সোমবার, মার্চ ২৫

এক্সক্লুসিভ: ডাক্তাররা মার খেয়েছেন? কই জানি না তো! বেমালুম জানিয়ে দিল মমতা-সরকার!

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

জেলা হোক বা শহর। সরকারি হোক বা বেসরকারি। তাঁরা পার পাননি। বাংলায় বিক্ষিপ্ত ভাবে ডাক্তার পেটানোর ঘটনা চলেছেই, চলছে। প্রাণ বাঁচানোর দায়িত্ব যাঁদের, ইদানীং তাঁরা নিজেরাই বারবার প্রাণ সংশয়ের মুখে পড়ছেন। সেই সঙ্গে চলছে, হাসপাতাল-নার্সিংহোমে অবাধ ভাঙচুরের ঘটনা। কখনও বা তা হচ্ছে ক্যামেরার সামনেই! অথচ রাজ্য সরকারের ডিরেক্টর জেনারেল ও ইনস্পেক্টর জেনারেল অব পুলিশের দফতর বেমালুম জানিয়ে দিল, ডাক্তারদের মারধরের ব্যাপারে বা হাসপাতাল-নার্সিংহোমে ভাঙচুরের বিষয়ে তাদের কাছে কোনও তথ্যই নেই।

চিকিৎসক-নিগ্রহের মামলাগুলি ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, তা জানতে চেয়ে ডাক্তারদের সংগঠনের তরফে তথ্যের অধিকার আইনের আওতায় প্রশ্ন করা হয়েছিল সরকারের কাছে। তার জবাবেই ক্রাইম ব্যুরোর তরফে গোটা গোটা শব্দে এই উত্তর দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সমস্যা সমাধান দূরের কথা, সমস্যা আদৌ হয়েছে বলেই যদি তথ্য না থাকে, তবে সেই প্রশাসন কী করে নিশ্চিত করবে ডাক্তারদের সুরক্ষা! অর্থাৎ বাংলায় ডাক্তাররা আদৌ নিরাপদ কি?

দার্জিলিঙে আক্রান্ত চিকিৎসক অভিষেক রায়বর্মন।

ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের প্রেসিডেন্ট, ডক্টর অর্জুন দাশগুপ্ত জানালেন, গত বছর ৩ এপ্রিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে সমস্ত ডক্টর্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করেছিলেন। ডাক্তারদের সংগঠনের তরফে ৮৬টি ডাক্তার-নিগ্রহের ঘটনার কথা তাঁদের তরফে মুখ্যমন্ত্রীকে জানানো হয়েছিল ওই বৈঠকে।

দেখে নিন সেই আরটিআই।

অর্জুন বাবু আরও জানান, ওই বৈঠকে তৎকালীন ডিজি সুরজিৎ করপুরকায়স্থও উপস্থিত ছিলেন। চিকিৎসকদের কথা মন দিয়ে শোনেন মুখ্যমন্ত্রী। নিজের উদ্যোগে যাচাই করেন তথ্য। এবং খবর নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছিলেন, তাঁদের কাছে ৮৬টি নয়, ১০০-র উপর চিকিৎসক নিগ্রহের অভিযোগের হিসেব রয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি সব ক’টি অভিযোগের পদক্ষেপ করার আশ্বাস দিয়েছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন: শিশুর খাবারে শুয়ে আছে শুঁয়োপোকা, সৌজন্যে কলকাতা মেডিকেল কলেজ

অর্জুন বাবু বলেন, “খুবই পজ়িটিভ মিটিং ছিল ওটা। আমরা নিশ্চিত ছিলাম, এর পরে কেসগুলির সুরাহা হবে। এবং তা যদি হয়, তা হলে মানুষ অন্তত এইটুকু জানবে, যে চিকিৎসকদের ইচ্ছেমতো পেটানো যায় না।”

