আর কোনও ভগবান না থাকলেও আপনি রইলেন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়

স্কুল পেরিয়েছি। নন্দন চত্বরের লিটিল ম্যাগাজিন মেলায় উড়ে বেড়াচ্ছে শূন্য দশকের রঙিন প্রজাপতিরা। আমি তখনও শুঁয়োপোকাই। প্রজাপতিরা উড়তে উড়তে কত রকম লাইন বলছে মুখে মুখে…তারই মধ্যে একটি এসে গেঁথেছিল শুঁয়োপোকার গায়ে। বন্ধুরা বন্ধুদের পিঠ চাপড়ে বলে উঠত “আর কোনও ভগবান না থাকলেও আমরা রইলাম”। এ রকম করেই এক দিন হাতে এসেও পড়ল একটা বই “আমরা রইলাম”। খুব সম্ভবত আমার বন্ধু তিন্নি (শ্রেয়সী চৌধুরি) আমাকে দিয়েছিল বইটা।

তত দিনে অবশ্য এই কবির অনেক লাইনই আমি জানি। কিছুটা পড়ে, কিছুটা বন্ধুদের মুখে মুখে। সেই আমার পিনাকী ঠাকুর পড়া শুরু। “আমরা রইলাম”, “অঙ্কে যত শূন্য পেলে” এই সব পড়ে ফেললাম দ্রুত। কিন্তু ওই যে মেলার মাঠে হেঁটে যান যিনি ধীর পায়ে, যিনি থাকেন কৃত্তিবাসের স্টলে, উনিই ? উনিই লিখলেন বুঝি এই সব?

কিন্তু ওঁর ওই ধীর গতিতে হাঁটা আর নিস্পৃহ তাকানো দেখে ঠাহর করাই তো মুশকিল, যে এমন সব লেখা ওঁর। স্কুলের শেষের দিকে আর ঠিক স্কুল শেষের পরে কৃত্তিবাসের লেখা পাঠানো মানেই ছিল ডাকে। কিন্তু যাদবপুরে ভর্তি হওয়ার পরে, ফেরার পথে গড়িয়াহাট মার্কেটের ওপর ‘যোগাযোগ’ নামের অফিসঘরে কৃত্তিবাসের লেখা জমা দিতে গেছি এক আধবার। প্রথম বার গিয়েছিলাম নিজেই, আর সেই আমার অত সামনে থেকে পিনাকীদাকে দেখা। কিন্তু মজা হল এই, যে ওঁর ব্যবহারে তা মনে হতো না একদমই। বরং নাম শুনে বসতে বলে অত ছোট কোনও মেয়েকে ভারী স্বীকৃতি দিয়ে কথা বলার মধ্যে যে ঔদার্য ও স্নেহ থাকে তা ওঁর ছিল। আমার কোথাও কোনও লেখা বেরোলে আর তা ওঁর ভালো লাগলে, মাঝে মাঝে নিজেই জানাতেন। তার পরে কৃত্তিবাসে চেয়ে কবিতা ছেপেছেন অনেক বার। মানুষটি এত শান্ত, এত স্থির। যে ভয় করত না একটুও।

কবিতা পড়ি, লিখি, কিন্তু তা-ও আমার শৈশব কাটছিল না অনেক দিন। নানা রকম সব গল্প জুড়তে ইচ্ছে করত সকলের সঙ্গে। কিন্তু চাইলেই কি পারা যায়? কী ভয়ই না লাগত কত জনকে। তাঁরা খুব নরম করে কবিতা লিখলেও তাঁদের দেখে আমি ভয়ই পেতাম। গল্প করার সাহসই হতো না। কিন্তু পিনাকীদাকে একটুও ভয় করত না আমার। ফলে, এক বার হয়েছে কী, কৃত্তিবাসে পিনাকীদার কোনও এক কবিতায় ‘ই ওয়ান’ বাসের প্রসঙ্গ ছিল। কবিতাটা তো ভালো লেগেই ছিল, আমি বেশি খুশি হয়ে গিয়েছিলাম ওই ‘ই ওয়ান’ দেখে। কারণ তখন আমি ‘ই-ওয়ান’-এ চেপেই কলেজে যাই। আর আমি যে বাস চাপি সেই বাসেই কি না চাপেন পিনাকী ঠাকুর? সেই সময় ওঁর সঙ্গে এসএমএস-এ যোগাযোগ হতো। আর যেহেতু ওঁকে দেখে আমার একটুও ভয় করত না, তাই মনে আছে আমি বেশ গুছিয়ে এসএমএস করেছিলাম ওঁকে। “ও পিনাকী দা জানেন তো, আমিও ‘ই ওয়ানে’ করে যাই”। ওঁর কবিতার কোনও উল্লেখ না করে এমন আশ্চর্য মেসেজ দেখে রেগে তো যানইনি, বরং মনে আছে ‘ই ওয়ান’ নিয়েই বেশ খানিক এসএমএস-এ গল্প হয়েছিল আমাদের।

