খেয়াল রাখতে হবে আমরা যেন করোনাভাইরাসের হোস্ট না হয়ে উঠি

এক জন আক্রান্ত লোক গড়ে দু’জনের মধ্যে অসুখটি ছড়াচ্ছে। সেই ভাবে দুই থেকে চার, চার থেকে আট, ষোলো, বত্তিরিশ।

অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়

করোনাভাইরাস নিয়ে অজস্র পোস্ট ও মেসেজ দেখছি প্রতিদিন। তার খুব কম জায়গা থেকেই প্রয়োজনীয় ও সঠিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তার বাইরে মানুষ অকারণে আতঙ্কগ্রস্ত হচ্ছে ও ভুল খবর ভাইরাল হচ্ছে। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে মনে হল, কিছু প্রাথমিক বার্তা সঠিক ভাবে প্রকাশ করার দায়িত্ব নেওয়া উচিত।

সবার আগে যেটা জানানো প্রয়োজন, শুধু শুধু ভয় পাবেন না। সাধারণ সর্দি কাশি হয় যে ইন্ফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস থেকে, করোনাভাইরাস সেই গোত্রেরই। যে কোনও মানুষ, যাঁর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিক, তাঁর ক্ষেত্রে জ্বর, সর্দি-কাশি যেমন হয়, এই রোগের প্রভাবও তেমনই। ইন্ফ্লুয়েঞ্জা ও করোনা—দুক্ষেত্রেই মৃত্যুর হার এক শতাংশেরও (১%) কম।

তবে এই করোনা নিয়ে এত বাড়াবাড়ি কেন! কারণ এটি নতুন এসেছে। করোনাভাইরাসের রোগ সৃষ্টি করার নিরিখে এটি সপ্তম সংযোজন। সেই সংযোজনের পরে সবেমাত্র দুদিন হল চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই রোগের নামকরণ হয়েছে, COVID 19 (করোনা ভাইরাস ডিজিজ ১৯)।

১৯৬০ এর দশকে করোনাভাইরাস এর চারটি স্ট্রেন (টাইপ) আবিষ্কৃত হয়। তার পরে ২০০২ -২০০৩ সালে আসে সার্স (SARS: সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম), পঞ্চম স্ট্রেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী মারা যান ৭৭৪ জন মানুষ। তার পরে ষষ্ঠ স্ট্রেন (টাইপ) আসে মার্স (MERS: মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। মারা যান ৮৫৮ জন মানুষ। মৃত্যুর হার অনুযায়ী সার্স ছিল ৮%-১০ % এবং মার্স ৩৬%-৩৮ %। সেই তুলনায় সপ্তম নভেল টাইপটির মৃত্যুর হার ১%। তাই আশঙ্কামুক্ত হয়ে থাকুন, সন্ত্রস্ত হবেন না। তবে সতর্কতা প্রয়োজন।

বিশেষ সাবধানতা এই কারণেই প্রয়োজন, যে এখনও অবধি এই ভাইরাসের আক্রমণে মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১৩০০। এবং তা বেড়েই চলেছে। তাই প্রতিরোধপন্থার সাথে ওয়াকিবহাল হতে হবে সবাইকে। তাছাড়াও জানা প্রয়োজন, অসুখটি কীভাবে ছড়াচ্ছে। এক জন আক্রান্ত লোক গড়ে দুজনের মধ্যে অসুখটি ছড়াচ্ছে। সেই ভাবে দুই থেকে চার, চার থেকে আট, ষোলো, বত্তিরিশ। কিন্তু এ ছাড়াও আছে কিছু ব্যতিক্রমী যাদের বলে সুপার স্প্রেডর্স। এরা একসাথে ২০ থেকে ৫০ জনকে একবারে আক্রান্ত করে তুলছে। তাই যখনই কেউ আক্রান্ত হবে তাকে আলাদা করে রাখাটা সবচেয়ে জরুরি ধাপ।

এখনও অবধি পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ভাইরাসটি মূলত স্পর্শ ও সূক্ষ্ম জলকণা (হাঁচি, কাশি, এমনকি কথা বলা অবধি) বিস্তারের মধ্যে দিয়ে ঘটে। বায়বীয় মাধ্যমেও বিস্তারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই রোগীকে পৃথক করে রেখে ও রোগীর সাথে দূরত্ব বজায় রেখে, উপযুক্ত মাস্ক পরে চিকিৎসায় সহায়তা করা উচিত। যে পরিবেশে কোনও রোগী নেই, সেখানে অযথা মাস্ক পড়া আতঙ্ক সৃষ্টির নামান্তর।

ভারতবর্ষ এমন একটি দেশ, যেখানে স্বাস্থ্য সচেতনতা ও পরিকাঠামো দুটোই কহতব্য নয়, সেখানে এই রোগ প্রবাহিত হলে মহামারী হয়ে উঠতে সময় লাগবে না। খাবার বা মুখে হাত দেওয়ার আগে সর্বদা সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যেস সবচেয়ে জরুরি। হাঁচি, কাশি আড়ালে গিয়ে করার চেষ্টা করতে হবে। গায়ে জ্বর থাকলে ছুটিতে থাকুন। অন্যের সাথে কথা দেড় মিটার দূর থেকে বলা ভাল। ছোঁয়ার বদলে দূর থেকে নমস্কার, কদিনের জন্য। তার পরে সুস্থতা ফিরে এলে কোনও বারণ নেই।

