পরিযায়ীদের কথা কেউ ভাবেনি, শুধু কেন্দ্রকে দোষ দিয়ে লাভ কী

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    মৃত্যু সততই দুঃখের। তাই মরণ অনিবার্য জেনেও মানুষ তাকে ঠেকানোর চেষ্টা করে। করোনায় মৃত্যু ঠেকানোর জন্য দরকার প্রতিষেধক। তার জন্য বিশ্ব জুড়ে গবেষণা চলছে। কিন্তু পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু ঠেকানোর জন্য চাই সহানুভূতি। মানবিক মূল্যবোধ। রাজনীতিকদের মধ্যে তার বড় অভাব। বরং মৃতদের নিয়ে রাজনীতি করাই তাঁদের পছন্দ।

    আমাদের দেশে অতিমহামারীতে মৃতের সংখ্যা আড়াই হাজার ছুঁই ছুঁই। লকডাউনের সময় ভিন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া যে শ্রমিকরা মারা পড়লেন, তাঁদের সংখ্যা কত? একটি সূত্র বলছে, সংখ্যাটা ৪০০-র কাছাকাছি। তাদের মধ্যে বয়স্করা আছেন। শিশুরাও আছে। তারা অতিমহামারীর পরোক্ষ শিকার।

    মঙ্গলবার ভোররাতে উত্তরপ্রদেশের জৌনপুরে মারা গিয়েছে এক মা ও শিশু। মহারাষ্ট্র থেকে পরিযায়ী শ্রমিকদের একটি দল ফিরছিল উত্তরপ্রদেশের ফতেপুরে। সেই দলে ছিল মা-মেয়ে। তারা পাড়ি দিয়েছিল ১৩০০ কিলোমিটার। বাড়ি পৌঁছতে যখন আর একটু বাকি, পিছন থেকে তাদের ধাক্কা মারল দৈত্যাকার ট্রাক। ড্রাইভার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল।

    গাড়ির ধাক্কায় পরিযায়ীর মৃত্যুর খবর মিলেছে হরিয়ানা আর উত্তরপ্রদেশ থেকেও। এরকম খবর গত মাস দু’য়েক ধরেই শোনা যাচ্ছে। গত সপ্তাহে শোনা গিয়েছিল, মহারাষ্ট্রে কাজ করতে যাওয়া একদল শ্রমিক হেঁটে যাচ্ছিলেন আওরঙ্গাবাদ স্টেশনের দিকে। আশা ছিল, সেখান থেকে বাড়ি ফেরার ট্রেন পাওয়া যাবে। পথে অত্যধিক ক্লান্ত হয়ে তাঁরা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন লাইনের ওপরে। ভোরবেলায় মালগাড়ির ধাক্কায় তাঁরা মারা পড়েছেন।

    একটা হিসাবে আছে, লকডাউন চলাকালীন অনাহারে, আর্থিক দুর্দশায় মারা গিয়েছেন অন্তত ৪৭ জন। এক জায়গায় আটকে থাকতে থাকতে হতাশায় আত্মঘাতী হয়েছেন ৮৩ জন। পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৪৪ জনের। অত্যধিক ক্লান্তিতে মারা গিয়েছেন ২৬ জন।

    অনেকে বলছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাড়াহুড়ো করে লকডাউন ঘোষণা করেছেন বলেই এত মৃত্যু। আগে পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার সুযোগ করে দেওয়া উচিত ছিল।

    কথাটা খুব একটা যুক্তিসঙ্গত নয়। লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে বাড়ি ফেরাতে গেলে সময় লাগত অনেক। অন্তত ১০-১২ দিন। ততদিনে দেশ জুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ত করোনা। এমনিতেই লকডাউন করতে দেরি হয়ে গিয়েছে। এর জন্য প্রথমত দায়ী চিন। রোগটা প্রথম দেখা যাওয়ার পরে বেশ কিছুদিন তারা চেপে রেখেছিল। দ্বিতীয়ত, হু প্রথমে রোগের গুরুত্ব বুঝতে পারেনি। প্যানডেমিক ঘোষণা করতে তাদের দেরি হয়েছে। তার পরেই ঝপ করে লকডাউন ঘোষণা করেছে বহু দেশ। ধীরে-সুস্থে ব্যবস্থা নেওয়ার সময় ছিল না।

    মোদী বিভিন্ন রাজ্যে নিয়োগকর্তাদের অনুরোধ করেছেন, একটু মানবিক হোন। এই বিপদের সময় কর্মচারীদের মাইনে বন্ধ করবেন না। বাড়িওয়ালাদের অনুরোধ করেছেন, এইসময় ভাড়াটে উচ্ছেদ করবেন না। ভাড়া দিতে না পারলেও বেচারাদের থাকতে দিন অন্তত কয়েকটা মাস।

    সেই অনুরোধ ক’জন রেখেছেন? বেশিরভাগই লকডাউনের পরেই বন্ধ করেছেন বেতন। তাঁদের যুক্তি, আমাদের ব্যবসা বন্ধ। কর্মচারীদের বসিয়ে বসিয়ে মাইনে দেব কী করে? বাড়িওয়ালারাও অনেক জায়গায় ভাড়াটে উচ্ছেদ করেছেন। সহায়সম্বলহীন মানুষ তখন মরিয়া হয়েই বাড়ি ফেরার পথ ধরেছে।

    পরিযায়ী শ্রমিকদের সম্পর্কে যে প্রশ্নটা সবার আগে করা উচিত, তা হল, তাঁদের ভিন রাজ্যে পাড়ি দিতে হয়েছিল কেন? উত্তরটা সহজ। তাঁদের নিজেদের রাজ্যে অন্নসংস্থানের উপায় নেই। যে রাজ্য যত অনুন্নত, শিল্প কম, সেখান থেকেই মানুষ জীবিকার সন্ধানে পাড়ি দেয় অন্যত্র। শিল্পোন্নত রাজ্যগুলিতে তারা গিয়ে জড়ো হয়। ওইজন্য পরিযায়ীদের ভিড়ে বিহার, ঝাড়খণ্ডের মানুষ বেশি। পশ্চিমবঙ্গের মানুষও কম নেই। বাম আমলের ৩৪ বছরে রাজ্য শিল্পে মরুভূমি হয়ে গিয়েছে। তার পরের ন’বছরেও অবস্থার বিশেষ উন্নতি হয়নি।

    অন্নের টানে যাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়, বিপদ তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। এমনিতেই অজানা-অচেনা শহরে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া খুব কঠিন। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে কোনও বিপর্যয়ের সময়। রাজ্য ও কেন্দ্র, উভয় সরকারের উচিত পরিযায়ীদের সমস্যাটা সহানুভূতির সঙ্গে বোঝা। তাঁদের জীবন ও জীবিকার ব্যবস্থা করা। শুধু কেন্দ্রের ওপরে দোষ চাপালে কারও উপকার হবে না।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More