শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

দুটো গন্ধরাজ ফুল হাতে দিলে ঝলমলিয়ে উঠতেন

অনিতা অগ্নিহোত্রী

সোনার সুতোয় বোনা একখানি ঢাকাই শাড়ির মতো জমকালো ব্যক্তিত্ব নবনীতা দেবসেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ঘুরেছেন লেখা ও পাণ্ডিত্যের জন্য আদর-সম্মান পেয়ে। পৃথিবীর তাবৎ বিখ্যাত, গুণী মানুষদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। অথচ তাঁকে খুশি করার মতন সহজ কাজ আর কিছু ছিল না। দুটো গন্ধরাজ ফুল হাতে দিলে ঝলমলিয়ে উঠতেন। নিজের লেখা নতুন বই দেখালে জড়িয়ে ধরতেন। তাঁর চেয়ে কমবয়সী লেখিকাদের নিয়ে নবনীতাদির আহ্লাদের সীমা ছিল না।

একবার শীতের গোড়ায় কালাহাণ্ডির সীমায় নিয়মগিরি পর্বতে গিয়ে দেখি, পাহাড় থমথমে। ক’দিন আগেই আন্দোলনের কয়েকজন নেতাকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে। বহুজাতিক কোম্পানি গ্রামসভার মাথায় ঝুলিয়ে রেখেছে বক্সাইট খুঁড়ে তোলার খাঁড়া। ডোঙ্গরিয়া (বা পাহাড়ি) কন্ধদের বাস নিয়মগিরি পাহাড়ে। তাঁদের মেয়েরা হাতেবোনা তাঁতের কাপড়ে মোটা সুচে ফুল তুলে শাল বানায়। সারা গ্রাম খুঁজে একখানা মাত্র শাল পেলাম। কারও মন ভালো নেই। কেউ বুনছে না, ফুল তুলছে না তখন। মোটা শালটি এনে নবনীতাদির গায়ে জড়িয়ে দিতে বালিকার মতো খুশিতে উচ্ছল হয়ে উঠলেন। ও মা, কী সুন্দর, ওদের নিজের হাতে বোনা, এবার শীতে আমি এটাই ব্যবহার করব। মনে হল যেন, নিয়মগিরি পাহাড়ের আদিবাসী মেয়েদের আন্দোলন উত্তাপ ও উষ্ণতা পেল একজন বাঙালি সাহিত্যিকের মনের কাছ থেকে। এইরকমই নবনীতাদি।

আমরা যেন নতুন বই পড়ি, ভালো লিখি, মন দিয়ে লিখি– লেখাপড়ার ভাবনাতেই ডুবে থাকি, এটা প্রায় প্রতিদিন মনে করাতে ভুলতেন না।

গদ্য, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোট গল্প, শিশুসাহিত্য, ভ্রমণ কাহিনি, অনুবাদ সাহিত্যের সবক’টি ধারা তাঁর কলমে বিদ্যুৎপ্রবাহের মতো খেলত। জাত লেখক নবনীতাদি তাঁর সাপ্তাহিক কলমেও অতি ক্ষুদ্র বিন্দুকে পরিণত করতেন সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসে– তাঁর চিন্তন, মনন, অভিজ্ঞতা, স্বপ্ন সব কিছু মিশিয়ে।
সাহিত্যে লিখনশৈলী যে কত গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর লেখা পড়ে প্রতিদিন অনুভব করেছি। ভাষার নির্মাণ অনেকেই এখন আর যত্নসহকারে করেন না। বিখ্যাত লেখকের কলমে ভুল বানান, অপটু বাক্যবিন্যাস চোখে পড়ে। নবনীতা দেবসেনের সাহিত্য ভাষা ছিল নিখুঁত। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তাঁর মৌলিক সৃজনশীল সত্তা। সব মিলিয়ে নবনীতা দেবসেনের সাহিত্যকীর্তি যেন আনন্দ ও বিস্ময়ের মহাভোজ। তবে বহু শাখায় সাহিত্য রচনা ছড়িয়ে পড়লে যা হয়, পাঠক রুচির চাপে তাঁর রম্যরচনা ও ভ্রমণ কাহিনিগুলি নবনীতা দেবসেনকে পৌঁছে দিয়েছে বাংলার ঘরে ঘরে। তুলনায় কিছু আড়ালে রয়ে গেছে তাঁর কবিতা ও অসামান্য উপন্যাসগুলি। গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি উপন্যাস ও ভ্রমণ সাহিত্য ইংরাজিতে অনুদিত হয়ে নবনীতা দেবসেনের পাঠকবৃত্ত প্রসারিত করেছে বাংলা ও ভারতের বাইরেও।

