শিল্প বোঝা প্রথম শিল্পমন্ত্রী ছিলেন নিরুপম

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

সুপর্ণ পাঠক

মোবাইল বাজতেই তুলে দেখি শিল্প সচিব সব্যসাচী সেনের নাম ভাসছে স্ক্রিনে। “ফাঁকা আছো? সেকেন্ড হাফে আসতে পারবে? মন্ত্রী কথা বলতে চান।”

শিল্প বিরোধী থেকে শিল্পমুখী হয়ে ওঠার ব্যগ্রতায় তখন পশ্চিমবঙ্গ ভাসছে। সাংবাদিক থেকে বাম রাজনীতিবিদ, চারদিকে সবাই তখন ব্যস্ত কে কতটা শিল্পমুখী তার প্রমাণে। অথচ শিল্পমন্ত্রীর চেয়ারে সে রকম তাবড় কেউ ছিলেন না। বিদ্যুৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পরে, বংশগোপাল বাবু চেয়ারে। কিন্তু শিল্প সামলান সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়।

২০০১ সালে নিরুপমবাবু মন্ত্রিত্ব নেওয়াতেই পরিবেশ বদলাতে শুরু করে। কারণ এতদিন ভাবমূর্তি ফেরানোর দৌড়টাই প্রকট হয়ে ছিল। তাই চারদিকে একটা সংশয় মেশানো উত্তেজনা। হেভিওয়েট নেতা। দলকে সঙ্গে রেখে শিল্পায়ণের পথে এগোবেন, না পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে খুঁড়িয়ে চলার রাস্তাই বেছে নেবে বামফ্রন্ট?

প্রসঙ্গে ফিরি। রাইটার্স অফিস থেকে হাঁটা পথ। বিকেলবেলায় গেলাম সব্যসাচী সেনের ঘরে। সঙ্গে সঙ্গে টানতে টানতে নিয়ে গেলেন মন্ত্রীর ঘরে। প্রাথমিক পরিচয়ের আড় ততদিনে কেটে গিয়েছে। বসার সঙ্গে সঙ্গেই বিনা ভূমিকায় তাঁর প্রস্তাব, ডিএফআইডি-র সঙ্গে বসিয়ে দিতে হবে রাজ্যকে। আমি তো হাঁ! জানতাম শিল্প পুণর্গঠন করতে রাজ্য ডিএফআইডি-র কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য চায়। কিন্তু জানতাম না যে, ব্রিটিশ সরকার এ ব্যাপারে উৎসাহ দেখাচ্ছে না।

আমার পিঠোপিঠি তুতো দাদা স্যর সুমা চক্রবর্তী তখন ওই সংস্থার সচিব। এবং দাদা তখন কলকাতায়। আমি ফোনে বললাম, “তোর জন্য আমি ফেঁসেছি। ওরা একটা মিটিং চাইছে। কথাটা অন্তত বল!” দাদার উত্তর সোজা। “তুই কি সিওর, যে কম্যুনিস্টরা অলাভজনক কারখানা বন্ধ করতে রাজি হবে?” আমার উত্তর আর কী হতে পারে? “দেখ” বলা ছাড়া? দাদা রাজি হয় মিটিংএ। তারপর তো ইতিহাস। গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু উপসংহারটা বলতেই হবে। ওঁদের ফেরার পরে গিয়েছি দেখা করতে। ঢুকতেই স্মিত মুখে নিরুপমবাবুর অনুযোগ, “আপনি তো মানুষ খুন করতে পারেন!” সেদিন ওঁর ঘরে আমরা বাংলায় নিজেদের মধ্যে কথা বলে ফেলেছি। উনি পরিষ্কার বাংলায় বললেন, “আপনারা আমার সঙ্গে বাংলায় কথা বলতে পারেন!” ডিএফআইডি-র টাকায় কাজ কী হয়েছে তার প্রমাণ নতুন গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল। যদি ওই টাকাটা না আসত, তাহলে কলকাতার ঐতিহ্য এই হোটেলটির কী হাল হত তা আর বলে দিতে হয় না।

শুধু দেশের মধ্যে নয়, বিদেশেও রাজ্যকে বিনিয়োগমুখী করে তুলতে তখন রাজ্য ব্যাগ্র। ক্যালকাটা ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে শহরের দূতাবাসের কর্মীদের ছেলেমেয়েরা পড়ে। পরিচালনায় রয়েছে ট্রাস্টি বোর্ড, যেখানে সদস্য হিসাবে থাকেন অভিভাবকদের প্রতিনিধিরা। লি রোডের ক্যাম্পাস থেকে রুবির পাশে উঠে আসার জন্য জমি কেনা হয়েছে। একদিন মধ্যরাতে স্কুলের প্রিন্সিপাল অনুরাধা দাসের ফোন। আমার পুত্র ওই স্কুলে পড়ার সূত্রেই পরিচয়। পুলিশ নাকি ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতিকে গ্রেফতার করতে যাচ্ছে। অভিযোগ স্কুল নাকি অন্যের জমি, নিজের জমির মধ্যে নিয়ে বেআইনি নির্মাণ করছে। সভাপতি কে? না জার্মান উপরাষ্ট্রদূতের স্ত্রী!

