দোষ কারোরই নেই

৪২

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

এখন যা দিনকাল পড়েছে, সব কিছুই আপনা আপনি হয়ে যায়। কাউকে কিছু করতে হয় না। গত কয়েকদিনের মধ্যে আমরা জানতে পেরেছি, বাবরি মসজিদ নিজে থেকেই ভেঙে পড়েছিল, হাথরাসের দলিত তরুণীকে কেউ ধর্ষণ করেনি, কপিল মিশ্রও দিল্লির দাঙ্গা নিয়ে কিছু জানেন না। কেউ কিছু জানে না, কেউ কিছু করেনি, অথচ খারাপ ঘটনাগুলো নিজে থেকেই একের পর এক ঘটে চলেছে। খুবই চিন্তার বিষয়।

আপাতত হাথরাসের দলিত তরুণীর মৃত্যু ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আলোড়িত হচ্ছে দেশের বিবেক। হওয়ারই কথা। ঘটনাটা সাংঘাতিক। ১৪ সেপ্টেম্বর হাথরাসের এক গ্রামে ১৯ বছরের একটি দলিত কিশোরী গৃহপালিত পশুদের জন্য ঘাস কাটতে গিয়েছিল। স্থানীয় চার ব্যক্তি সন্দীপ, রামু, লবকুশ ও রবি মেয়েটির গলায় দোপাট্টা পেঁচিয়ে তাকে টেনে নিয়ে যায়। তার মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত লাগে। চারজন তাকে ধর্ষণ করে। তার জিভ কেটে নেয়। শরীরের নানা জায়গার হাড় ভেঙে যায়। পুরো শরীর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়।

মেয়েটির চিৎকার শুনে দৌড়ে যান তার মা। তার পরিবার চাঁদ পা থানায় অভিযোগ জানাতে যায়। পুলিশ প্রথমে অভিযোগ নেয়নি। উল্টে নির্যাতিতার পরিবারকে হেনস্থা করে। অভিযুক্তরা ছিল ঠাকুর সম্প্রদায়ের। দলিত পরিবারটির অভিযোগ, চার ধর্ষণকারী উচ্চবর্ণের হওয়ার জন্যই পুলিশ প্রথমে অভিযোগ নিতে চায়নি। ব্যাপারটা নিয়ে হইচই শুরু হওয়ার পরে পুলিশ অভিযোগ নেয় ২০ সেপ্টেম্বর।

২৯ সেপ্টেম্বর মেয়েটি হাসপাতালে মারা যায়। সেদিনই রাত দু’টোর সময় পুলিশ মৃতদেহটি তার পরিবারের থেকে কেড়ে নেয়। তারপর মাঠেই পেট্রল ঢেলে জ্বালিয়ে দেয়। মেয়েটির পরিবারের লোককে তখন কার্যত বাড়িতে বন্দি করে রাখা হয়েছিল।

এরপরে বিরোধী নেতারা হাথরাসে যেতে চেষ্টা করেন। পুলিশ বলে এখন কোভিডের জন্য বেশি লোককে যেতে দেওয়া যাবে না। এদিকে শোনা যাচ্ছে, নির্যাতিতার গ্রামের কাছেই উচ্চবর্ণেরা মহাপঞ্চায়েত বসিয়েছিল। অনেক লোক এসেছিল। বজরং দল, আরএসএস, কার্নি সেনার মতো সংগঠন নাকি ছিল তার পিছনে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সমর্থনে মিছিল পর্যন্ত বেরিয়েছে।

এই মুহূর্তে হাথরাসে একদল লোক অপরাধীদের সমর্থনে বুক ফুলিয়ে রাস্তায় মিছিল মিটিং করে চলেছে। কিন্তু ধর্ষিতার পরিবার গৃহবন্দি। তারা খুব ভয়ে ভয়ে আছে, যে কোনও সময় বাড়িতে হামলা হতে পারে।

কয়েক বছর আগে টমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন নামে এক সংগঠনের সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছিল, মেয়েদের পক্ষে ভারত সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশ। সেই সমীক্ষা নিয়ে অনেকে রাগ করেছিলেন। তাঁদের প্রশ্ন ছিল, আফগানিস্তান বা সিরিয়ার মতো দেশকে পিছনে ফেলে ভারত কীভাবে মেয়েদের পক্ষে সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠল?

সম্প্রতি ন্যাশনাল ক্রাইমস রেকর্ড ব্যুরো জানিয়েছে, ভারতে প্রতি ১৫ মিনিটে একজন নারী ধর্ষিতা হন। ওই ব্যুরো ভারত সরকারের একটি সংস্থা। তারা যখন একথা বলছে, তখন ধরে নিতে হবে, আমাদের দেশে মেয়েরা খুবই বিপদের মধ্যে আছে।

ভারতের সমাজ পুরুষতান্ত্রিক। এখানে ধর্ষণ কোনও নতুন অপরাধ নয়। আমাদের রাজ্যেও বানতলা, বিরাটি, কামদুনি, পার্ক স্ট্রিটের ঘটনা নিয়ে হইচই হয়েছিল। কিন্তু এখন একটা নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তা হল ধর্ষণকারীর হয়ে গলা ফাটানো।

সমাজে দুষ্ট প্রকৃতির লোকজন সবসময়ই থাকে। কিন্তু তাদের সাহস এত বাড়ল কী করে?

আসলে সরকার যেভাবে পুরো ঘটনাটাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে, তাতেই অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। যোগী আদিত্যনাথ হাথরাস নিয়ে প্রথমে কয়েকদিন চুপ করেছিলেন। তারপর বললেন, পুরোটাই ষড়যন্ত্র। তাঁর শাসনে উত্তরপ্রদেশে উন্নয়নের বন্যা বইছে। তাতে কিছু হিংসুটে লোকের চোখ টাটাচ্ছে। তারা ধর্ষণের অভিযোগ তুলে রাজ্যে বিশাল কর্মযজ্ঞ ভণ্ডুল করে দিতে চায়।

যোগী ওই কথা বলার পর পুলিশও ঝটপট কয়েকটা দেশদ্রোহের মামলা করে ফেলল। অভিযোগ, যারা মৃত তরুণীর জন্য ন্যায়বিচার দাবি করছে, তাদের মতলব ভাল নয়। তারা রাজ্যে সাম্প্রদায়িক ও জাতপাতের দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টায় আছে। বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগও উঠল। ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট ধর্ষণের প্রমাণ পেল না। যদিও কোনও কোনও ডাক্তার বলছেন, ঘটনার ১১ দিন পরে ফরেনসিক টেস্ট হয়েছিল। অতদিন পরে ধর্ষণের প্রমাণ লোপ পাওয়ারই কথা।

যতদূর মনে হয়, উত্তরপ্রদেশে শাসক দল আগামী দিনে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ নিয়ে আরও জোর হল্লা শুরু করবে। চেষ্টা করবে যাতে নির্যাতিতার কথা চাপা পড়ে যায়। পুলিশ, প্রশাসন, শাসক দল, সবাই মিলে প্রমাণ করতে চাইবে, ধর্ষণ হয়নি, আদৌ কোনও নির্যাতন হয়নি, মেয়েটা এমনি এমনি মরে গিয়েছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More