লেখকসত্তা ছিল তাঁর বহুবর্ণ, বহুমাত্রিক, আলো বাতাসের বদলে নানা রং উদ্ভাসিত হয়ে উঠত তা থেকে। কিন্তু নবনীতা দেবসেন তো কোনও একটি মানুষ ছিলেন না। তাঁর মধ্যে বাস করত অনেকগুলি নবনীতা। সুযোগ্য মেয়েদের কৃতিত্বে যতখানি আনন্দ পেতেন, অচেনা গ্রামীণ মানুষের জন্য দিতেন হৃদয় উজাড় করা যত্ন। দেশের নানা সঙ্কট, প্রান্তিক মানুষ, সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার, মেয়েদের বিরুদ্ধে অপরাধ– তাঁকে বিচলিত, ক্ষুব্ধ করে তুলত। রাজনৈতিক পেশিশক্তির আস্ফালনকে তিনি আমলই দিতেন না।

রাজনীতির বোধ প্রবল ছিল বলেই গভীর আস্থা ছিল নিজের মত ও তার প্রকাশের স্বাধীনতায়। ‘প্রিয়’ হওয়া তাঁর অভীষ্ট ছিল না, ‘সত্য’ হওয়াই ছিল কাঙ্ক্ষিত।

লেখক জীবন, অধ্যাপনার অভিজ্ঞতা, তাঁকে বহু সাফল্য এনে দিয়েছে, কিন্তু নিজের গভীরে বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্রীটিকে সতত লালন করেছেন, যে মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য বিদেশে ছাত্রী জীবনকে বাজি ধরতে রাজি ছিল।

আজ সকাল থেকে দেখেছি হিন্দুস্থান পার্কের ‘ভালোবাসা’ বাড়িতে উপচে পড়ছে গুণমুগ্ধ অগ্রজ, সমবয়সী ও অনুজদের ভিড়। প্রতিষ্ঠিত কবি, লেখক, শিল্পীর সঙ্গে আছেন অসংখ্য পাঠক, যাঁরা নবনীতা দেবসেনের লেখার মধ্যে দিয়ে জীবনকে নিত্য দেখতে পান। এই ভালোবাসা কদাচিৎ কোনও বাঙালি লেখকের ভাগ্যে জুটেছে। নবনীতা দেবসেন কোনও প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে ছিলেন না, সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনাও করতেন না। কিন্তু একাই তিনি ছিলেন অনেক মানুষ, একাধিক প্রতিষ্ঠান। ‘ভালোবাসা’ বাড়িতে ব্যক্তিগত সমস্যা, সাহিত্য জীবনের সঙ্কট নিয়ে যে কত মানুষ এসেছে, বৃহৎ এক মহীরুহের ছায়া তারা অনুভব করেছে দেহে, মনে। বিপুল বৈদগ্ধ্য, সারা বিশ্বে পর্যটন, কিন্তু লেখক নবনীতা একেবারে মাটির কাছাকাছি। সবার সঙ্গে সৃজনশীলতার শালিধান্যের অন্ন ভাগ না করে নিলে যেন তাঁর শান্তি নেই। মানুষ, বাঙালি পাঠক হয়তো চিরকাল এমন একজন সাহিত্যিককে চেয়ে আসছে, লেখার মধ্যে দিয়ে যাঁর করতল স্পর্শ করা যায়। তাঁর সঙ্গে ট্রেনে, বিমানবন্দরে যে সহলেখকরা ভ্রমণ করেছেন তাঁরা জানেন, নবনীতাদিকে নিয়ে মানবশৃঙ্খল ভেঙে ট্রেনের কামরা কিংবা এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি চেক পর্যন্ত পৌঁছনো কী কঠিন।

মাথায় খ্যাতির মহার্ঘ শিরোভূষণ, ধুলিমাখা দুই পায়ে ঘাসফুলের ঘুঙুর, হৃদয়ের উত্তাপে গলিয়ে দেওয়া মৃত্যুর ইস্পাত-শৃঙ্খল– আমাদের মধ্যে এমন একজন সাহিত্যিক, ক্ষোভ-অভিমান-ভালোবাসা-প্রতিবাদে তৈরি খাঁটি একজন মানুষ আবার কবে আসবেন, কেউ জানি না।

Comments are closed.