দার্জিলিঙে প্রহৃত মহিলা চিকিৎসক, ডক্টর ইউডেন।

কিন্তু বাস্তবে তেমনটা ঘটল না। অর্জুন বাবুর দাবি, প্রায় বছর ঘুরে যাওয়ার পরে কোনও রকম খবর না আসায়, তাঁরা আরটিআই করেন ডক্টর্স ফোরামের তরফে। জানতে চান, কোথায় দাঁড়িয়ে আছে চিকিৎসক-নিগ্রহের মামলাগুলি। ইতিমধ্যে এই এক বছরে আরও ৮০-৯০টি চিকিৎসক নিগ্রহের ঘটনার কথা জেনেছেন তাঁরা। ফলে তাঁদের হিসেবে সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০০।

কিন্তু আরটিআই করার পরে সরকারের তরফে যে উত্তর এল, তা বিস্ময়কর বললেও কম বলা হয়। অর্জুনবাবুর অভিযোগ, “আরটিআই দফতর থেকে জানানো হয়েছে, কেসগুলির অবস্থান দূরের কথা, এ রকম কোনও মামলার তথ্যই নেই তাঁদের কাছে!” অর্থাৎ গত বছরের বৈঠকে পাওয়া আশ্বাসের পায়ের তলায় বিশ্বাসযোগ্য কোনও মাটিই নেই! এই বিষয়টি আবারও মুখ্যমন্ত্রীকে ইমেল করে জানিয়েছেন তাঁরা। আশা করছেন, ইতিবাচক উত্তর আসবে।

আরটিআই করার পরে যে উত্তর এসেছে।

বাংলায় দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসার পর পরই স্বাস্থ্যক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য নিজে তৎপর হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। টাউন হলে সমস্ত বেসরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করে তিনি কড়া বার্তা দিয়েছিলেন, কোনও রকম অসততা বরদাস্ত করা হবে না। একই সঙ্গে, চিকিৎসকদের নিগ্রহের ঘটনাও স্বীকার করেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, চিকিৎসায় কোনও গাফিলতি বা অসঙ্গতি থাকলে কেউ আইনি পথে মামলা করে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে। স্বাস্থ্য কমিশন অভিযোগ খতিয়ে দেখবে। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে চিকিৎসকদের উপর হামলা করা চলবে না।

মুখ্যমন্ত্রীর এই উদ্বেগের পরেও সরকারের তথ্যের ভাঁড়ারে চিকিৎসক-নিগ্রহের সংখ্যা শূন্য দেখে রীতিমতো হতাশ চিকিৎসক মহল।

ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের সেক্রেটারি, ডক্টর কৌশিক চাকি জানালেন, তাঁরা স্তম্ভিত। তিনি বলেন, “চুরি, জোচ্চুরি, ছিনতাই, পকেটমারি যা-ই হোক না কেন, সমস্ত তথ্য পুলিশের কাছে থাকে। পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ লেখা থাকে সরকারের খাতায়। কিন্তু আমাদের সতীর্থদের মারধরের ঘটনাগুলো সেই তালিকাতেই এল না!”

দেখুন নিগ্রহের ভিডিও।

কৌশিকবাবু জানান, গত বছরের বৈঠকের পরে, চিকিৎসক নিগ্রহ নিয়ে ইতিমধ্যেই একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন তাঁরা। তার পরেই সরকারের তরফে কোনও তথ্য না পাওয়ায়, ডিসেম্বরের ২৮ তারিখ আরটিআই করে তিনটে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল। প্রথমত, কতগুলি চিকিৎসক-হামলার ঘটনা তাদের কাছে এ পর্যন্ত নথিভুক্ত রয়েছে? দ্বিতীয়ত, কতগুলির চার্জশিট তৈরি হয়েছে? তৃতীয়ত, গ্রেফতার কত জন হয়েছেন? এই আবেদনে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে হওয়া বৈঠকের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।

কৌশিকবাবু বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম, এই তথ্যগুলো হাতে এলে সেটা মামলার পরবর্তী শুনানিতে পেশ করব। কিন্তু ওরা বলে দিল, কোনও রেকর্ডই নেই! রেকর্ড না থাকলে, রাজ্য জুড়ে যে স্বাস্থ্যকর্মীদের এই বিপদ, তার বিরুদ্ধে প্রশাসন পদক্ষেপ করবে কী করে!”

