Latest News

কংগ্রেসের শীর্ষ পদ থেকে কেন সরে যাচ্ছেন সনিয়া, রাহুলরা

অমল সরকার

অভাবনীয় কোনও পরিস্থিতি তৈরি না হলে ২২ বছর পর কংগ্রেসের শীর্ষ পদে গান্ধী পরিবারের বাইরের কোনও নেতা বসতে চলেছেন। রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলটেরই সেই পদে বসার সম্ভাবনা ষোলআনা বেশি (Congress President Election)। কিন্তু শত চেষ্টা করেও কেন ফের সভাপতি হতে রাজি করানো গেল না রাহুল গান্ধীকে (Rahul Gandhi)? সনিয়া গান্ধীই (Sonia Gandhi) সভাপতির চেয়ারে থেকে যেতে গররাজি কেন?

২০১৯-এর লোকসভা ভোটে বিপর্যয়ের দায় নিয়ে কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে সরে যান রাহুল গান্ধী। তখন অনেক অনুরোধ-উপরোধ করা সত্ত্বেও তিনি আর সভাপতি পদে থাকতে চাননি। অতঃপর সনিয়া গান্ধীকে অন্তবর্তী সভাপতি করে কাজ চালাচ্ছিল দল। এবার সাংগঠনিক নির্বাচনের প্রসঙ্গ আসতে ফের তৎপরতা তুঙ্গে ওঠে রাহুল গান্ধীকে সভাপতি করার।

শুধু দলীয় নির্বাচন বলেই নয়, ২০১৯-এর জুলাইয়ে রাহুল সভাপতির পদ ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে নানা অবকাশে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা তাঁকে ফের সভাপতি হওয়ার অনুরোধ করেছেন। তিনি রাজি হননি।

মাঝে ভোট কুশলী প্রশান্ত কিশোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন দু’জন কার্যনির্বাহী সভাপতি নিয়োগ করে অসুস্থ সনিয়াই থেকে যান কংগ্রেস সভাপতি। রাহুল গান্ধীকে করা হোক পার্লামেন্টারি বোর্ডের চেয়ারম্যান।

কংগ্রেস সেই প্রস্তাব মানেনি। উদয়পুরের চিন্তন শিবির থেকে এক ব্যক্তি এক পদ নীতি কঠোরভাবে মেনে চলার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু কংগ্রেস সভাপতি পদে থাকার মেয়াদ নির্দিষ্ট করা হয়নি। ফলে বাইশ বছর সভাপতি থাকা সনিয়া আরও কয়েক বছর ওই পদে থেকে গেলে কংগ্রেসের মহাভারত অশুদ্ধ হত না। বরং গোষ্ঠী নির্বিশেষে কংগ্রেস সম্ভবত এই সিদ্ধান্তে এক মতই হত। বিক্ষুব্ধ নেতারা রাহুল গান্ধীকে নিয়ে যতটা বিরক্ত, ততটা সনিয়াকে নিয়ে নয়। আর কংগ্রেস যতই ক্ষয়িষ্ণু পার্টি হোক না কেন, এখনও এই দলের সভাপতির পদ দেশের গুটি কয়েক সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক পদের পরেই সবচেয়ে মর্যাদার এবং ওজনদার।

একটা কথা ঠিক, কংগ্রেস মানে গান্ধী পরিবার—বিজেপির এই লাগাতার প্রচার খর্ব করতে সনিয়া, রাহুলরা শীর্ষ পদে আর থাকতে চান না। এতে বিজেপির প্রচারের ধার কমবে, তাতেও কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু ওই প্রচারের কারণেই গান্ধী পরিবার নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে, এটাই একমাত্র অন্যতম বিষয় নয়। কারণ, বিজেপির ওই প্রচার নতুন নয়। আর বামপন্থীরা বাদে ভারতে এমন কোনও দল নেই যারা পরিবারতন্ত্রের দোষ থেকে মুক্ত। এমনকী কোনও কোনও রাজ্যে, জেলায় এই অভিযোগ বিজেপির নেতা-নেত্রীদের নিয়েও আছে।

কিন্তু সনিয়া, রাহুল, প্রিয়াঙ্কারা সম্ভবত ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিণতির কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্তে অটল যে তাঁরা কংগ্রেসে থাকবেন, কিন্তু শীর্ষ পদ আঁকড়ে থাকবেন না। এই ভবিষ্যৎ পরিণতিটি হল, কংগ্রেস সভাপতি পদে সনিয়া ও রাহুলের বিগত আট বছরের কার্যধারা।

এই সময়কালের মধ্যে জাতীয় ও রাজ্য পর্যায় মিলিয়ে কংগ্রেসের প্রথম সারির প্রায় আড়াই’শ নেতা-নেত্রী দল ছেড়ে গিয়েছেন। যারা নেহাৎ শুধু নেতা নন, কংগ্রেস পরম্পরার ধারক ছিলেন। তাঁরা যেদিকে, অনুগামীরা সেই দিকে। একথা যেমন জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার ক্ষেত্রে সত্যি, তেমনই সত্যি জিতিন প্রসাদ, গুলাম নবি আজাদ, ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিংয়ের ক্ষেত্রে।

এই সময়কালের মধ্যে কংগ্রেস ২০১৪ এবং ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে পর্যুদস্ত হয়েছে। লোকসভায় বিরোধী দলের মর্যাদাটুকু পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেনি। নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দেশে সব মিলিয়ে ৪৯টি রাজ্য বিধানসভা ভোট হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, পাঞ্জাব, গোয়া, ইত্যাদি একাধিক রাজ্য আছে যেখানে এই সময়কালের মধ্যে বিধানসভার ভোট হয়েছে দু’বার। এই ৪৯টি বিধানসভা ভোটের মধ্যে কংগ্রেস জিতেছে মাত্র চারটিতে।