অন্য নভেল ভাইরাস এর মত এই স্ট্রেনটিও সরে যাবে আমাদের সমবেত চেষ্টায়। খেয়াল রাখতে হবে আমরা যেন ভাইরাসটির হোস্ট না হয়ে উঠি। ভাইরাসটি এখনও অবধি আমাদের বোকা বানিয়েছে ইউরোপে। আমেরিকাতেও পৌঁছে গেছে মানুষ হোস্টের মাধ্যমেই। আফ্রিকা থেকে খবর পাওয়া যায়নি নিশ্চিত ভাবে। এশিয়া তো সংকটের আবর্তে কারণ চিনেই এর উৎসস্থল।

একথা সবার জানা যে চিনের উহান প্রদেশের একটি বাজার থেকে এর প্রাদুর্ভাব। সেই বাজারে এই নতুন স্ট্রেনটি এল কী করে? এটাই কোটি কোটি টাকার প্রশ্ন। এই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে জৈব-রাসায়নিক অস্ত্র হিসেবে এর চর্চা বা এটি একটি ল্যাবে তৈরি ভাইরাস। সেই রোমহর্ষক সম্ভাবনার কাহিনিতে এটা বিশ্বাস করা যায় না যে চিন এটা নিজে তৈরি করে নিজের উপর প্রয়োগ করবে। তবে কি কোনও সাবোতাজ, অপপ্রয়োগ বা দুর্ঘটনা! কে জানে!

থাক, রহস্য গল্প রচনার জন্য এই নিবন্ধটি নয়। অ্যান্টিজেনিক মিউটেশন ঘটেছে এই আরএনএ ভাইরাসটির, তা নিশ্চিত। এবং কী করে এর মোকাবিলা করতে হবে, তা অধিক প্রাসঙ্গিক। ভাইরাসটি অ্যানিম্যাল সোর্স থেকে সংক্রামিত হয় মানুষের শরীরে—প্রধানত ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রে আশ্রয় নেয়। এই অ্যানিমাল সোর্স সম্বন্ধে সঠিক ভাবে জানা খুব জরুরি। বাদুড়, সাপ ও প্যাংগোলিন জাতীয় প্রাণী এর হোস্ট। কোনও ভাবেই পাখি বা পোল্ট্রি প্রাণী (মুরগি, হাঁস ইত্যাদি) এর সঙ্গে যুক্ত নয়। মুরগি খাওয়া বারণ করে এর প্রচার একটি সর্বৈব অপপ্রচার ও অবান্তর। ভারত সরকারের তরফে এর জন্য সার্কুলার চিঠিও জারি করা হয়েছে। গুজবে কান দেবেন না, ছড়াবেন না। ভুল হোয়াটস্যাপ প্রচারের দাপটে পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা খারাপ।

এটা জেনে রাখতে হবে, জীবন চক্রের জন্য প্রত্যেক ভাইরাস স্ট্রেইনের আলাদা আলাদা প্রাণী হোস্ট হিসেবে প্রয়োজন। যেমন মার্সের সময়ে উট ছিল হোস্ট, যার মাধ্যমে ব্যাধিটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছিল। এবার প্রবেশ করেছে বাদুড়, সাপ হয়ে হয়ে চিনারা কিনা খায় প্রাণীর শরীরে। আপনি-আমি এসব খাই না। তাই আমাদের শুধু সাবধানতা অবলম্বন করলেই হবে। আরও একটি বিশেষ সতর্কতা হল, ফলমূল খুব ভাল করে ধুয়ে খেতে হবে। পোকাধরা বা পচা-ধসা থাকলে বাদ দিন।

ভারতের কেরল ও আরও দু-একটি জায়গায় তিন-চার জনের মধ্যে এই ভাইরাসের প্রকোপ পড়েছে। তাদের শনাক্তও করা হয়েছে। বিজ্ঞানসম্মত ভাবে যা যা করণীয়, তাই করা হচ্ছে। নিজে সচেতন ও সুস্থ থাকুন এবং অন্যকেও রাখুন। করোনার ব্যাপারে যাচাই না করে কোনও তথ্য হোয়াটস্যাপে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহার করবেন না। প্রসঙ্গত, সোশ্যাল মিডিয়াতে কোনও ব্যাপারেই যাচাই না করে বিশ্বাস ও ফরোয়ার্ড করা COVID 19-এর মতোই পরিত্যাজ্য।

সকলের কুশল ও মঙ্গল কামনা করি।

(তথ্য সূত্র: ডক্টর তাপস রায়, বিভাগীয় প্রধান, ল্যাবরেটরি মেডিসিন, RTIICS)

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.