বকাঝকা করার আর কেউ রইল না

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

অংশুমান কর

দিব্যেন্দু পালিতের প্রয়াণে, আক্ষরিক অর্থেই, আমার পিতৃবিয়োগ হল। বাবার মৃত্যুর শোক আমি আজও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। দিব্যেন্দুদার প্রয়াণের ধাক্কা সামলানোও আমার জন্য কঠিন, খুবই কঠিন।

দিব্যেন্দুদা এতখানিই ঘিরে ছিলেন আমাকে, আমার পরিবারকে, যে তাঁর প্রয়াণের পরে তাঁর সাহিত্যকীর্তির মূল্যায়ণে যেতে মন সাড়া দিচ্ছে না। মনে পড়ছে কত কত ঘটনা! ঢেউয়ের পর ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে স্মৃতি। অসুস্থ ছিলেন দীর্ঘদিন। কিছু দিন আগে ফোনেও এক দিন আমায় বললেন, “আমি আর বেশি দিন নেই।” কোথাও কি প্রস্তুত ছিলাম না এই প্রয়াণের জন্য? ছিলাম তো। তবু সত্যি সত্যিই যখন তাঁর আসনটি ছেড়ে গেলেন দিব্যেন্দুদা, বড় বেদনার মতো বেজে উঠছে সেই শূন্যতা। মেনে নিতে খুবই কষ্ট হচ্ছে।

অথচ ওঁর সঙ্গে পরিচয়ের প্রথম দিকে উনি আমার এতখানি ঘনিষ্ঠ ছিলেন না। বরং একটু ভয়ই পেতাম ওঁকে। আসলে বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার বেড়ে উঠে কলকাতার সাহিত্য জগতের রথী-মহারথীদের মুখোমুখি যে কোনও দিন হতে পারব, এ কথা স্বপ্নেও ভাবা ছিল আমার কাছে এক স্পর্ধা। তাই কৃত্তিবাসের নানা অনুষ্ঠানে আমি একটু জড়োসড়ো হয়েই বসে থাকতাম। সমীহ করতাম সকলকেই, কিন্তু দিব্যেন্দুদাকে একটু যেন ভয়ই পেতাম। তার কারণ, উনি খুবই কম কথা বলতেন। একেবারে মাপা। আমার মনে পড়ছে, পরিচয়ের পরে দীর্ঘদিন আমি ওঁর সঙ্গে কোনও কথাই বলিনি। ঘনিষ্ঠতা বাড়তে শুরু করল সাহিত্য অকাদেমির সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষ্যে ভুবনেশ্বরে হওয়া একটি বিশাল অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে। তখন দিব্যেন্দুদা সাহিত্য অকাদেমির বাংলা বোর্ডের কনভেনর।

কলকাতার একটি অনুষ্ঠানের পরে হঠাৎ আমায় ডেকে এক দিন জানালেন যে, ওই অনুষ্ঠানে তরুণ বাঙালি কবি হিসেবে মন্দাক্রান্তা, বিনায়ক আর আমি অংশ নেব। চিঠি আসবে ক’দিনের মধ্যেই, আমি যেন আমার বাংলা কবিতার ভালো ইংরাজি অনুবাদ প্রস্তুত রাখি।

মনে আছে, প্রায় মাঝরাত্রে ভুবনেশ্বর স্টেশনে নেমেছিলাম বিনায়ক, আমি, দিব্যেন্দুদা আর কল্যাণী বউদি, যাঁকে পরে দিব্যেন্দুদার থেকে আলাদা করে আমি ভাবতেই পারতাম না। স্টেশনে আসা সাহিত্য অকাদেমির কর্মীদের থেকেই জানতে পেরেছিলাম যে, বিনায়কদের হোটেল আলাদা। আমাদের সঙ্গে এক হোটেলে রাখা হয়নি। বিনায়ক যাতে আমাদের হোটেলে আসতে পারে, সে জন্য কী তৎপরই না হয়ে উঠেছিলেন দিব্যেন্দুদা। শেষমেশ বিনায়ককে নিয়েও এসেছিলেন আমাদের হোটেলে। ওই সাহিত্য সম্মেলন চলাকালীনই আমাদের ইচ্ছে হয়েছিল দুয়েকটা জায়গা একটু ঘুরে দেখার। এতই ভয় পেতাম দিব্যেন্দুদাকে তখন, যে সে কথা বলতেই পারছিলাম না। শরণাপন্ন হয়েছিলাম কল্যাণী বউদির। তিনিই ত্রাতা হয়ে আমাদের বেড়ানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। পরেও, অনেক বার এভাবে বউদি আমাকে দিব্যেন্দুদার বকাঝকা থেকে বাঁচিয়েছেন।

