বুধবার, মার্চ ২০

আচরেকর স্যারের স্কুটারে ওঠা মানেই ট্যালেন্ট আছে, শচীনও উঠত

জয়দীপ পাল

আমাকে ঠাস করে একটা চড় মেরেছিলেন স্যার। তারপর চিৎকার করে মারাঠিতে বলেছিলেন, ‘আমাকে একবার বলতে পারলি না? তোর দায়িত্ব তো আমিই নিতাম।’

সারদাশ্রম স্কুলের কোচ ছিলেন রমাকান্ত আচরেকর স্যার। বেঙ্গল ক্লাব শিবাজি পার্কে সেই সময় সেই স্কুলের নেট প্র্যাকটিস চলত। আমার বাবা জগদীশচন্দ্র পাল ছিলেন বেঙ্গল ক্লাবের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। বাবাই নিয়ে গিয়েছিলেন স্যারের কাছে। ‘একটু দেখবেন, আমার ছেলেটা ক্রিকেট খেলতে পারবে কিনা?’

আমার তখন এগারো বছর বয়স। হাফ প্যান্ট পরি। সেইভাবেই নেটে ব্যাট করেছিলাম । কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার খেলা দেখলেন স্যার। তারপর বাবাকে বললেন, ওকে এখনই সারদাশ্রম স্কুলের ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি করে দিন।

সারদাশ্রমে তখন দুটো মিডিয়াম – ইংলিশ আর মারাঠি। হয়তো আমি বাঙালি বলেই স্যার ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি হতে বলেছিলেন।

আমি নেটে প্রথম দিন গিয়ে স্যারকে বললাম, ‘গুড মর্নিং স্যার।’ স্যার আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলেছিলেন, ‘গুড মর্নিং নয়। নমস্তে বলবে।’ কেন বলেছিলেন আমি বুঝতে পারিনি। সেই সময় ওঁর ছাত্রদের বেশিরভাগই ছিল মারাঠি মিডিয়াম থেকে। এখন ভাবলে মনে হয়, তাদের সঙ্গে সহজে মিশে যেতে পারব ভেবেই গুড মর্নিং না বলে নমস্তে বলতে বলেছিলেন।

স্যার খুব কড়া ছিলেন। আবার ঠিক ততটাই ভালোবাসতেন। ওঁর একটা ল্যামব্রেটা স্কুটার ছিল। সেই স্কুটারে ক্রিকেট কিট নিয়ে ঘুরতেন স্যার। কাউকে কাউকে পেছনে বসতেও দিতেন। তবে সবাইকে নয়। যারা ভালো খেলত, শুধু তাদের।

সেই নিয়ে আমাদের মধ্যে কী রেষারেষি। কে উঠতে পারবে স্যারের স্কুটারে। স্যারের স্কুটারে ওঠা মানেই তার ট্যালেন্ট আছে।

ক’দিনের মধ্যেই স্কুলের টিমে চান্স পেয়ে গেলাম আমি। উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান। সেই টিমে আমিই সব থেকে ছোট। সবাই বলত বেবি। তার ওপর বাঙালি। অনেকেই ক্ষেপাত আমাকে। পেছনে লাগত। আমিও রেগে যেতাম।

স্যার, ওঁর দুই মেয়ে বিশাখাদিদি আর কল্পনাদিদিকে বলেছিলেন আমার খেয়াল রাখার জন্য। যাতে কেউ আমার পেছনে না লাগে।

সেই সময় আমাদের ক্যাপ্টেন ছিল নরেশ চুরি। সেই সময়েই ও ভারতীয় স্কুল দলে চান্স পেয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজে খেলতে গিয়েছিল। নরেশ পরে রেলওয়েজের হয়ে বহুদিন রঞ্জি খেলেছে। ১৯৭৯ সালে, নরেশের নেতৃত্বে সারদাশ্রম স্কুল দল মুম্বইয়ের প্রেস্টিজিয়াস গিলস শিল্ড জেতে। আমি ছিলাম সেই দলের কনিষ্ঠতম সদস্য।

