দুঃস্বপ্ন না ইতিহাস, সিঙ্গাপুরে কীসের সূচনা

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শর্মিষ্ঠা গোস্বামী নিধারিয়া: সিটি স্টেট এখন সামিট স্টেট। সারা পৃথিবীর চোখ এখন সেখানে। জমা হয়েছেন  কয়েক হাজার সাংবাদিক। এমনিতেই ঝাঁ চকচকে সিঙ্গাপুর এখন আরও চকচকে। নিরাপত্তায় মাছিও গলতে পারবে না।  সেখানকার সেন্টোসা দ্বীপের ক্যাপেলা হোটেলে আর কয়েক ঘণ্টা পরে মুখোমুখি বসতে চলেছেন এমন দুজন রাষ্ট্রপ্রধান, যাঁদের এক টেবিলে বসানোর কথা কয়েক মাস আগেও কল্পনাতে আনা যেত না।

এক জন একনায়ক আর অন্য জন একনায়ক না হলেও হাবভাব কার্যত সেরকমই। বিশ্বজুড়ে নিন্দা ও সমালোচনার পাত্র এই দুই রাষ্ট্রনায়কই। সংবাদমাধ্যমের হাসির খোরাকও বটে।  পরমাণু বোমার বোতামটা টিপে ফেলা বাদে বাকি সবই করে ফেলেছেন এই দুই আত্মম্ভরী ও উদ্ধত রাষ্ট্রপ্রধান।

অনেক ছায়াযুদ্ধ, হুমকি, পাল্টা-হুঙ্কার, ‘খেলবো না ব্যস’ জাতীয় বাগযুদ্ধের পর শেষমেশ ১২ জুন মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল নটায় সামনাসামনি হবেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার সুপ্রিম লিডার কিম জং উন।  এই শীর্ষ বৈঠক ৭২ বছরের ট্রাম্পের সঙ্গে ৩৪ বছরের কিমের স্নায়ুযুদ্ধও বটে। এবং সেই সাক্ষাতের প্রথম পর্বে একমাত্র তাঁদের দোভাষী ছাড়া থাকবেন না কোনও পরামর্শদাতা বা পরমাণু বিশেষজ্ঞ।

দুই রাষ্ট্রনায়কই জানেন, সারা বিশ্ব তাকিয়ে থাকবে তাঁদের দুজনের দিকে। এখনও পর্যন্ত দুই নেতা তাঁদের দুজনের শরীরী ভাষা নিয়ে যথেষ্ট সচেতন। বদমেজাজি বলে পরিচিত দুজনেই গত কয়েকদিন খুব একটা আলটপকা মন্তব্যও করেননি।

গত কয়েক মাস ধরেই নিজের ভাবমূর্তি ঘষামাজা করে চলেছেন কিম। উদ্ধত একনায়ক থেকে হাসিহাসি মুখের রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে নিজেকে সচেতন ভাবে তুলে ধরেছেন একাধিকবার। বিশেষত দক্ষিণ কোরিয়ার আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে। সর্বোপরি আমেরিকার সঙ্গে বৈঠকে বসতে রাজি হয়ে কিম ইতিমধ্যেই কিছুটা হলেও ইতিবাচক কৌতূহল জাগিয়েছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে। যদিও তাঁর দেশ, বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন উত্তর কোরিয়ায় মানবাধিকারের হাল নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গিয়েছে। ট্রাম্পও একবার বৈঠক বাতিল করেও ফের রাজি হয়েছেন কিমের সঙ্গে নির্ধারিত দিনেই বৈঠকে বসতে।

কিমের সঙ্গে আলোচনায় বসার ৩৬ ঘণ্টা আগে কানাডায় জি-৭ বৈঠক থেকে সরাসরি রবিবার সিঙ্গাপুরে এসে পৌঁছেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও অন্য কিছু বিষয়ে কানাডা, ও ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ সংঘাত হয়েছে। ট্রাম্প সরাসরি তাঁর টুইটারে কানাডিয়ান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে অসৎ ও দুর্বল বলে অভিহিত করেছেন।  যোগদানকারী দেশগুলির সঙ্গে একটি যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করে কার্যত বৈঠকের মধ্যেই তড়িঘড়ি কিমের সঙ্গে বৈঠক করতে সিঙ্গাপুরে চলে এসেছেন ট্রাম্প। কিম যেমন  রাজনৈতিক দুনিয়ায় একেবারে একা, জি ৭ থেকে আসা ক্রুদ্ধ ট্রাম্পও কিন্তু এই মুহূর্তে কিছুটা দলছুট। ফলে এই দুই একগুঁয়ে ও আগ্রাসী একনায়ক বৈঠকে ঠিক কী করবেন, তা ভাবা কঠিন।

প্রত্যাশিত হচ্ছে, পরমাণু অস্ত্রসম্ভার ধ্বংস করতে বলার পাশাপাশি কিমকে বাকি বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কথা বলবেন ট্রাম্প। বিনিময়ে কিম চাইবেন আমেরিকার কাছ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপত্তার আশ্বাস। আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় একঘরে উত্তর কোরিয়ার জন্য নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আর্জিও জানাবেন কিম। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে পিয়ংইয়ংয়ের পরমাণু অস্ত্র সম্ভার এতটাই বিশাল, যে তা ধ্বংস করার কাজটিও জটিল ও সময়সাপেক্ষ। ফলে এই কাজ উত্তর কোরিয়াকে দিয়ে করাতে গেলে বেশ কয়েক বছর ধরে পর্যায়ক্রমে করাতে হবে। এবং তার জন্য একাধিক বৈঠকের প্রয়োজন হবে।  কিন্তু এই ভাবনায় বাদ সাধছে ট্রাম্পের মন্তব্য।  তিনি যেমন সিঙ্গাপুরে পৌঁছেই বলেছেন, তিনি প্রথম কয়েক মিনিটেই নাকি বুঝে যাবেন, কিম শান্তি-প্রক্রিয়ার বিষয়ে সিরিয়াস কি না।  যদি বোঝেন তাঁর প্রতিপক্ষ তেমন সিরিয়াস নয়, তবে ট্রাম্প ‘সময় নষ্ট করবেন না।’

পর্যবেক্ষকদের মতে, খুব খারাপ যদি কিছু হয় তা হলো, বৈঠকের মাঝপথে ট্রাম্পের বেরিয়ে আসা। এখনই সমস্ত পরমাণু অস্ত্র উত্তর কোরিয়াকে ধ্বংস করতে হবে, জাতীয় চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়ে। তা যদি হয়, তা হলে এই দুই দেশের মধ্যে এর পর যা শুরু হবে, তা বিশ্বের কাছে পারমাণবিক দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়।  আর যদি দুই নেতাই সংযত আচরণ করেন, নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জল রাখার চেষ্টা করেন, তা হলে অন্য কথা। সে ক্ষেত্রে হয়তো কিমকে পরের বৈঠকে বসানোর আমন্ত্রণ জানিয়ে শান্তি প্রক্রিয়া জারি রাখতে পারেন ট্রাম্প।  কিমও সেই প্রস্তাবে সম্মত হয়ে বিশ্বের কৌতূহল জিইয়ে রাখতে পারেন।

একরোখা এই দুই রাষ্ট্রপ্রধান সামিট স্টেট সিঙ্গাপুরে ইতিহাস রচনা করতে পারবেন কি না সেটাই এখন দেখার।

 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More