ছিঁড়ে গেল ভাগলপুরের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের শেষ সুতোটুকুও

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

অনির্বাণ বসু

চলে গেলেন সাহিত্যিক দিব্যেন্দু পালিত। মাত্র ষোলো বছর বয়সে প্রথম ছাপা গল্পের নাম ছিল ‘ছন্দপতন’। অসুস্থ ছিলেনই, আজ হঠাৎ ছন্দপতনের নীরবতা। ভাগলপুরের জাতক দিব্যেন্দু পালিত কবিতা লিখলেও গল্প-উপন্যাসই ছিল তাঁর নিজস্ব ক্ষেত্র। আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয় বিভাগে প্রকাশিত গল্প দিয়ে শুরু করে, চল্লিশের উপর উপন্যাস এবং দু’শোরও বেশি গল্প লিখেছেন তিনি। সন্তোষকুমার ঘোষ, রমাপদ চৌধুরীদের মতোই মানুষের জীবনের সাধারণ গল্প ছিল তাঁর ট্রেডমার্ক।

মধ্যবিত্ত মানসিকতার নিপুণ রূপকার তিনি কখনওই সময়-সমাজকে ছেড়ে আপাত অবাস্তবতায় ভেসে যেতে চাননি। ‘সহযোদ্ধা’ উপন্যাসটি নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছিলেন: “ঘটনা ঘটে যাওয়ার সাত-আট বছর পরে এই উপন্যাস না লিখে, ঘটনা ঘটার সময়েই কেন লেখা হল না? আমার উত্তর একটাই, তা হল ঘটনা থেকে উদ্ভূত ‘তাৎক্ষণিক’ চিন্তার ভিতরে এমন কিছু আবেগ থাকে, যা পরে বুদ্ধি ও যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যায়। সে জন্য দরকার তাৎক্ষণিক আবেগগুলিকে শুকিয়ে যাওয়ার সময় দেওয়া এবং লেখক হিসেবে নিরপেক্ষ হওয়ার সময় নেওয়া। আমি সেই সময়টুকু নিয়েছি। তা না করে যদি তখনই এ উপন্যাস লিখতাম তা হলে ‘সহযোদ্ধা’ যা হয়েছে তা না হয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে লেখা ভাবাবেগ সর্বস্ব রোমান্টিক উপন্যাসেই পরিণত হত এবং অর্থহীন হয়ে পড়ত।”

উপন্যাসটি ছিল গত শতকের উত্তাল সত্তরের প্রায়-বাস্তব আলেখ্য। অনেকেই মনে করেন, সরোজ দত্তের হত্যা-মুহূর্ত দেখে ফেলেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক দিকপাল নায়ক, যে-কারণে তাঁকে কলকাতা ছেড়ে তৎকালীন বম্বেতে পাড়ি জমাতে হয়। এই বীজটুকুই ধারণ করে অনালোচিত এক রাজনৈতিক হত্যার ইতিহাসকে অণুপুঙ্খতায় বুনে দিয়েছিলেন তিনি।

‘সহযোদ্ধা’ ছাড়াও ‘অনুভব’, ‘অন্তর্ধান’, ‘আমরা’, ‘উড়োচিঠি’, ‘ঢেউ’– বহু গুরুত্বপূর্ণ কাহিনি রচিত হয়েছে তাঁর কলমে, যার স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার (১৯৮৪), বঙ্কিম পুরস্কার (১৯৯০) এবং সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৯৮)।

তাঁর বহু কাহিনিই চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত-র ‘গৃহযুদ্ধ’ তাঁর ‘মাছ’ গল্প অবলম্বনে নির্মিত। তপন সিংহ তাঁর ‘অন্তর্ধান’ উপন্যাসটিকে চলচ্চিত্ররূপ দিয়েছিলেন। ২০০৫ সালে তাঁর ‘মূকাভিনয়’ গল্পটি নিয়ে শ্যামানন্দ জালান তৈরি করেছিলেন ‘ঈশ্বর মাইম কোম্পানি’ নামের সিনেমা, যার চিত্রনাট্য লিখেছিলেন বিজয় তেন্ডুলকর।

স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ভাগলপুর বহু ভাবে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। ১৯৩৯-এর ৫ মার্চ ভাগলপুরে জন্মানো দিব্যেন্দু পালিতের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে সেই সমৃদ্ধির শেষ সুতোটুকুও ছিঁড়ে গেল কোথাও। নাগরিক জীবনের গল্পকার নতুন বছরের শুরুতে বিসর্জনের নগরকীর্তন শুনিয়ে গেলেন তাঁর পাঠকদের।

(অনির্বাণ বসু  এই সময়ের একজন গল্পকার ও বাংলা সাহিত্যের গবেষক)

আরও পড়ুন:

বকাঝকা করার আর কেউ রইল না

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More