অ-গান্ধী সভাপতি ও কংগ্রেসের লাভ-লোকসান

এই সময়কালের মধ্যে কংগ্রেসের ভাগে থাকা ভোটের অবস্থা কেমন? সনিয়া গান্ধী কংগ্রেস সভাপতি হন ১৯৯৮ সালে। সে বছর লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস আসন পেয়েছিল ১৪১টি। প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ছিল ২৫.৮ শতাংশ। ২০০৯-এর লোকসভা ভোটে তা বেড়ে হয়েছিল ২০৬টি। প্রাপ্ত ভোট ২৮.৬ শতাংশ। ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে আসন কমে হয় ৪৪। ভোট কমে হয় ১৯ শতাংশের সামান্য বেশি। ২০১৯-এ কংগ্রেসের আসন বেড়ে হয়েছে ৫২। ভোটও বেড়েছে সামান্য। এখন লোকসভা এবং রাজ্যসভা মিলিয়ে ৭৯৩টি আসনের মধ্যে কংগ্রেসের ভাগে আছে মাত্র ৮৪ আসন। অথচ, ১৯৮৪ সালে শুধু লোকসভাতেই হাত চিহ্নের সাংসদ ছিলেন ৪০০জন। আজ এই সব পরিসংখ্যান অবিশ্বাস্য মনে হবে।

বিধানসভাগুলিতেও কংগ্রেসের একই দুর্দশা। দেশের বিধানসভাগুলিতে কংগ্রেসের বিধায়ক আছেন ৬৯৫জন। সেখানে বিজেপির বিধায়ক ১৩৮৩। ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে পদ্মশিবির ৩৮ শতাংশের সামান্য বেশি ভোট পেয়েছে। কংগ্রেস আটকে আছে ১৯-২০ শতাংশেই।

কিন্তু আসন বা ভোট কমে যাওয়াই একটি দলের শেষ হয়ে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে না। জরুরি অবস্থার জেরে ১৯৭৭ সালের লোকসভা ভোটে মুখ থুবড়ে পড়া কংগ্রেস সেই ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বেই ১৯৮০-র নির্বাচনে দিল্লির কুর্সি দখল করে।

হালে ঘরের কাছে বিহারে চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছে। ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে সেখানে লালুপ্রসাদের রাষ্ট্রীয় জনতা দল একটি আসনও পায়নি। পরের বছর বিধানসভা ভোটে তারাই হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল।

আসলে সনিয়া ও রাহুল গান্ধীরা আর কংগ্রেসের মাথায় থাকতে চাইছেন না মোদী জমানার রাজনীতির ব্যর্থতার দায় থেকে নিজেদেরকে মুক্ত রাখতে। নরেন্দ্র মোদী বিগত আট বছরে ভারতীয় রাজনীতির ডিএনএ বদলে দিয়েছেন। আদালত মন্দির-মসজিদ বিধান মীমাংসা করে দেওয়ার পর অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে মন্দির রাজনীতি সব দলকেই গ্রাস করেছে।

সংখ্যালঘু সমাজের উপর আক্রমণ বেড়েছে। তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ধর্মীয় বিভাজন, ঘৃণা, বিদ্বেষ সব নজির ছাপিয়ে গিয়েছে। আবার সংখ্যালঘুদের ভীত-সন্ত্রস্ততার সুযোগ নিয়ে তাদের কাছে টানার চেষ্টাও শুরু করেছে গেরুয়া শিবির।

পাশাপাশি নরেন্দ্র মোদীর সরকার বিজেপির ঘোষিত কর্মসূচির বেশিরভাগই কার্যকর করেছে কার্যত বিনা বাধায়। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রক্ষার ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল হয়েছে। তিন তালাক নিষিদ্ধ করার আইন বলবৎ করে অভিন্ন দেওয়ানি বিধিও আংশিক বলবৎ করেছে তারা। কিন্তু কংগ্রেস মাঠে-ময়দানে কোনও প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তোলার তেমন চেষ্টা করেনি। হাল ছেড়ে দিয়ে বসেছিল।

আর নরেন্দ্র মোদীর এই সাফল্য এসেছে সেই সময় যখন প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এবং সেই দলের মাথায় কখনও সনিয়া, কখনও রাহুল। ২০২৪-এ মোদী ফের ক্ষমতায় এলে বিজেপির বাকি প্রতিশ্রুতি পালন এমনকী সংবিধান বদলে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণার পথে এগনোও অসম্ভব নয়। দেশে রাষ্ট্রপতি কেন্দ্রীক শাসন ব্যবস্থা কায়েমের আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউ কেউ।

এই পরিস্থিতি বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদীর জমানায় কংগ্রেসের অসাফল্যের তালিকা আর বড় করতে চান না গান্ধী পরিবারের মা ও ছেলে। কারণ, ভবিষ্যতে মোদীর সাফল্য নিয়ে আলোচনায় প্রধান বিরোধী দলের ব্যর্থতাও সমান প্রাধান্য পাবে। নিজেদের দায়ও আর বাড়াতে চান না সনিয়া-রাহুল। তাই ২২ বছর পর কংগ্রেস অ-গান্ধী সভাপতি পেতে চলেছে। ধারাবাহিক ব্যর্থতার দায় তাঁর উপরও বর্তাবে। যদি না সূর্য পশ্চিমে উদয় হওয়ার মতো অবস্থা না হয়।

সনিয়ার চেয়ারে অ-গান্ধী, অবশ্যই দলিত মুখ, বাঁচাতে পারে কংগ্রেসকে

You might also like