এই মৃত্যু মানি, বিশ্বাস করি না 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

 বিভাস রায়চৌধুরী

একটা কথাই বারবার মনে হচ্ছে। মনে পড়ছে। পিনাকী ঠাকুরের প্রথম কবিতার বই ‘একদিন, অশরীরী’-র  প্রবেশক কবিতা ছিল–“… মাত্র এ অতীত লিখে/ বাকি যত প্রাণ ও ধারণ/ সম্ভব কি হতো, যদি/ আমার মৃত্যুর পার থেকে/ ও রকম না তাকাতে–”।

কল্পনা হিসেবে মৃত্যু মধুর। কবিদের প্রিয় বিষয়। অভিমান থেকেই এই মৃত্যু শব্দটা আসে। কিন্তু বাস্তবে মৃত্যু ভাবলেশহীন, নিষ্ঠুর। এক মুহূর্তে সে মুছে দেয় একটি সংগ্রাম, স্বপ্ন, আশাবাদী আগামীকে। পৌলোমী চলে গেছে বিশ্বাস‌ই করি না। পিনাকীদা চলে গেলেন তা-ও বিশ্বাস করব না। যত দিন বেঁচে আছি বিশ্বাস করার দরকার‌ও নেই। এই তো দশ-বারো দিন আগে বসিরহাটে এক অনুষ্ঠানে আড্ডা দিয়ে এলাম। আর আজ নেই?

তবু, না চাইতেও ফেসবুকে এক ঝলক দেখা হয়ে গেল কাচের গাড়িতে চিরতরে ঘুমিয়ে আছেন পিনাকী ঠাকুর। নতুন কবিতা তিনি আর লিখবেন না। তাঁর ‘মৃত্যুর পার’ থেকে কে তাঁর দিকে আকুল হয়ে তাকিয়ে আছে, তাতে আজ আর তাঁর কী এসে যায়? কবিতার জন্য পিনাকীদা অনেক কিছু পেয়েছেন। কেবল কবিতা আঁকড়ে বাঁচতে গিয়ে হারিয়েছেন‌ও অনেক কিছু। জীবনের এক বিপর্যস্ত সময়ে অসুস্থ পিনাকীদা গূঢ় গোপন কথা বলতেন, যার সাক্ষী অনেকেই, সে সবের সত্যমিথ্যা সমেত‌ই তিনি ছাই হয়ে যাবেন।

মৃত্যু এমন‌ই। জীবন্ত  প্রমাণ লোপাট করে দেয়  চোখের নিমেষে। ‘এক দিন সব বলব’ ভেবে মানুষ মাটি কামড়ে ধরে বাঁচে। কিন্তু বলা হয় না। সব মুছে যায়।  গুপ্তহত্যাবিবরণী। ‘বিপজ্জনক’ দীর্ঘকবিতায় কবি এক শ্রেণির মানুষের ছবি এঁকেছিলেন, যারা বশ্যতা স্বীকার করেনি বলে কেউ মাতব্বরের কাছে, কেউ রাষ্ট্রের কাছে, কেউ সম্পাদকের কাছে গোলমেলে,  বিপজ্জনক। “মোবাইল থেকে মোবাইলে খবর যাচ্ছে, কোথায় এখন বিপজ্জনক / …….কারা জেরক্স করে নিচ্ছে তোমার প্রাক্তনপঙক্তি….” বা “কিংবা চার নম্বরের চোট লেগেছে  রটিয়ে মাঠে নামাবে চোদ্দো নম্বরকে /….আসল কথা আপনি বিপজ্জনক”। পিনাকীদা ভাল ছেলে টাইপের। জীবন নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেননি। ভদ্র, সৌজন্যমূলক হাসির মালিক ছিলেন। সাক্ষাৎকারে ঝুঁকিহীন অল্প কথা বলতেন।  নানা পুরস্কার পেয়েছেন। স্বনামধন্য মানুষদের প্রিয় হয়েছেন। তবু কেন এই অশান্তি? কেন বিপজ্জনক অভিধা? কবিতা লিখে বাঁচতে চাওয়া মানুষকে কে তাড়া করে?  কয়েক বার তিনি ধ্বংস হয়েছেন। কয়েক বার প্রাপ্তিযোগ ঘটেছে। এই সব রক্তপাত, পুরস্কার এক মুহূর্তে অতীত হয়ে গেল!