স্যারের বোধহয় মনে হয়েছিল ব্যাটিংটা আমার হবে। আমি নেটে খেলার সময় পঁচিশ পয়সার কয়েন রেখে দিতেন স্যার। বোলারদের মধ্যে যারা আমায় আউট করতে পারবে, তারা পাবে ওই পঁচিশ পয়সা। সেই আমলে স্কুলের ছাত্রদের কাছে পঁচিশ পয়সা অনেক। সবাই নাগাড়ে চেষ্টা করে যেত আমায় আউট করার জন্য।

শুধু আমার জন্য নয়, যাদেরই ব্যাটিং প্রতিভা আছে বলে স্যার মনে করতেন, তাদের সবার জন্যই ছিল এই একই ব্যবস্থা।

আমার থেকে বেশ কিছুটা ছোট, আমারই এক বন্ধুর ভাইয়ের জন্যও সেই একই ব্যবস্থা ছিল। সেও পড়ত আমাদের সারদাশ্রম স্কুলেই। খেলত আমাদের ওই শিবাজি পার্কেই। তবে সে আমাদের সবাইকে ছাড়িয়ে অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। গোটা পৃথিবী জানে তার নাম। শচীন রমেশ তেন্ডুলকর। হ্যাঁ, স্যার তাকেও স্কুটারে উঠতে দিতেন।

ওই একই ব্যবস্থা ছিল তারই বন্ধু অসম্ভব প্রতিভাবান বিনোদ কাম্বলির জন্যও।

বাবার স্ট্রোক হল। একদম প্যারালিসিস। স্যার বাবাকে বললেন, আমাকে ওঁর বাড়িতে রাখবেন। বাড়িতে লোক বলতে শুধু আমি আর দিদি। মা মারা গেছেন ছোটবেলাতেই। স্যারের বাড়িতে আমার থাকা হল না।

স্যার প্রতি সপ্তাহে একদিন ওই ল্যামব্রেটা স্কুটার চালিয়ে আমাদের বাড়িতে আসতেন। খোঁজ নিতেন বাবা কেমন আছেন। আমার ক্রিকেট খেলা যেন কিছুতেই বন্ধ না হয়। আমি যেন কিছুতেই অন্য স্কুলে ভর্তি না হই।

শেষ অবধি তাই হল। আমার গার্জেন তখন আর বাবা নন। আমার পিসিমা। তিনি আমাকে ভর্তি করলেন নতুন স্কুলে। ক্রিকেট বন্ধ হয়ে গেল আমার।

লজ্জায়, ভয়ে স্যারকে সে কথা আর বলিনি। চুপচাপ পালিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু স্যার এলেন একদিন বাড়িতে। নতুন স্কুলে খোঁজ নিয়ে, আমাদের নতুন ঠিকানা জোগাড় করেছেন। বাড়িতে ঢুকেই এক চড়। তারপর সেই কথা। ‘আমাকে একবার বলতে পারলি না? তোর দায়িত্ব তো আমিই নিতাম।’

আর স্যার কথা বলেননি আমার সঙ্গে। কিন্তু বন্ধুরা বলত, আমার সব খবর ওঁর জানা। ভালো চাকরি পেয়েছি শুনেও নাকি খুব খুশি হয়েছিলেন।

ক্রিকেট আমি আবার খেলতে গিয়েছিলাম। মুম্বাইয়ের সব কটা বড় দলেই খেলেছি। কিন্তু স্যারের সেই কথাটা আজও কানে বাজে। হয়তো সেদিন স্যারের কথা শুনলে ক্রিকেট খেলেই আরও বেশি দূর যেতে পারতাম।

কত ছাত্রর মাথাতেই তো ছাতা ধরেছেন স্যার। কাউকে আশ্রয় দিয়েছেন। কাউকে জামা কিনে দিয়েছেন। কাউকে আবার দু’বেলা খাবারের ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন।

শুধু বলতেন, প্র্যাকটিস করো। আরও প্র্যাকটিস করো। যত প্র্যাকটিস করবে তত ভালো খেলবে।

স্যার চলে গেলেন। অমন মানুষ এক হাজার বছরে একবারই আসেন।

যেখানেই থাকুন খুব ভালো থাকুন স্যার। ‘নমস্কার করতো।’

ইতি -আপনার কথা না শোনা এক অধম স্টুডেন্ট।

(জয়দীপ পাল মুম্বইয়ের প্রাক্তন ক্রিকেটার। বর্তমানে একটি ব্যাঙ্কে উচ্চপদে কর্মরত) 

Shares

Comments are closed.