রবিবার, জানুয়ারি ১৯
TheWall
TheWall

সূচালো, ডিম্বাকার খুলির মহিলার কঙ্কাল! মানুষ না ভিনগ্রহের প্রাণী, হইচই রাশিয়ায়

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

চৈতালী চক্রবর্তী

 খুলির গঠন প্রায় ডিম্বাকার। একদিন সূচালো হয়ে বেরিয়ে এসেছে। অন্যপ্রান্ত তুলনায় ভোঁতা। একঝলক দেখলে মনে হবে করোটির একপ্রান্ত টেনে লম্বা করে দেওয়া হয়েছে। মানুষের মাথার গঠন তো এমন হয় না!  তবে কি মানুষ নয়, এলিয়েন অর্থাৎ ভিনগ্রহের প্রাণী? রাশিয়ার আরকাইমে এক মহিলার কঙ্কাল উদ্ধারের পরে এমন গুঞ্জনই শোনা যায় রাশিয়াতে।

আরকাইম এমনিতেই রহস্যে মোড়া। প্রাচীন সমাধিক্ষেত্র, সভ্যতার প্রাচীন জনগোষ্ঠীদের বসবাসের চিহ্নযুক্ত এই স্থানে নাকি নানা অতিপ্রাকৃত ঘটনা ঘটে চলে। এমনটাই ধারণা আরকাইমের আশপাশে বসতি গড়ে তোলা মানুষজনের। ইউএফও বা উড়ন্ত চাকিও নাকি মাঝেমাঝে দেখা যায় এখানে। সেই সঙ্গে বিচিত্র আলোর ঝলকানি। রাতের বেলা আরকাইমের প্রাচীন সমাধিক্ষেত্রের পাশ দিয়ে গেলে দৃষ্টিভ্রম হয় অনেকেরই। এই রহস্যময় আলো বা দৃষ্টিভ্রমের জন্য কোনও প্রাকৃতিক ঘটনা দায়ী কিনা সে প্রমাণ এখনও মেলেনি, তবে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে ওই সূচালো, ডিম্বাকার আকৃতির খুলির অধিকারিনী কোনও ভিনগ্রহের বাসিন্দা নন। বরং কোনও প্রাচীন জনজাতির এক লড়াকু মহিলা।

ব্রোঞ্জ যুগের সমাধিক্ষেত্র খুঁড়ে মিলেছে সূচালো, ডিম্বাকার খুলির মহিলার কঙ্কাল

প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলছেন ওই লম্বাটে খুলির বয়স প্রায় ২০০০ বছর। গবেষক মারিয়া মাকুরোভার মতে, মনে করা হচ্ছে ওই মহিলা কোনও প্রাচীন জনজাতির। মনে করা হচ্ছে সরমতি জনজাতির কোনও যোদ্ধা মহিলার কঙ্কাল এটি। সরমতিয়ানরা খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ থেকে ৪০০ অব্দ পর্যন্ত ইউক্রেন, কাজাখাস্তান ও দক্ষিণ রাশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিল। যেমন বিচিত্র ছিল তাদের জীবনযাত্রা তেমনি রীতিরেওয়াজ।

সরমতি জনজাতির মহিলারা নিজেদের শরীরের নানা রকম বদল ঘটাতেন। এই জনজাতিতে লিঙ্গভেদ তেমন মাথাচাড়া দেয়নি। নারীরাও সমান তালেই যুদ্ধ করতেন পুরুষদের মতো, শরীরচর্চা করতেন, বলবৃদ্ধির নানা কায়দা রপ্ত করতেন। ইতিহাসবিদদের কথায়, সরমতি মহিলারা নিজেদের ডান স্তন পুড়িয়ে ফেলতেন। বিশ্বাস ছিল এমন করলে নাকি শিকার ও যুদ্ধ করার ক্ষমতা বাড়ে।

বিকৃত খুলি আসলে একটা রেওয়াজ

সরমতি জনজাতি

প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলছেন, সরমতিয়ানরা নানারকম জটিল ও বিচিত্র রীতি-রেওয়াজে অভ্যস্ত ছিল। মনে করা হয়, মহিলারা তাদের করোটির এমন বিকৃতি ঘটাতেন নিজে থেকেই। শিশু জন্মানোর পরেই মায়েরা সদ্যোজাতের মাথায় খুব কষে দড়ি বেঁধে দিতেন। তারপর মাথার একদিক টানটান করে সেই দড়ির পাক দেওয়া হত। প্রতিদিন ম্যাসাজ করতে করতে করোটির একপ্রান্ত লম্বা করার চেষ্টা চলত। এই প্রক্রিয়া শুরু হত শিশু জন্মাবার কিছুদিনের মধ্যেই, করোটির হাড় শক্ত হওয়ার আগেই।

শিশুর মাথায় দড়ি বেঁধে চলত খুলি বিকৃত করার রেওয়াজ

‘স্কাল মডিফিকেশন’-এর রেওয়াজ অবশ্য অনেক প্রাচীন জনজাতির মধ্যেই দেখা গেছে। মিশরের ফ্যারাওদের মধ্যেও এমন রীতি দেখা গেছে। পেরু, ফ্রান্স, আফ্রিকার কিছু অংশেও এমন লম্বাটে খুলির কঙ্কাল খুঁজে পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা।


আর্টিফিশিয়াল ক্র্যানিয়াল ডিফর্মেশন (এসিডি)

হুনদের মধ্যেও দেখা গেছে এমন খুলি-বিকৃত করার রীতি

আফ্রিকা, ইউরোপের অনেক জনজাতির মধ্যে দেখা গেছে এমন রেওয়াজ

৩০০ থেকে ৭০০ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপ জুড়ে বর্বর যাযাবার জাতি হুন ও গথদের মধ্যে সংঘর্ষ সে যুগের বিবর্তনের ইতিহাসের অনেক প্রমাণ দেয়। ইতিহাসবিদরা বলেন, হুনদের মধ্যেও এমন ‘স্কাল মডিফিকেশন’-এর রীতি ছিল। গবেষণা বলছে, একটা সময় এই আর্টিফিশিয়াল ক্র্যানিয়াল ডিফর্মেশন (এসিডি)-র বিকাশ হয় গোটা ইউরোপ জুড়ে। ইউরোপে কৃষ্ণসাগরের কাছাকাছি দেশগুলোয় এমন রীতি শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকে প্রায় সব লড়াকু উপজাতি গোষ্ঠীগুলিই রপ্ত করেছিল এই প্রথা। শিশুর মাথা শক্ত করে বেঁধে রেখে খুলির বিকৃতি ঘটানো হত, সে মহিলা হোক বা পুরুষ। ক্রোয়েশিয়া থেকে এমন বিকৃত খুলির কঙ্কাল আগেও খুঁড়ে বার করেছিলেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা। তবে রাশিয়ার আরকাইমে পাওয়া এই কঙ্কালের সঙ্গে তার বেশ কিছু ফারাক আছে। সেটা রীতির বদল নাকি অন্য কোনও কারণ সেটা স্পষ্ট নয়। আরও একটা বিষয়ে ধন্দে রয়েছে গবেষকরা। সেটা হল এমন বিকৃত করোটির কঙ্কালের অনুপাত বেশিরভাগই মহিলাদের। তার মানে এই রীতির প্রয়োগ কি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মহিলাদের উপরেই করা হত তার প্রমাণ এখনও মেলেনি।

আরও পড়ুন:

এক বাঙালি সৈনিকের অদম্য সাহসের কাহিনী, বিশ্বযুদ্ধে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন জার্মানির ৯টি যুদ্ধবিমান

Share.

Comments are closed.