এবং স্বায়ত্তশাসন লাভের জন্য লড়াই করেননি, তিনি নারী অধিকার এবং ভোটাধিকারের জন্যও লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন। রাশিয়ানরা তাঁকে ‘ইন্ডিয়ান জোন অফ আর্ক’ বলে ডাকত। আর ভারতীয়দের কাছে তিনি ‘বিপ্লবের মা’!

Image - বিদেশে প্রথম তেরঙা উড়িয়েছিলেন, তাঁর সাহায্যেই পালিয়েছিলেন সাভারকর! কে এই সাহসিনী

তাঁর বক্তব্য ছিল খুবই স্পষ্ট। বলতেন, ভারত যখন স্বাধীনতা পাবে, তখন নারীদের শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার থাকলে হবে না, সমস্ত কিছুতেই তাঁদের অধিকার দিতে হবে। তাঁর কাছে সব বিষয়ে নারীদের সমতা ও ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি একই বিষয় ছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতে মহিলারা ভোটের অধিকার পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু সম অধিকার? বহুদিন পর্যন্ত এই শব্দটা খাতায় কলমে লেখা থাকলেও সমাজ ব্যবস্থায় তা ছিল শুধুই হাস্যকর বিষয়।

১৮৬১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তৎকালীন বম্বে শহরে (অধুনা মুম্বই) এক ধনী পার্সি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কামা। পিতা সোরাবজি ফ্রামজি প্যাটেলের খুব আদরের ছিলেন তিনি। পড়াশুনা করেন আলেকজান্দ্রা গার্ল এডুকেশন ইনস্টিটিউটে। ১৮৮৫ সালে রুস্তমজি কামার সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর।

রুস্তম ও ভিকাজির বৈবাহিক জীবন ছিল অদ্ভুত। রাজনৈতিক বিষয়ে দু’জন ছিলেন দুই মেরুর বাসিন্দা। পেশায় আইনজীবী রুস্তম যেখানে ব্রিটিশ প্রেমে হাবুডুবু খেতেন, সেখানে ভিকাজি চাইতেন ব্রিটিশদের থেকে মুক্তি। পরে গড়ে তোলেন প্যারিস ইন্ডিয়ান সোসাইটি, যা ভারতীয়দের স্বাধীনতা আন্দোলনে সাহায্য করত।

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার অপরাধে বহুদিন তিনি ভারত ছাড়া ছিলেন। ব্রিটিশরা জানিয়ে দিয়েছিল, তারা ভিকাজিকে দেশে তখনই ফিরতে দেবেন, যখন তিনি ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপ বন্ধ করবেন। কিন্তু ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করতে চাননি মাদাম।

১৮৯৬ সাল, প্লেগে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে। মৃত্যু মিছিলের যেন শেষ ছিল না। সেই সময় মানুষ ভিকাজিকে নতুন করে আবিষ্কার করেন। বিলাসিতা ছেড়ে গায়ে সাদা অ্যাপ্রোন চাপিয়ে ঘুরে বেড়াতেন গ্রামে গ্রামে। রোগীদের সেবা করতেন নিজের হাতে। নিজের জীবন উপেক্ষা করেই অন্যকে বাঁচানোর মন্ত্রে দীক্ষিত ভিকাজি তখন সকলের ‘মা’। একসময় নিজেই আক্রান্ত হয়ে পড়েন এই মহামারী রোগে। যদিও লন্ডনে গিয়ে চিকিৎসা করার পর প্রাণ বাঁচে তাঁর।

Image - বিদেশে প্রথম তেরঙা উড়িয়েছিলেন, তাঁর সাহায্যেই পালিয়েছিলেন সাভারকর! কে এই সাহসিনী

লন্ডনে চলে গেলেও ভিকাজি কামার বিপ্লবী চেতনা জ্বলতে থাকে। তিনি নিজেকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উজাড় করে দিয়েছিলেন। সাভারকর, সেনাপতি বাপ্তের মতো অন্যান্য বিপ্লবীদের সঙ্গে ছুটে বেড়াতেন। সাভারকরের লেখা বই, ভারতের স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধ নিষিদ্ধ করেছ ইংরেজ সরকার। কিন্তু ভারতের মাটিতে সেই বই গোপনে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন কামা। তিনি নিজে বইটি ফরাসি অনুবাদ করেছিলেন।

এখানেই শেষ নয়, তিনি নিজে সাভারকরকে লন্ডন থেকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলেন। লন্ডন পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া সাভারকরকে জেল থেকে পালাতে সাহায্য করেছিলেন তিনি। কামা, এমন একজন মহিলা ছিলেন যিনি কখনই নিজের বিশ্বাসকে অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দিতেন না। সবসময় পরিবর্তনের পক্ষে ছিলেন। নতুনকে স্বাগত জানানোর তাঁর ক্ষমতা ছিল অপরিসীম।

৩৩ বছর ভারত ছেড়ে থাকার পর একদিন দেশে ফেরার অনুমতি মিলেছিল। সেই সময় তিনি ফিরে আসেন বম্বেতে। দেশে ফেরার মাত্র ৯ মাস পর ১৯৩৬ সালে তিনি মারা যান। তিনি চলে গেলেও তাঁর আদর্শ আজীবন পাথেয় হয়ে ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের।

স্বাধীনতা দিবসের আগে ‘ডিপি’ বদল ধোনির, সায় দিলেন মোদীর বার্তায়

You might also like