সাত পাঁচ ভেবে সব্যসাচী সেনকে ফোন করলাম। সমাধান হল। কিন্তু পরের দিন শিল্পমন্ত্রীর কাছে ঘটনাটা জানলাম। ওই জমি স্কুল কিনেছিল সম্ভবত কেএমডিএ-র কাছ থেকে আর সেই জমিরই একটা অংশ কোনও স্থানীয় তালেবর আর এক জনকে বেচে দিয়েছে পেট্রল পাম্প করার জন্য! এর পরে নিরুপমবাবুর বিমর্ষ উক্তি, “আপনি না থাকলে কেলেঙ্কারি হয়ে যেত। আজই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মিটিং। আমাদের আসল সমস্যাটা এটাই। সবাই যদি ব্যাপারটা না বোঝে তাহলে আমরা কী করে এগোব বলুন?”

সরকারি অফিসে তলার দিকে যাঁরা, তাঁরা একই রাজনীতির শরিক হলেও, তাঁদের কাজে প্রবল অনীহা। সেটাই তখন গোটা দেশে আলোচনার বিষয়। পশ্চিমবঙ্গে কোনও কাজ হয় না। এই নিয়ে ওঁরও ক্ষোভের শেষ ছিল না। বলতাম, “এই অভ্যাসটা তো আপনারাই তৈরি করেছেন। ‘চলবে না’ স্লোগান কি মানুষ এত তাড়াতাড়ি ভুলে যেতে পারে?” উনি হাসতেন।

মনে আছে রাজ্যের কর্ম সংস্কৃতি নিয়ে রাজ্য সরকারের সমালোচনা করে উত্তর সম্পাদকীয় লিখেছি। বিকেলে ওঁর ব্যক্তিগত সচিবের ফোন, “মন্ত্রী কথা বলবেন।” তারপরেই ওঁর গলা, “গোটাটার সঙ্গে সহমত হতে পারলাম না। কিন্তু লেখাটা ভাল হয়েছে।”

আমার সঙ্গে যে কতিপয় রাজনীতিবিদদের পরিচয় ছিল তার অনেকটাই ছিল সামাজিক পরিসরে। নিরুপমবাবুর সঙ্গে পরিচয়টা পুরোপুরিই পেশাগত। কিন্তু কয়েক বছরেই সেই সম্পর্কটা কোথাও গিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গায় পৌঁছে যায়। আমার সাংবাদিক জীবনে তিনিই প্রথম শিল্পমন্ত্রী যাঁর মাথায় রাজ্যের শিল্পচিত্রটা পরিষ্কার ছিল। এক মুহূর্তের জন্য কোনও দিন তথ্য নিয়ে তোতলাতে দেখিনি।

আর তিনিই প্রথম শিল্পমন্ত্রী যাঁকে নিজের পরিসরের মধ্য থেকে পাওয়া তথ্যের বাইরেও মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা দিয়ে যাচাই করে নিতে দেখেছি। আমাদের পরিচয়ের বয়স তখন এক বছরও পার করেনি। বন্ধ চা বাগান ও শ্রমিকদের মৃত্যু নিয়ে পাঁচ কিস্তিতে লেখা তৈরি। প্রয়োজন নিরুপমবাবুর বক্তব্য। না হলে রাজ্য সরকারের ভাবনাটা লেখায় থাকবে না। স্থানীয় বামফ্রন্টের কিছু নেতা এর সুযোগ নিয়ে পয়সা বানাচ্ছে। কী ভাবে তা অন্য প্রসঙ্গ। ঘরে ঢুকতেই ফোনে শিল্পসচিবকে ডেকে নিলেন। ওমা! তারপর দেখি নোটবই খুলেছেন। তারপরে শুরু হল তাঁর প্রশ্নবাণ। কী দেখলাম? কোন কোন বাগানে গেলাম? কী কী তথ্য পেলাম? বাগানের ডেথ রেজিস্টারের কপি ওঁর সঙ্গে শেয়ার করতে পারি কি না? আমি ফিরলাম এক প্যারা কোট নিয়ে কিন্তু ওঁর নোট বই ভর্তি আমার কোটে!