ফলে এই সব কারণে পিনাকীদাকে বড় নিজের মনে হত, কাছেরও। ওঁর ব্যবহারের মধ্যে এমন এক স্নেহ ছিল, আর ছিল শিকড়ের টান, যে আমাদের শ্রদ্ধার ভিতরে মিশে যেত তীব্র ভালোবাসা। আমাদের অজান্তেই।

বিয়ে করেছি, বাড়ি বদল, লেখা আসছে না । তার পরে হঠাৎ কিছু লেখা এল, নাম দিলাম “বিবাহ পরবর্তী কবিতা”। ভয়ে ভয়ে পাঠালাম কৃত্তিবাসে। পিনাকীদার সেই উচ্ছ্বাস আর ভরসা আমি ভুলব না কোনও দিন। ফোন করে বললেন “এই সিরিজের আর লেখা আছে? তা হলে গুচ্ছ পাঠাও পরের সংখ্যায়।” সে সব আমার কাছে সত্যিই স্বপ্নের মতো। আসলে তত দিনে তো পিনাকীদাকে পড়েও ফেলেছি অনেকটা।

পিনাকীদাকে? উঁহু, ভুল বললাম। ওঁর কবিতাকেই। ওঁকে বরং সত্যিই তেমন করে পড়তে পারিনি আমি। খানিকটা মুগ্ধতা আর শ্রদ্ধা থেকে দূরত্ব আসে। এ ক্ষেত্রেও হয়তো তাই হয়েছিল, ‘ই ওয়ান’ নিয়ে গল্প হলেও তেমন করে ঠিক গল্প জমেনি আমাদের। অন্তত মিনি আর কাবুলিওয়ালার মতো তো নয়ই। কিন্তু সেই ‘ই ওয়ানের’ সূত্র ধরে হতেও তো পারত তেমন? কিন্তু হয়নি। হয়তো খানিক আমারই বড় হওয়া আর আড়ষ্টতার জন্য। আস্তে আস্তে দেখা সাক্ষাৎ বাড়ল। আমি কেবল দেখতাম, অমন নিরীহ দেখতে একটা মানুষ মাইকের সামনে যে কবিতাগুলো পড়েন সেগুলো আদতে নিরীহ নয়। পড়ার সময়ে মৃদু একটা হাসি লেগে থাকে ঠোঁটের কোণে। আর তার পরে নেমে এসে বাকি সকলের লেখা মন দিয়ে শুনে, ব্যাগটা কাঁধে চাপিয়ে বেরিয়ে যান ধীরে ধীরে। ট্রেন ধরতে হবে। ফিরতে হবে বাঁশবেড়িয়া। বারবার চুপ করে ভেবেছি ইনি-ই লিখেছেন এই সব স্মার্ট কবিতা ?

“…শুধু মধুবনী পর্দা,মাথা নিচু চলে যাচ্ছি, যদি
যদি আজ কোনও ভুলে আড়াল সরাও, ডেকে ওঠোঃ
– দ্যাখ কবি, দ্যাখ ন্যাকা আর বলবি, তুমিই কবিতা
তোমাকে না পেলে আমি…”

কী রে, হি হি, বল শালা লাভার”

ওঁকে দেখে বিশ্বাস করাও অসম্ভব যে এই লেখা ওঁর। আসলে ঠিক এইখান থেকেই মনে হয় কবিকে কি দেখা যায় কখনও? বোধ হয় না।

“দিন কেটে যায় ‘কবিসুলভ’! রাত
দাঁতের ফাঁকে মাংস খুঁটে খায়
পাড়ার মোড়ে অজানা সংঘাত
চপার, চাকু মেশিনে চমকায়”

