শুক্রবার, নভেম্বর ১৬

নিকেশ

সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়

রনি,

বীরেনবাবুর চিঠি নিশ্চয়ই এর মধ্যে পেয়ে গিয়েছ ও অবাক হয়েছ। আমাদের সম্পর্ক অনেক দিনই ভাল যাচ্ছিল না, যদিও তার মানে এই নয় যে আমার তোমাকে এরকম একটা চিঠি পাঠাতে হত। সারা পৃথিবীতে কোটি কোটি সম্পর্কের এরকমই দশা তাতেও তা টিকে থাকে। আর আমাদের মতো দেশে যেখানে শতকরা আশি-ভাগ মেয়ে কোনও উপার্জন করে না সেখানে তো টিকে থাকেই।

চিঠিটা পাঠাতে হল একটু অন্য কারণে।

টিনএজার যখন ছিলাম তখনকার কিছু কথা মনে পড়লে খুব মজা লাগে। সাহেবি স্কুলে পড়তাম, সাহেবি আদবকায়দার সাথে বেশ কিছু সাহেবি কুসংস্কার আর বুজরুকিও আমাদের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। আমাদের মাঠের পাশে বেশ সুন্দর কিছু ফুলের গাছ ছিল। সেই গাছ থেকে ফুল-পাতা ছিঁড়ে নিতাম আমরা, তারপর একটা করে পাপড়ি ছিঁড়তাম আর বলতাম, ‘হি লাভস মি, হি লাভস মি নট’। বলা বাহুল্য সেই ‘হি’ ছিল আমাদের স্কুলের উঁচু ক্লাসের একটি ছেলে, যে দারুণ ক্রিকেট খেলত, আবৃত্তি করত আরও কী কী সব করত। শেষ পাপড়িটা ছেঁড়ার সময় যদি ‘হি লাভস মি’ বলতে পারি তাহলে মনটা ভারী খুশীতে ভরে উঠত। অকারণে একটি ফুলের প্রাণ যেত। সে আমার দিকে ফিরেও তাকাত না।

আমাদের দেশে শহিদ হওয়ার একটা মস্ত আনপ্রোডাক্টিভ ব্যাপার খুব চালু আছে। দরকার থাক বা না থাক, বন্দুকের সামনে বুক পেতে দাও, কিংবা নেতাদের কথায় বাঁশ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়। তোমার  আর তোমার শত্রপক্ষের লাশ যখন পাশাপাশি ঠাণ্ডা ঘরে পড়ে, তখন হয়তো সেই দুই দলের নেতারা, যাদের জন্য তোমরা মরলে, তারা এক সাথে বসে স্কচ খাচ্ছে। আজ বুঝি ওই ফুলগুলোও ওরকম বেকার কারণে শহিদ হয়েছে।

স্কুলের ক্রাশ সেই ক্রিকেটার বা অন্য কোনও ছেলে আমাকে ভালবাসবে কি বাসবে না সেটা কী এমন বড় কথা। আমিই যে কাউকে ভালবাসব, তারই বা স্থিরতা কী! আসলে এই একবিংশ শতাব্দীতে আমরা কোন মানুষের প্রেমে পড়ি না, আমরা ভালবাসি, হ্যাঁ এখনো ভালবাসি ‘ভালবাসা’ কনসেপ্টটাকে। আর ভাবতে চাই যে আমি ভালবাসতে পারি। ভালবাসা হল ফুল আর যে মানুষটাকে ভালবাসি বলে আমরা বুক বাজিয়ে বেড়াই সে মানুষ হল ফুলদানী। একটা ফুলদানী ভেঙে গেলে বা পুরনো হয়ে গেলে আমাদের সেটাকে বদলাতে তাই কোন কষ্টই হয় না। তাই তোমাকে ছেড়ে আসার কারণ ভালবাসা শেষ হয়ে যাওয়া নয়, ফুলদানীর পুরনো হয়ে যাওয়া বা ভেঙে যাওয়া।

কস্তুরী বলে তোমার অফিসের মেয়েটির প্রতি তুমি যে আসক্ত সে কথা আমি জানতাম।  এও জানতাম যে কারণে অকারণে তোমাদের ফোনালাপ হয়। যথেষ্ট যোগ্যতা না থাকলেও তুমি তাকে কিছু সুযোগ সুবিধে পাইয়ে দাও। অফিসের পিকনিকে আমি যখন মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত তুমি আর সে একসাথে অনেকক্ষণের জন্য হারিয়ে যাও। যখন ফিরে আসো তখন দুজনেই বল যে তোমরা একসাথে ছিলে না, একজন গিয়েছিলে উত্তরে তো আরেকজন দক্ষিণে। সবাই মুখ টিপে হাসে। কারণ দুজনের জুতোতেই একই কাদা লেগে আছে যা দেখে বোঝা যায় তোমরা গিয়েছিলে একটু দূরে বিলের ধারে যেটা আসলে পশ্চিমে।

