বৃহস্পতিবার, জুন ২০

পিরিয়ডসে আড়াল নয়, যত্ন চাই! শেখাচ্ছে ওড়িশার রজ-পরব

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

বসুন্ধরা ঋতুমতী হয়েছেন! সে কথাই যেন জানান দিচ্ছে প্রথম বর্ষার জলধারা। আর সেই উপলক্ষে উৎসবে মেতেছে সাধারণ মানুষ! উৎসব শুধু বসুন্ধরাকে ঘিরে নয়, এই উৎসব উদযাপিত হয় ঘরের মেয়েদের নিয়েও। উৎসবের চারটে দিন তাদের যত্ন আর খুশির যাপন চলে রাজ্য জুড়ে। উৎসবের নাম, রজ-পরব। আষাঢ় মাসে ওড়িশার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ মাতেন এই উৎসবে।

পিরিয়ডস। মাসিক। মেনস্ট্রুয়েশন। যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এই শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াটা আসলে এ দেশের কঠিন ট্যাবু-অসুখে আক্রান্ত একটি ধারণার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। প্রাকৃতিক এবং জৈবিক নিয়মানুবর্তিতা মেনে মেয়েদের জন্মপথে মুক্তি পাওয়া এই রক্তস্রোত নিয়ে ছুঁতমার্গের শেষ নেই আজও। শেষ নেই নানা রকম রীতিনীতিরও।

এই অসংখ্য রীতিনীতির বেশির ভাগটাই হল এই ঋতুস্রাবের সময়ে আরও বেশি করে মেয়েদের প্রান্তিক করে রাখার ছুতো। তাদের মন্দিরে ঢুকতে না দেওয়া, বিছানায় শুতে না দেওয়া, রান্নাঘরে খেতে না দেওয়া, আরও কত কী! এখন সময় পাল্টেছে। এই সব কুসংস্কারের আঁচ হয়তো একটু ফিকে হয়েছে। হয়তো চাপিয়ে দেওয়া প্রথার ফাঁস খানিক আলগা হয়েছে। কিন্তু সত্যিই কি সেরেছে ট্যাবু-অসুখ? তা হলে এখনও কেন খবর আসে, ঋতুমতী বালিকাকে বদ্ধ গোয়ালঘরে রেখে দেওয়ায় দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে তার? কেনই বা খবর আসে, ঋতুমতী অবস্থায় মন্দিরে ঢুকতে গিয়ে প্রহৃত হলেন তরুণী?

আসলে সময় বদলালেও পুরোপুরি বদলায়নি সমাজের গভীরে গেঁথে থাকা ভ্রষ্ট ধারণাগুলো। এই অপবিত্রতার ভুল ভাঙতে লড়াই চলছে বিশ্ব জুড়েই। কোথাও চলছে সচেতনতার প্রচার, কোথাও চলছে আড়াল ভাঙার আন্দোলন। কিন্তু এর মধ্যেই ঋতুস্রাব নিয়ে ট্যাবু ভাঙার এক অপূর্ব নিদর্শন রাখছে ওড়িশা। একটি মেয়ের মাতৃত্বের যোগ্য হয়ে ওঠার চিহ্নস্বরূপ শরীরে ঘটা এই পরিবর্তনকে রীতিমতো উৎসব করে পালন করছে এই রাজ্য! উৎসবের নাম ‘রজ পরব’।

এই উৎসবের আবহে ছুটি পান কিশোরী থেকে যুবতী— সমস্ত মেয়েই। শুধু ছুটি পান না, রীতিমতো আদর-যত্নে উদযাপিত হয় তাঁদের ভবিষ্যৎ মাতৃত্বের শুভ সম্ভাবনা। নতুন পোশাকে, পায়ে আলতা পরে, আনন্দ করেন তাঁরা। বাড়ির কাজ থেকে ছুটি মেলে এই ক’দিন। ভোর-ভোর ঘুম থেকে উঠে, চুল বেঁধে, সারা গায়ে তেল-হলুদ মেখে নদীতে বা ঝিলে স্নান করে, হেসে খেলে, দেলনায় দুলে, ভালমন্দ খাবার খেয়ে খুশিতে মাতেন তাঁরা।

বস্তুত, উত্তর-পূর্ব ভারতেও এমন এক ঐতিহ্য রয়েছে, যেখানে মা কামাখ্যার ঋতুমতী হওয়ার কারণে চার দিন বন্ধ থাকে মন্দির। অম্বুবাচী নামে পরিচিত এই প্রথায় এই সময়ে মায়ের দর্শন বারণ, ছোঁয়া বারণ। মায়ের যোনিপীঠ ঢাকা থাকে লাল পাড় সাদা শাড়িতে। মা যখন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

মায়ের ঋতুস্রাবের মতো অতিলৌকিক ঘটনার পুণ্য অর্জন করতে দেশ জুড়ে উপোস করেন আরও অনেক মা। উপোস করেন, পুজো দেন, মানত করেন। অথচ মায়ের পুরুষ ভক্তেরা কিন্তু এই উপলক্ষেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মন্দির চত্বরে আনন্দে মেতে ওঠেন। চার দিন ধরে চলা অম্বুবাচীর মেলায় তান্ত্রিক, অঘোরদের আখড়া জমে ওঠে। এই সময়ে যে মা সব চেয়ে ‘জাগ্রত’, তাই সঠিক পথে তন্ত্রসাধনায় অভীষ্ট ফল মিলবেই!