ওই ভুবনেশ্বরের অনুষ্ঠানটিতেই আমি অবশ্য প্রথম দিব্যেন্দুদার বকুনি খাই। আমার পড়া ইংরাজি অনুবাদগুলি বেশ সমাদৃত হয়েছিল শ্রোতাদের মধ্যে। একটি সর্বভারতীয় প্ল্যাটফর্মে হাততালি কুড়িয়ে যখন গর্বে ইঞ্চিখানেক ফুলে উঠেছিল বুক, তখন তাতে ছোট্ট একটা জরুরি আলপিন ফুটিয়ে দিয়েছিলেন দিব্যেন্দুদা। বিভিন্ন ভাষার কবিরা যখন ডেকে ডেকে আলাপ করছেন আমার সঙ্গে, তখন তিনি আঙুলের ইশারায় আমাকে ডেকে বলেছিলেন, “কে করেছে তোমার কবিতার অনুবাদ, তুমি?”

তখন নিজের কবিতা আমি নিজে অনুবাদ করতাম না। যিনি করেছিলেন তাঁর নাম বললাম। শুনে দিব্যেন্দুদা বলেছিলেন, “কিন্তু তুমি তো ইংরেজি পড়াও। তোমার আরও যত্ন করে অনুবাদগুলো পরীক্ষা করা উচিত ছিল। অমিয় (দেব) জানাল যে, একটা শব্দ ভুল অনুদিত হয়েছে। আমারও তা-ই মনে হয়। যে কাজ করবে তাকে সিরিয়াসলি নেবে, নইলে হাততালি পেলেও তার মূল্য থাকে না।” ওই কথা ক’টি বলার সঙ্গে সঙ্গেই দিব্যেন্দু পালিত আর নিছক এক জন অগ্রজ কবি বা লেখক ছিলেন না আমার কাছে, হয়ে উঠেছিলেন পিতৃতুল্য অভিভাবক।

দিব্যেন্দু পালিত ও আনন্দী কর (তিন্নি) 

খাওয়াতে অসম্ভব ভালোবাসতেন দিব্যেন্দুদা আর কল্যাণী বউদি। মাঝে মাঝেই কেবল ভাল-মন্দ নানা কিছু খাওয়াবেন বলে ডেকে পাঠাতেন আমাদের। আমাকে, সোমাকে আর তিন্নিকে। মনে হয়, আস্তে আস্তে আমার চেয়েও বেশি ভালোবাসতে শুরু করেছিলেন ওঁদের। কখনও কখনও ডেকে নিতেন শ্রীজাত আর দূর্বাকেও। নেমন্তন্ন করে নানা রকমের মাছ, মাংসের পদ খাওয়াতেন। শাক-সবজি প্রায় থাকতই না। নিজেরাও যে শাক সবজি খেতে খুব একটা পছন্দ করতেন তা নয়। মাঝে মাঝেই এটা নিয়ে সোমা অনুযোগ করত, কিন্তু ওঁরা শুনতেন না।

দিব্যেন্দুদার ভিতরে আসলে একটা মন ছিল, যা ছিল খুবই স্বাধীন। সে মন কারও কথা শোনার বান্দা ছিল না। নিজের বিচার-বুদ্ধি-বিবেচনায় যা তিনি মনে করতেন ঠিক, তা-ই করতেন। কারও অনুরোধ-উপরোধ ওঁকে টলাতে পারত না। ওঁর ‘না’ মানে ছিল ‘না’-ই। শান্ত ও দৃঢ় সেই ‘না’ থেকে অবশ্য স্বাভাবিক ভদ্রতার মিঠে সুবাস কখনও অন্তর্হিত হতো না। মনে পড়ছে, একটি ঘটনার কথা। একটি খবরের কাগজের জন্য কিছু সাংবাদিক নিয়োগ করা হবে। দিব্যেন্দুদা নিজেই আমায় ফোন করে জানালেন সে কথা। আমিও কারও নাম চাইলেই রেকমেন্ড করতে পারি, দিলেন এই স্বাধীনতাও। বললাম একটি নাম। শুনে তৎক্ষণাৎ বললেন, “যে কাজের জন্য লোক দরকার, সে কাজ ওকে দিয়ে হবে না।” বেশ কয়েক বার ফোন করেও সেই ‘না’-কে আমি ‘হ্যাঁ’ করাতে পারিনি।

দিব্যেন্দু পালিত, কল্যাণী পালিত, সোমা ব্যানার্জী কর ও আনন্দী কর (তিন্নি)