আরও পড়ুন: ওয়ার্ডে ঢুকে চকিতে রোগীদের ইঞ্জেকশন ফুঁড়ে দিয়ে পালালেন মহিলা

গত পরশুও এক মহিলা চিকিৎসক মাথায় রডের বাড়ি খেয়ে আহত হয়েছেন। তার ক’দিন আগেই এক জন নবজাতকের জন্ম দিতে গিয়ে মারা গিয়েছেন পাঁশকুড়ার এক চিকিৎসক। “মানুষ যেমন অমর নয়, আমরাও ভগবান নই। আমাদেরও লিমিটেশন আছে। আমাদের তরফে অন্যায় হলে, সে বিষয়ে অভিযোগ করার সুযোগ আছে। কিন্তু আমাদের মারধর করাটা তো কোনও পন্থা হতে পারে না! আমরা এর শেষ দেখে ছাড়ব”– বলেন ক্ষুব্ধ কৌশিক বাবু।

এগরায় আক্রান্ত চিকিৎসক ধীধীপন সর্দার।

চিকিৎসকদের একাংশ বলছেন, এই ঘটনায় চিকিৎসকদের নিরাপত্তাহীনতা যেন চরমে পৌঁছল। ভয় বেড়ে গেল তাঁদের। চিকিৎসার ক্ষেত্রে অনেক সময়েই ঝুঁকি নিতে হয় ডাক্তারদের। রোগীর পরিবারকে বন্ডে সই করিয়ে অস্ত্রোপচার করতে হয়। কিন্তু পরিস্থিতি যদি এমন হয়, যে রোগীর চিকিৎসায় কোনও রকম অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি থেকে গেলেই ডাক্তারদের মার খাওয়াটাই দস্তুর, তা হলে আর কী করে ঝুঁকি নেবেন চিকিৎসকেরা? — এ প্রশ্ন এ রাজ্যের ডাক্তারদের একটা বড় অংশের।

চিকিৎসকেরা নিজেরাই স্বীকার করছেন, কোনও সিস্টেমই একশো শতাংশ নির্ভুল হয় না, কোনও ক্ষেত্রের সমস্ত কর্মীই তাঁদের একশো শতাংশ প্রচেষ্টা দেন না। গলদ থাকেই। কিন্তু স্বাস্থ্যের মতো পরিষেবায় সেই সংখ্যাটা নগণ্য। ইচ্ছাকৃত গাফিলতি প্রায় কেউই ঘটান না চিকিৎসা ক্ষেত্রে।

এর পরেও যদি নিগ্রহ চলতেই থাকে, তা নিয়ে যদি সরকারের কাছে তথ্য পর্যন্ত না থাকে, তা হলে লোকদেখানো অভিযোগ দায়ের করেই বা কী লাভ? এমনটা হলে তো কোনও রকম পদক্ষেপ করতেই ভয় পাবেন চিকিৎসকেরা। ঝুঁকি নেওয়ার আগেই জানিয়ে দেবেন, তাঁদের অক্ষমতা।

বিশেষ করে গ্রামগঞ্জে যাঁরা কর্মরত, তাঁরা তো তীব্র নিরাপত্তাহীনতার শিকার হবেন। কারণ বিচার পাওয়া দূরের কথা, তাঁদের বিরুদ্ধে ঘটা অন্যায়গুলোই নথিভুক্ত হবে না সরকারি খাতায়! এতে তো মারমুখী রোগী পরিবারগুলিকে যেন লাইসেন্স দিয়ে দেওয়া হচ্ছে ডাক্তার পেটানোর!

এমনটা হলে, এই সমস্তটার প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক হবে বলেই মনে করছেন চিকিৎসকেরা। আশপাশের রাজ্য এমনকী আশপাশের দেশ থেকেও বহু রোগী এ রাজ্যে আসেন চিকিৎসার প্রয়োজনে। তাঁদের কাছে বার্তা যাবে, পান থেকে চুন খসলেই ডাক্তারদের মারধর করাটাই বুঝি এখানকার নিয়ম!

আরও পড়ুন

শিশুর খাবারে শুয়ে আছে শুঁয়োপোকা, সৌজন্যে কলকাতা মেডিকেল কলেজ

Shares

Comments are closed.