পশ্চিমবঙ্গে টাটারা গাড়ি বানাবে। আমি খবরটা করলাম। এস এ আহমেদ তখন বুদ্ধবাবুর দফতরে প্রধান সচিব। সকালেই ফোন, “কোথায় পেলে খবরটা?” কিন্তু নিরুপমবাবু কোনও প্রশ্ন করেননি। অনেক পরে বলেছিলেন, “আমার কোট তো চাননি। ভেবেছিলেন বারণ করব?” সেই ভয়টা যে ছিল স্বীকার করে নিয়েছিলাম। কিন্তু গদিতে থাকাকালীন কোনওদিন এই প্রশ্ন তোলেননি নিরুপমবাবু।

২০১০ সাল নাগাদ ওঁরা বোধহয় বুঝে গিয়েছিলেন যে আর ফিরবেন না। বিমর্ষ থাকতেন। এক প্রবাসী বাঙালিকে প্রচুর জমি দিয়েছিলেন শিল্প গড়ার জন্য। যিনি গঙ্গার ওপারে বিরাট আবাসন আর মোটরসাইকেল কারখানা প্রকল্প উদ্বোধনও করিয়েছিলেন বুদ্ধবাবুকে দিয়ে ২০০৬ সালের ভোটের আগে। আবাসন অর্ধসমাপ্ত আর সেই মোটর সাইকেল প্রকল্প প্রতিশ্রুতির অন্ধকারেই থেকে যায় সেই বিনিয়োগকারীর প্রতিশ্রুত বাকি সব প্রকল্পের মতোই। আমি খোঁচাতাম প্রকল্পগুলো নিয়ে, উনি স্মিত হেসে এড়িয়ে যেতেন। ২০১০ সালে শিল্প দফতর তখন ক্যামাক স্ট্রিটে উঠে গিয়েছে। ছুঁচো আর রাজনৈতিক আন্দোলনে ঘিরে থাকা রাইটার্স বা তার পরিবেশ, বিনিয়োগ বৈঠকে উপযুক্ত জায়গা নয় এই বোধের জায়গা থেকেই। একদিন হঠাৎ আলোচনার মাঝে বলে উঠলেন, “আমরা আসলে ওঁর সম্পর্কে ঠিক জানতাম না। আমাদের একটা বড় ভুল ওঁকে জমি দেওয়া।” বুঝলাম কার কথা বলছেন।

তখন টিসিজিকে হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসে সরকারের শেয়ার বিক্রি নিয়ে মামলা চলছে। সংবাদের শিরোনামে সিঙ্গুর আর হলদিয়া জায়গা দখলের দৌড়ে পাল্লা দিচ্ছে। ওই একই দিনে তাঁর স্বীকারোক্তি, “শেয়ারটা ওঁদের দিয়ে দিতে আমাদের কোনও আপত্তি নেই, কিন্তু ভাবুন তো দশ টাকার নিচে শেয়ার পিছু দামে বিক্রি করলে বিরোধীরা আমাদের ছাড়বে?”

ওই দামে শেয়ার বিক্রি করলে নতুন কী হত জানি না, কারণ সিঙ্গুর ততদিনে বামফ্রন্টের পায়ের তলার জমি কেড়ে নিয়েছে। শিল্প ভাবনায় যে উনি পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে নয়, এসেছিলেন নতুন বিনিয়োগের আবহ তৈরিতে হাত মেলাতে, ততদিনে তা কিন্তু সংশয়াতীত।

উনি মন্ত্রী থাকাকালীন কোনও দিন ওঁর বাড়ি যাইনি। সল্টলেকের বাড়িতে প্রথম যাই নিরুপমবাবুরা হেরে যাওয়ার পরে। ওঁর অফিসে গেলে, ওঁর লেখা একটা বই দিয়ে বলতেন, “জানাবেন।” গেলাম সঙ্গে অর্থনীতিবিদ কল্যাণ সান্যালের লেখা ‘রিথিঙ্কিং ক্যাপিটালিস্ট ডেভেলপমেন্ট’ নিয়ে। উনি তখন অসুস্থ। নিরুপমবাবু, তাঁর স্ত্রী আর আমি। রাজনীতি বাদ দিয়ে সাধারণ কথোপকথন। বিষণ্ণতা কাটাতে আমি তুললাম ওঁর সম্পর্কে চালু গল্পটা। কথিত আছে অনিল বিশ্বাস নাকি বলেছিলেন, “আমাদের নিরুপম সেন থাকতে অমর্ত্য সেনের কি প্রয়োজন।” শুনেই তাঁর উচ্চকিত হাসি। আমার সঙ্গে ওটাই ওঁর শেষ কথা।

লেখক প্রাক্তন সাংবাদিক ও বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তি উদ্যোগপতি

আরও পড়ুন: 

জ্যোতিবাবুই ক্যাবিনেটে নিতে চেয়েছিলেন, যাননি নিরুপম, পার্টির কথায় চাকরি ছেড়েছিলেন হাসতে হাসতে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More