বছর তিনেক ধরে কৃত্তিবাসের সঙ্গে যুক্ত থাকায় ওঁর সঙ্গে দেখা হত আর একটু বেশি। কৃত্তিবাসের ঘরোয়া মিটিং-এ কিংবা অনুষ্ঠানে, সব সময়েই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ির বসার ঘরের বারান্দার দরজা খোলা, আলো খেলে যাচ্ছে সারা ঘরে। স্বাতীদি বসে আছেন। আমরা হয়ত সদ্য ঢুকলাম, আর সহাস্য মুখে ঢুকলেন পিনাকীদা। একই মৃদু স্বরে কথা, চাপিয়ে দিতেন না কিচ্ছু। স্বাতীদির নির্দেশেই ধনঞ্জয় দা হয়ত সাজিয়ে দিয়ে গেছেন সিঙাড়া আর মিষ্টি। কথার মাঝে পিনাকীদা সেই সহাস্য মুখেই সবার দিকে তাকিয়ে বললেন “নাও…নাও”। এমনটাই তো হয়ে এসেছে এই ক’বছর। আর বুঝি হবে না? এখনও বিশ্বাস করতে অসুবিধে হচ্ছে খুব।

এসএসকেএম–এর আইসিসিইউ-এর ভিতরে যে হাঁ করে স্থির হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে এলাম, আমি শুধু পালাতে চাইছি সেই মুখটা থেকে। হাসপাতালের চাতালে, কিংবা বাংলা একাডেমির চত্বরে আমি শুধু বারবার ফিরে যেতে চেয়েছি কৃত্তিবাসের মিটিং-এ, পিনাকী দার একটা সহাস্য মুখের কাছে।

পিনাকীদার গলার স্বরও খুব অন্য রকম। আর পাঁচ জনের থেকে একদম আলাদা। এই যে কিছু দিন আগে পৌলোমীদির (পৌলোমী সেনগুপ্ত)র চলে যাওয়া ভাবতেই পারছিলাম না আমরা। এই যে কৃত্তিবাসের আয়োজনে পৌলোমীদির স্মরণসভায় বলতে উঠলেন পিনাকীদা, তখনও তো জানতাম না যে আর ক’টা দিন পর থাকবেন না উনিও। একটা বছরের শেষ থেকে শুরু হল যে মৃত্যুর মিছিল, বছরের শুরুতেই সেই মিছিলে হাঁটতে নামলেন পিনাকীদা।

অথচ এমন তো ভাবিনি আমরা! বাড়ি ফিরে হোয়াটসঅ্যাপ খুলে দেখছিলাম, ওঁর করা মেসেজ। লিখছেন “জ্বর হয় কেন তোমার? অবহেলা কোরো না, এক সময়ে আমি অবহেলা করার জন্য নিজে ভুগেছি অনেক। স্বভাব বদলানোর চেষ্টা করছি। তাই হয়তো মনে হয় এসব”। মেসেজে রয়েছে আরও অনেক টুকরো, কেবল শেষে লেখা “ভালো থেকো, লিখো নতুন লেখা”।

সেই দিকে তাকিয়ে ভাবছি, নতুন বই কবে তুলে দিতে পারব পিনাকীদার হাতে? সেই যে অপেক্ষা থাকত, সে অপেক্ষা তবে ফুরোল এবার? আপাতত বহু বছর হবে না সে সব? যত দিন না অন্য কোথাও আবার দেখা হচ্ছে আমাদের। ২০১৬-য় আমার কৃত্তিবাস পুরস্কারের যে মানপত্র, তা লিখে দিয়েছিলেন পিনাকী ঠাকুর। সেইটুকু আমার পরম প্রাপ্তি হয়ে রয়ে যাবে।

ফুল, মালা, ধূপের গন্ধ…এইসব কিছু থেকে পালাতে চাইছি আজ। এত ক্ষণে নিশ্চই দাহ করা হয়ে গেছে…

“ ট্রাম পোড়াও, বাস পোড়াও,পুড়িয়ে দাও
চোখের জল,সভ্যতা
অবাধ্য সব বউ পোড়াও

পুড়িয়ে দাও কালা কানুন,নিজের হাতে আইন নাও
ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা, ছেঁড়া টায়ার
নাও, পোড়াও

কিন্তু ওই ফুটপাথের এক পাগল আগুন নিভে যাবার পর
শীতের রাতে চেঁচাচ্ছে
আগুন জ্বাল, আগুন জ্বাল
আলুর গুদাম ফের পোড়া
অল্প একটু নুন আনিস –

আগুন জ্বাল”
‘ই-ওয়ান’-এ চেপে, কোথায় গেলেন পিনাকীদা।

(লেখক সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার প্রাপ্ত)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More