Latest News

নূপুরে নীরব, জুবেইরকে জেলে

করোনার কড়াকড়ি কমতেই ফের আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর শুরু করেছেন। সম্প্রতি জার্মানিতে গিয়ে তিনি প্রবাসী ভারতীয়দের সম্মেলনে বলেন, ইন্দিরা গান্ধীর আমলে জারি হওয়া জরুরি অবস্থা ভারতীয় গণতন্ত্রের ‘ডার্ক স্পট’। অর্থাৎ কলঙ্কচিহ্ন। (Prophet Debate)

কেন কলঙ্কচিহ্ন?

কারণ ওই সময় বিরোধীদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কেউ ইন্দিরা গান্ধীর সমালোচনা করলেই তাকে জেলে পুরে দেওয়া হত।

গণতন্ত্রে সরকারের সমালোচনা করার অধিকার দেওয়া হয়। সরকারের নিন্দা করার অধিকার কেড়ে নেওয়া মানে গণতন্ত্র কেড়ে নেওয়া।

মোদী (Narendra Modi) যখন ইন্দিরা আমলের স্বৈরাচার নিয়ে বিদেশের মাটিতে সরব হচ্ছেন, তখন তাঁর দেশের অবস্থা কীরকম?

১৯৭৫ সালের ২৫ জুন ভারতে এমার্জেন্সি জারি হয়েছিল। ২০২২ সালে ঠিক ওই দিনটিতেই দিল্লি পুলিশ সমাজকর্মী তিস্তা সেতলাবাদকে গ্রেফতার করে। তাঁর বিরুদ্ধে দেশের সচেতন নাগরিকদের বড় অংশ প্রতিবাদ জানান।

প্রতিবাদের রেশ মেলানোর আগেই দিল্লি পুলিশ সাংবাদিক মহম্মদ জুবেইরকে (Mohammad Jubair) গ্রেফতার করেছে। জুবেইর এবং আর এক সাংবাদিক প্রতীক সিনহা ‘অলট নিউজ’ নামে একটি ওয়েব সাইট চালান। তাঁদের ঘোষিত উদ্দেশ্য, সংবাদকে কর্পোরেট ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করা। মূলস্রোতের মিডিয়ায় যে সংবাদগুলি প্রকাশিত হয়, তার সত্যতা যাচাই করা।

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালানোর জন্য বিজেপির এক বিশাল বাহিনী আছে। তারা নিয়মিত হাজার হাজার উস্কানিমূলক পোস্ট করে। তার ফলে নানা জায়গায় অশান্তি, দাঙ্গাহাঙ্গামাও সৃষ্টি হয়। বর্তমানে মূলস্রোতের মিডিয়াতে সংবাদ বলে যা প্রকাশিত হয়, তার বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। বিদেশে মিডিয়ার ওপরে নজরদারি চালানোর জন্য নানা সংগঠন আছে। ভারতে অলট নিউজের মতো সাইট সেই কাজটিই করে থাকে। তারা শুধু বিজেপি নয়, অল্ট নিউজ সব দলের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সরব।

নিন্দা করতে এত দেরি কেন

২০১৮ সালে করা একটি টুইটের জন্য জুবেইরকে গ্রেফতার করা হয়। যদিও চার বছর আগের ওই টুইট নিয়ে কোথাও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল বা দাঙ্গাহাঙ্গামা ছড়িয়ে পড়েছিল বলে খবর নেই। কিন্তু কিছুদিন আগে নূপুর শর্মার (Nupur Sharma) মন্তব্য ঘিরে দেশের নানা প্রান্তে বিক্ষোভ ও অশান্তি হয়েছিল। তাতে প্রাণহানিও ঘটেছে।

বিজেপির মুখপাত্র নূপুর একটি সর্বভারতীয় নিউজ চ্যানেলে বসে ইসলামের নবী সম্পর্কে আপত্তিকর কথা বলেন। তার ফলে দেশের অভ্যন্তরে তো বটেই, আন্তর্জাতিক স্তরেও ক্ষোভ-বিক্ষোভ দেখা দেয়। আরব দুনিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার উপক্রম হয়। এত কিছুর পরেও নূপুর শর্মাকে পুলিশ কিছু বলেনি। উল্টে পুলিশ তাঁকে দেহরক্ষী দিয়েছে। মহারাষ্ট্রে তাঁর নামে একটি মামলা হয়েছিল। কিন্তু ওই রাজ্যের পুলিশ তাঁকে ধরতে পারেনি। কারণ তাঁর ‘খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না’।

মহম্মদ জুবেইর কখনও আত্মগোপন করেননি। ২০২০ সালের একটি মামলায় সোমবার দিল্লি পুলিশ তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছিল। ওই মামলায় আদালত ইতিমধ্যে তাঁকে সুরক্ষা দিয়েছে। কিন্তু পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করেছে অপর একটি অভিযোগের ভিত্তিতে। তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর করেছিলেন দিল্লি পুলিশের সাব ইনসপেক্টর অরুণ কুমার। অভিযোগ, জুবেইর হিন্দুদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত দিয়েছেন। এর ফলে শান্তি বিঘ্নিত হতে পারে।

ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত লাগার ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে। কীসে কার ভাবাবেগে আঘাত লাগবে আগে থেকে বলা মুশকিল। অনেকেরই মনে হচ্ছে, জুবেইর যে টুইট করেছিলেন, তা নিরীহ রসিকতা মাত্র। কিন্তু দিল্লি পুলিশের চার বছর পর মনে হয়েছে ওই টুইটের বিপদ কাটেনি। বিপদ হতেও পারে।

কিন্তু একটা কথা সত্যি যে, আইন সবসময় জনতার সেন্টিমেন্টকে গুরুত্ব দেয় না। সে চলে তার নিজস্ব পথে। সেজন্য অনেক সময় আইনকে মনে হয় নিষ্ঠুর। কিন্তু আইন যদি কারও ভাবাবেগের দ্বারা প্রভাবিত হয়, তা হলেই মুশকিল।

তিস্তা সেতলবাদের ক্ষেত্রেও মনে হয়, সরকার তাঁকে গ্রেফতার করার জন্য মুখিয়ে ছিল। ক্রোনোলজি অর্থাৎ ঘটনাক্রম থেকে ব্যাপারটা স্পষ্ট।

২৪ জুন, শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, গুজরাত দাঙ্গায় নরেন্দ্র মোদী জড়িত ছিলেন বলে প্রমাণ নেই। এ সম্পর্কে তদন্ত করার জন্য যে স্পেশাল ইনভেস্টিগেটিং টিম গঠন করা হয়েছিল, তারা মোদীর বিরুদ্ধে কিছু পায়নি। ২৫ জুন এক পুলিশকর্মী সুপ্রিম কোর্টের রায় উল্লেখ করে প্রাক্তন পুলিশকর্তা আর বি শ্রীকুমার এবং তিস্তা সেতলবাদের বিরুদ্ধে এফআইআর করেন। প্রায় একই সময়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংবাদ সংস্থাকে সাক্ষাৎকারে বলেন, এক এনজিও কর্ত্রী ক্রমাগত গুজরাতের বিজেপি কর্মীদের নামে অভিযোগ করে চলেছেন।

অমিত শাহের সাক্ষাৎকারের কয়েক ঘণ্টা পরেই গুজরাত পুলিশের অ্যান্টি টেরর স্কোয়াড মুম্বইতে তিস্তার বাড়িতে হানা দেয়। তিস্তার অভিযোগ, ওয়ারেন্ট ছাড়াই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাড়ির মধ্যে পুলিশ তাঁকে হেনস্থা করেছিল। শনিবার বিকালে গান্ধীনগর থেকে শ্রীকুমারকে গ্রেফতার করা হয়। দু’জনের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগ গুরুতর। এফআইআরে লেখা হয়েছে, তাঁরা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, জালিয়াতি ও আরও নানা ধরনের অপরাধে জড়িত ছিলেন।
আর বি শ্রীকুমার বহুদিন ধরেই গুজরাত দাঙ্গায় মোদী সরকারের ভূমিকা নিয়ে সরব ছিলেন। তিস্তা দাঁড়িয়েছিলেন জাকিয়া জাফরির পাশে। ২০০২ সালে গুজরাত দাঙ্গার সময় প্রাক্তন কংগ্রেস সাংসদ এহসান জাফরি ও আরও ৬৮ জন আমেদাবাদের চমনপুরা অঞ্চলে খুন হন। এহসান জাফরির বিধবা স্ত্রী জাকিয়া জাফরি সুবিচারের আশায় ২০০৬ সাল থেকে লড়াই করছেন। তাঁর দাবি, ওই হত্যাকাণ্ডে গুজরাতের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মোদী ও তাঁর প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা যুক্ত ছিলেন।

জাকিয়া যাতে স্বামীর খুনের সুবিচার চেয়ে লড়াই চালাতে পারেন, সেজন্য তিস্তা তাঁকে সাহায্য করতেন। মনে হচ্ছে, পুলিশ তাঁকে গ্রেফতারের জন্য ওত পেতে ছিল। তারা লক্ষ্য রাখছিল যাতে কোর্টের রায়ে কোনও ফাঁকফোকর পেলেই তিস্তাকে জেলে পোরা যায়।

মোদী একদিকে জরুরি অবস্থার সময়কার বাড়াবাড়ি নিয়ে সরব হচ্ছেন, অন্যদিকে তাঁর সরকার একের পর এক প্রতিবাদীকে গ্রেফতার করছে। কথায় ও কাজে সরকারের দ্বিচারিতা এখন স্পষ্ট।

অগ্নিপথের প্রশ্নগুলি

You might also like