কল্যাণী বৌদির প্রতি ওঁর প্রেম ও শ্রদ্ধাকে যতই দেখেছি অবাক হয়েছি ততই। দু’জনের ছিল অদ্ভুত এক আন্ডারস্ট্যান্ডিং। ওঁদের পরিবারটিকে একত্রিত রাখার ক্ষেত্রে কমলদার ভূমিকাও উল্লেখ্য। প্রায় দিব্যেন্দুদার সমবয়সি কমলদা কী যত্নে যে সেবা করেছেন দিব্যেন্দুদা, কল্যাণী বৌদির তা তো নিজের চোখে দেখেছি আমি। কমলদা কোনও মতেই গৃহপরিচারক ছিলেন না। ছিলেন দিব্যেন্দুদার বড় দাদা বা ছোট ভাই। কল্যাণী বৌদির বাইরে ওই একটি মানুষকেই আমি দিব্যেন্দুদাকে শাসন করতে দেখেছি।

কল্যাণী বৌদির প্রয়াণটিও কিছুতেই যেন মেনে নিতে পারছিলেন না দিব্যেন্দুদা। প্রথমে কল্যাণী বউদি যে আর নেই, এই সত্যটিই অনুধাবন করতে পারেননি দিব্যেন্দুদা। পরে যখন এই শূন্যতা ধরা দিয়েছিল তাঁর বোধে, তখন বারবার বলতেন নিজেরও সময় কমে আসার কথা। খারাপ লাগছে দিব্যেন্দুদার পুত্র অমিতেন্দুদার কথা ভেবে। অল্প সময়ের ব্যবধানে মা-বাবা দু’জনকেই হারালেন অমিতেন্দুদা। অসুস্থ মা-বাবার চিকিৎসা ও শুশ্রূষার জন্য যে আন্তরিক সেবা ও আয়োজন অমিতেন্দুদা করেছেন, আমি তার অনেকখানিরই সাক্ষী। ওঁর নিষ্ঠাকে পরাজিত হতে দেখে তাই খারাপ লাগছে খুবই। দিব্যেন্দুদার কাজকে একটি যথার্থ উপায়ে সংরক্ষণ করার জন্য বেশ কিছু পরিকল্পনা আছে অমিতেন্দুদার। সে পরিকল্পনার রূপায়ণে আমরা যদি সক্রিয় ভাবে অংশ নিই, তা হলে তা ওঁকে নিয়ে এই রকম দু’কলম লেখার থেকে অনেক জরুরি কাজ হবে বলে আমার বিশ্বাস। এ আমাদের লজ্জা যে, পশ্চিমবঙ্গে আমরা এখনও লেখকদের কর্ম ও জীবনের উজ্জ্বল অর্জনগুলির যথাযথ সংরক্ষণে মনোযোগী নই।

শেষ করব দিব্যেন্দুদার একটি অভিমানের কথা বলে। শেষ ক’বছর কবি-লেখকদের মধ্যে গুটিকতক মানুষ ছাড়া তেমন কেউ একটা যেতেন না দিব্যেন্দুদার বাড়িতে। কখনও কখনও এই বিষয়টি নিয়ে ওকে মৃদু অভিমানী হয়ে উঠতে দেখতাম। এক মাসের ওপর আমি ওঁকে ফোন না করলে, নিজেই ফোন করতেন। বলতেন, ‘অনেক দিন তো খবর পাইনি তোমার, সোমার, তিন্নির। ভালো আছো?’ শুনে লজ্জা পেতাম। মনে হতো, যাঁর খোঁজ আমার রাখার কথা, তিনিই খোঁজ নিচ্ছেন আমার।

শেষের দু’-এক বছর সকলের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে এত তীব্র হয়ে উঠেছিল যে, নিষেধ করা সত্ত্বেও নানা অনুষ্ঠানে গিয়ে হাজির হতেন অশক্ত শরীরে। গত বছরই যেমন ‘কৃত্তিবাস উৎসবে’ দিব্যেন্দুদার শরীরের কথা ভেবে আমি কিছুতেই চাইনি ওঁর অংশগ্রহণ। কিন্তু উনি বেঁকে বসলেন। জানালেন যে, উনি যাবেনই। ওঁর জেদের কাছে হার স্বীকার করলাম। সেই উৎসবে, অশক্ত শরীরে এসে, জড়ানো কণ্ঠে তিনি যখন কল্যাণী বউদিকে নিয়ে লেখা একটি কবিতা পড়ার চেষ্টা করছিলেন, আমাদের অনেকেরই চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিল। ওই অশ্রুর চেয়ে কখনও কখনও, অনেক দামি যে একটি ফোনকল, একটি কুশল জিজ্ঞাসা– দিব্যেন্দু পালিতের প্রয়াণের পর এই সত্য আমরা যেন বিস্মৃত না হই।

(অংশুমান কর এই সময়ের একজন বিশিষ্ট কবি)

আরও পড়ুন:

দিব্যেন্দু পালিত – সেই মুখ -মুখগুলি

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More