নব্বইয়ের শুরুর সময়টা মনে পড়ে। বাংলা জুড়ে সমবয়সি কত জনের মনে কবিতা নামছে। কেউ কাউকে চিনি না। এক অজানায় ভাসতে ভাসতে ছোট বড় পত্রপত্রিকায় আমাদের নাম পরস্পরের পরিচিত হয়ে উঠল। চিঠিতে, ফোনে যোগাযোগ হল। কেউ দুম করে চলে এল কারও বাড়ি। কলকাতাকে ঘিরে যাঁরা, কিছু দিন পরে তাঁদের এক জায়গায় করে ফেলল ‘বিজল্প’। দূরের কবিদের‌ও লেখার ঠেক হয়ে ওঠে এই পত্রিকা।  প্রসূন ভৌমিক, সাম্যব্রত জোয়ারদার, তাপস কুমার লায়েক, নুরুল মোর্তাজারা ছিল বন্ধুপাগল।

মাসে এক বার আমিও যেতাম কলেজ স্ট্রিটে ওদের আড্ডায়। বনগাঁ থেকে আমরা তখন ‘মুহূর্ত’ বার করতাম। পিনাকী ঠাকুর, শিবাশিস মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ওখানেই আলাপ, বন্ধুত্ব। পিনাকীদা আমার থেকে দশ বছরের বড়। আমাদের কবিতার থেকে তাঁর কবিতা তখন বেশি পরিণত। বড় কবিরা পিনাকীদাকে শক্তিশালী হিসেবে শনাক্ত করলেন। বড় বড় পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়ে পাঠকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল পিনাকীদার কবিতা। আমি, শিবাশিস, পিনাকীদা তখন খুব ঘনিষ্ঠ। পিনাকীদা আর আমি লেখা ছাড়া কিছুই করি না। বিকাশ ভবনে চাকরি করা কবিতা অন্ত প্রাণ শিবাশিসের বিশেষ যত্ন পেতাম আমরা। মাঝেমাঝেই রাতে শিবাশিসদের সুখচরের হুল্লোড়ে ভরা বাড়িতে রাত কাটিয়ে পরের দিন পিনাকীদা বাঁশবেড়িয়ায়, আমি বনগাঁয় ফিরতাম। জীবনের চাপে সে সব দিন থাকল না। দূরত্ব তৈরি হল। যে যার বৃত্তে পাক খেতে খেতে কত দিন কাটিয়ে দিলাম। পিনাকীদার কবিতা মফস্বলের ইতিহাস, জেদ, সারল্য, ঠাট্টা, উন্নয়ন-লোভ নিয়ে বয়ে চলল বাঁকে বাঁকে। আমার কেবলই মনে হয়, কবি পিনাকী ঠাকুর সত্তরের শাস্ত্রীয় ছন্দদক্ষতা, আশির সংযম ও চাপা বিদ্রুপে গড়া।  তাঁর কবিতা সুচিন্তিত।

কবির মৃত্যু কবিকে মুছে দেয়। কিন্তু  তাঁর কবিতা লড়াই শুরু করে মৃত্যুর বিরুদ্ধে। অত সহজে দান ছেড়ে দেবে না কবিতা। কবিকে শুভ বিদায় জানিয়ে পিনাকীদার কবিতা যেন বলছে,”… আমরা র‌ইলাম।/ হয়েছি বনসাই, বৃক্ষ, আছি গুপ্ত ডোরাকাটা,/ তুমি আছো আমি আছি মঙ্গলের উল্কা পাথরেও!/ আবার সংবাদশীর্ষ: গর্ভে লাথি মেরে দেখল রণবীর সেনা/ ঝরে পড়ছি নষ্ট ভ্রূণ, ঘুরে পড়ছি, পড়তে পড়তে

ঘুরে দাঁড়ালাম ভবিষ্যৎ…”

(বিভাস রায়চৌধুরী বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক। কবিতার জন্য পেয়েছেন বাংলা আকাদেমি ও কৃত্তিবাস পুরস্কার)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More