এমনিতে আমার সাথে তোমার ব্যবহার ছিল বেশ যাকে বলে ফর্মাল, কিন্তু মাঝে মাঝে তুমি আমার প্রতি ভীষণ মনোযোগী হয়ে উঠতে। অকারণে এটা সেটা উপহার নিয়ে আসতে, আর সেসব রাতে বন্য হয়ে ওঠার চেষ্টা করে শেষমেশ এক করুণ পরিস্থিতি তৈরি করতে। মাঝবয়সে এক দিনে বেশী ধকল সইবে কেন? পরে খবর নিয়ে দেখেছি তুমি এসব দিনে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়েছ, মানে খুবই আগে কোন ক্লায়েন্ট ভিজিট করবে বলে আর বাড়ী ফিরেছ খুব বেশী রাতে। তুমি তো একটা ফ্লপ শো দিয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে, বলা যায় ঘুমের ঘরে পালাতে, আমার ঘুম আসত না।

ভীষণ গা বমি বমি লাগত। অনেকক্ষণ ধরে স্নান করতাম, ঘুম আসত না, এসে বসতাম ব্যালকনিতে।

নীচে দেখতাম কয়েকজন মহিলা ওই গভীর রাতে রাস্তায় ঘুরছে, মাঝে মাঝে গাড়ি এসে থামছে, যার ভাগ্য ভাল সে গাড়িতে উঠে চলে যাচ্ছে। এক সময়ে এধরণের লোকেদের ওপর রাগ হত। তারপর ভেবেছি ওদের কী দোষ। ওদের অফিসে হয়ত কোনও কস্তুরীকে পায়নি। মহিলাকে তুলে নিয়ে যাবার সময় কোন অজ্ঞাত কারণে ওরা সবাই একবার হর্ন বাজাত। যেন শিকার ধরার সাফল্যের ঘোষণা। আর সেই মোটর হর্নের আওয়াজের সাথে তাল মিলিয়ে তোমার নাক ডাকার আওয়াজ আসত বেড রুম থেকে।

কয়েকদিন আগে কস্তুরী এসেছিল আমাদের এনজিও-তে।

ওকে চিনতে পেরে কেসটা আমি হ্যান্ডেল করিনি। দীপাদি কথা বলেছেন। ও এখন আট মাসের প্রেগন্যান্ট। তুমি ওকে সবসময় বলে এসেছ আমাদের বিয়েটা বিয়েই নয়। তোমার আমার কোন রকম সম্পর্ক নেই। ও সেগুলো বিশ্বাস করেছে। তারপর তুমি যখন অ্যাবর্শন করাতে বলেছ, ও মারাত্মক ধাক্কা খেয়েছে। বিপদ বুঝে তুমি একদম তুচ্ছ কারণ দেখিয়ে ওকে চাকরি থেকে বার করে দিয়েছ। ওর প্রাপ্য টাকা পয়সাও ও পায়নি। আর যোগাযোগও রাখ না। ওর ফোন কেটে দাও। এখন অবশ্য তুমি আরও নিশ্চিন্ত কারণ ওর ফোনের কার্ড কেনারও পয়সা নেই।

ও এখন গভীর অবসাদে ভুগছে।

ওর ভাগ্য ভাল ও আমাদের কাছে এসেছে। আমরা ওকে দেখব।

একটা মজার কথা কী জান, আমি ঠিক জানি না আমি কী করতাম যদি তুমি এই এ্যাফেয়ারের কথা বলে আমার কাছে ডিভোর্স চাইতে। হয়তো এক কথায় রাজী হতাম না, হয়ত রাজী হতামই না। মেয়ের কথা ভেবে, নিজের কথা ভেবে আপসের মাত্রা বাড়িয়ে থেকেই যেতাম তোমার সাথে। কিন্তু একটি মেয়ে যার বাবা মা ভাই বোন কেউ নেই তার সাথে তুমি যা করেছ তা জানার পর আর তোমার সাথে থাকতে পারলাম না।

এখন আমার চেনা আমার প্রিয় শহরটাকেও আর নিতে পারছি না। তাই এনজিও-কে বলে রাবাংলাতে চলে এসেছি। বড্ড সুন্দর যায়গাটা। এখন বিকেল। স্কুল ছুটি হয়েছে। পাহাড়ী রাস্তা ধরে এক রাশ ফুল হেঁটে হেঁটে আসছে। এখানেই রুমিকে ভর্তি করে দেব।

বীরেন বাবুর চিঠিতে সব দেওয়া আছে, সেইমতো সব চুকিয়ে দিও। আর তিক্ততা বাড়িও না।

আমি ভাল আছি। তুমি ভাল থেক বলতে পারলাম না, কারণ খারাপ মানুষের ভাল থাকা মানে অন্য কারো বা অনেকের খারাপ থাকা।

ফোন না করলে খুশী হব।

ইতি – আলো

 

Shares

Leave A Reply