যখনই বাধা এসেছে, মেয়ের মুখটা মনে করেছি, দেরিতে হলেও বিচার পেয়ে আবেগে ভাসছেন নির্ভয়ার মা-বাবা

ভেবেছিলেন, এ যন্ত্রণা সামাল দিতে পারবেন না। কিন্তু তখনও জানতেন না, যন্ত্রণা থেকেই জন্ম নেবে লড়াই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওযাল ব্যুরো: মৃত্যুশয্যায় সন্তানকে ছটফট করতে দেখার মতো যন্ত্রণা মনে হয় আর কোনও কিছুতে হয় না। আর সে মৃত্যু যদি আসে নৃশংস নির্যাতনের শেষে, তবে তা অসহনীয়। অপূরণীয়। এ অধ্যায় যে মা পার করেছেন, সে মায়ের রক্তক্ষরণ মোছাতে পারার মতো কোনও উপাদানই পৃথিবীতে হয়তো নেই। সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়েছিলেন আশাদেবী। আজও দাঁড়িয়ে আছেন। চোখ থেকে জল পড়ছে অঝোরে। গলা বুজে আসছে। কিন্তু চোয়ালের প্রত্যয় সুদৃঢ়। জয় পেয়েছেন তিনি আজ। দীর্ঘ কাঙ্ক্ষিত জয়। প্রায় আট বছর ধরে লড়তে লড়তে চার চারটি ফাঁসির বিনিময়ে পাওয়া জয়।

    মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠিন একটা সাজা কি কারও জয়ের বিষয় হতে পারে? পারে তো। সে মৃত্যু যদি এমন চার জনের হয়, যে চার জন নারকীয় ভাবে নির্যাতন করেছে তাঁর ২১ বছরের কন্যাসন্তানের উপর, তাঁর কন্যাসন্তানের যোনিপথে যারা লোহার রড ঢুকিয়ে বার করে এনেছে অন্ত্র, যাদের অত্যাচারের তীব্রতায় মেয়েটির জীবন চলে গেছে, তাদের ফাঁসি তো মাকে স্বস্তি দেবেই, শান্তি দেবেই!

    তাই ধরা অথচ দৃঢ় স্বরে আশাদেবী বলছেন, আজ শান্তি পেল আমার মেয়ে। বিচার পেল দেশের মেয়ে। তিনি বলছেন, “অনেকটা দীর্ঘ লড়াইয়ের পরে বিচার পেলাম আমরা। এই লড়াইয়ের পথে কাঁটা কম ছিল না। যন্ত্রণার শেষ ছিল না। তবু অপেক্ষার শেষ হল। ফাঁসি হল চার জনের। বিচার পেল আমাদের মেয়েটা।” একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিলেন, “লড়াই কিন্তু আমরা থামাব না। দেশের অন্য নির্ভয়াদের জন্য এ লড়াই চালিয়ে যাব।”

    আশাদেবীর কথার সূত্র ধরেই নির্ভয়ার বাবা বললেন, “এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করছিলাম আমরা। বলে বোঝাতে পারব না কেমন লাগছে। এই দিনটা শুধু আমাদের জন্য না সারা দেশের জন্য আনন্দের দিন। ন্যায়ের দিন। আজ নির্ভয়া নিশ্চয়ই খুশি হবে। মহিলাদের জন্য আরও কঠিন আইন গাইডলাইন আসুক, সেটাই চাই।”

    আরও পড়ুন: বিচার পেলেন নির্ভয়া, স্বস্তি পেল জনগণ! অপরাধ কমার প্রতিশ্রুতি পেল কি সমাজ

    ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর দিনটা এখনও স্পষ্ট মনে আছে আশাদেবীর। কিছুক্ষণের মধ্যে ফেরার কথা বলে বেরিয়েছিল মেয়ে। ফেরা হয়নি। মেয়েকে দেখতে তাঁদের ছুটে যেতে হয়েছিল হাসপাতালে। রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত, ছিন্নভিন্ন মেয়েকে দেখে ভেঙেচুরে শেষ হয়ে গেছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন, এ যন্ত্রণা সামাল দিতে পারবেন না। কিন্তু তখনও জানতেন না, যন্ত্রণা থেকেই জন্ম নেবে লড়াই।

    দিল্লিতে গণধর্ষণ ও অকথ্য অত্যাচারের শিকার হয়েছিল নির্ভয়া। ১৩ দিনের লড়াইয়ের পরে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁর। আশাদেবীর আজ আবার মনে পড়ে যাচ্ছে, মৃত্যুর আগে শুধু একটাই জিনিস চেয়েছিল মেয়ে। কঠোর শাস্তি হোক দোষীদের। মৃত্যুকালীন জবানবন্দিতে বর্ণনাও দিয়ে গেছিলেন অপরাধীদের।

    তারপরে দীর্ঘ আট বছর কেটে গেল। অজস্র টালবাহানা, অজস্র শুনানি, অজস্র আবেদনের শেষে আইনি লড়াই শেষ হল। বারবার বাধা এসেছে, ব্যর্থতা এসেছে। হাল ছেড়ে দেননি। মেয়ের মুখ মনে করে, ফের ছুটে গেছেন আদালতে। একের পর এক ফাঁসির তারিখ পিছিয়ে যেতে গলা চিরে চিৎকার করে বলেছেন, “বিচারের নামে তামাশা হচ্ছে!” অপরাধীদের মানবাধিকারের প্রশ্ন উঠলে চোখে চোখ রেখে পাল্টা প্রশ্ন করেছেন, “আমার মেয়েটার বেঁচে থাকার অধিকার ছিল না? ও বিচার পাবে না”

    সেই বিচারই হল এতদিনে। শান্তি পেলেন নির্ভয়া, স্বস্তি পেলেন আশাদেবী। আর সেই সঙ্গেই বিচার পেল গোটা দেশ। দেশের প্রায় প্রতিটা মানুষই বোধহয় এই ফাঁসির জন্য মুখিয়ে ছিলেন। কারণ একটা সময়ের পরে নির্ভয়া শুধু এক বিচ্ছিন্ন ধর্ষিতা ও মৃতা তরুণী হয়ে থেকে যাননি, এ দেশের মেয়ে হয়ে উঠেছিলেন তিনি। এ দেশের প্রতিটি নিগৃহীত মেয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিল তাঁর নামটি।

    তাই এ লড়াইও আশাদেবীর একার লড়াই ছিল না। তাঁর আত্মীয়-পরিজনরা বলছেন, “কোনও দিন আত্মবিশ্বাস হারাননি আশাদেবী। বিশ্বাস করেছিলেন, দোষীদের একদিন মৃত্যুদণ্ড হবেই।”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More