মা কামাখ্যার যোনিপীঠের উপর বিছিয়ে দেওয়া সাদা কাপড় কী ভাবে চার দিন পরে লাল হয়ে ওঠে তা নিয়ে বহু বিতর্ক, যুক্তি থাকলেও, সে সব সরিয়ে রেখে বছরের পর বছর আষাঢ় মাসে এভাবেই পালিত হয়ে চলেছে অম্বুবাচী। গবেষকেরা অবশ্য জানিয়েছেন, এই সময় কামাখ্যা মন্দিরের নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদ বর্ষায় ফুলেফেঁপে ওঠে। আর সেই জলেই ধুয়ে যায় মা কামাখ্যার শরীরে সারা বছর ধরে জমে থাকা সিঁদুর-কুমকুম। সেই জলেই সাদা কাপড় লাল হয়ে ওঠে। তবে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আর কবেই বা ধর্মীয় বিশ্বাসের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে!

এই জায়গা থেকেই আরও বেশি করে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রায় অজানা থেকে যাওয়া ওড়িশার রজ পরব। মা বসুন্ধরার ঋতুমতী হওয়ার আনন্দে গোটা ওড়িশা জুড়ে যে উৎসব পালিত হয়, রাজ্যের বাইরে প্রায় পৌঁছয়ই না তার খবর। ঋতুস্রাব নিয়ে যে প্রচলিত ট্যাবু, কুসংস্কার বয়ে চলেছে গোটা দেশ, যে সংস্কার অম্বুবাচীর সময়ে উপোস করার কথা বলে মহিলাদের, তার থেকে অনেকটাই উল্টো সুরে বয়ে চলেছে এই উপকূলীয় উৎসব।

 

পুরাণে কথিত আছে, আষাঢ় মাসে সূর্য মিথুন রাশিতে প্রবেশের সময় ঋতুমতী হয়ে ওঠেন ভূদেবী। পুরাণ মতে, কাশ্যপ প্রজাপতির কন্যা ভূদেবী উর্বরতার দেবী। তাঁর কথা রামায়ণে লেখা রয়েছে সীতার মা হিসেবে। আবার তামিল মতে, এই ভূদেবীই দ্বাপর যুগে আবির্ভূত হয়ে ছিলেন সত্যভামা রূপে, যখন তিনি শ্রীকৃষ্ণের স্ত্রী। তাই ওড়িশায় জগন্নাথের স্ত্রী হিসেবেই পূজিত হন ভূদেবী। তাঁকে নিয়ে আবর্তিত এই উৎসবের মুখ্য উপজীব্য হল, মেয়েরা প্রতি মাসের এই সময়টায় শারীরিক, মানসিক ভাবে অনেক অসুবিধার মধ্যে দিয়ে গিয়েও সমস্ত কাজকর্ম সামলান। তাই এই সময় তাদের আরও বেশি করে প্রয়োজন যত্ন, আদর, খুশি থাকা।

চার দিনের এই উৎসবের চতুর্থ দিনে স্নান করেন ভূদেবী। প্রথম দিনকে বলা হয় পহিলি রজ, অর্থাত প্রথম ঋতুস্রাব। দ্বিতীয় দিন সূর্যের মিথুন রাশিতে প্রবেশ করার দিন, মিথুন সংক্রান্তি। তৃতীয় দিন ভূ-দহ বা বাসি রজ অর্থাৎ পার হয়ে যাওয়া ঋতু। এবং চতুর্থ দিন বসুমতী স্নান। যেন ঋতু-যন্ত্রণা শেষে আরামের স্নানে পুনরুজ্জীবিত হলেন মা। লোকমুখে প্রচলিত, পৃথিবী এই সময় পুনরুজ্জীবনের মধ্যে দিয়ে যায়। এই সময় তাঁর প্রয়োজন বিশ্রাম ও যত্ন। তাই এই সময় বসুন্ধরাকে ব্যথা না-দেওয়ার কথা ভেবে ফুল তোলা, লাঙল চালানো, জমিতে সেচ দেওয়া বন্ধ রাখেন সাধারণ মানুষ।

ওড়িশার এই উৎসব যেন আবার নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, আদতেই বহু সংস্কৃতির দেশ ভারতবর্ষ। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে, প্রতিটি রাজ্যেই পাওয়া যায় সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের এই নিদর্শন। তাই রক্ষণশীল ভারতীয় সমাজে পিতৃতন্ত্রের কড়া চোখরাঙানির মধ্যেও ওড়িশার এই উৎসবটি নিজের ছন্দে স্বতন্ত্র।

এই উৎসব চলাকালীন মেয়েদের বিরত রাখা হয় কৃষি এবং গৃহস্থালির কাজ থেকে। এই তিন দিন শুধুই তাদের আরাম করা, পছন্দের খাবার খাওয়া, যত্ন আর প্রশ্রয় পাওয়ার সময়। ওড়িশার বিভিন্ন প্রান্তে মেলায় ঘুরে, সাজগোজ করে, দোলনায় ঝুলে এই সময় উপভোগ করেন মহিলারা। প্রাচীন রীতি মেনেই বর্তমানে বিভিন্ন অফিসেও মেয়েদের জন্য থাকে এই সময় বিশেষ ব্যবস্থা। উপহার, বিশেষ খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বিভিন্ন সংস্থায়। যে সময়টায় মেয়েদের খুশি, আরামের প্রয়োজনের কথা আধুনিক চিকিৎসকেরা বলে থাকেন, তারই প্রতিফলন বহু দিন ধরে দেখা যাচ্ছে ওড়িশার এই উৎসবে।

এই সময়ে যখন কর্মরতা মেয়েদের মেনস্ট্রুয়াল লিভ পাওয়া উচিত কি না তা নিয়ে সারা বিশ্বে যখন বিতর্ক চলছে, তখন ওড়িশার এই উৎসব বিশেষ ভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

Leave A Reply