Latest News

আতঙ্কের অপর নাম ইডি, কোন অস্ত্রে নেতাদের ঘুম কেড়েছে এই তদন্তকারী সংস্থা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির মামলায় সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। সেই সূত্রে সিবিআই পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কিন্তু হেফাজতে নেয়নি। একমাস আগে তদন্ত শুরু করে শনিবার পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে গ্রেফতার (Partha Chatterjee) করে হইচই ফেলে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের আর এক তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। বাংলায় দুর্নীতির তদন্তে প্রচারের আলো এখন ওই সংস্থার উপরে।

মাস খানেক আগেই তৃণমূল নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমের কাছে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘আমার পার্টির ২০০ লোক ইডি-সিবিআইয়ের নোটিস পেয়েছে।’ সেদিন সিজিও কমপ্লেক্সে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী রুজিরাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ইডি।

শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, ইডি-সিবিআই গোটা দেশেই বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে, এমনটাই অভিযোগ বিভিন্ন দলের। ন্যাশনাল হেরাল্ড মামলায় আগামীকাল সোমবার কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গান্ধীকে ফের তলব করেছে ইডি। একই মামলায় গতমাসে তারা রাহুল গান্ধীকে টানা পাঁচদিন জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। সনিয়া, রাহুলদের আগে অন্য একটি মামলায় প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর স্বামী রবার্ট ভদ্রাকেও ইডি জেরা করেছে। তাঁকে সব মিলিয়ে সাতবার ইডি দফতরে হাজিরা দিতে হয়।

দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আশঙ্কা অচিরেই তাঁর উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়াকে ইডি-সিবিআই গ্রেফতার করতে পারে। যদিও সরকারের মদ নীতি ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় দিল্লির উপ-রাজ্যপাল সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ থাকায় তদন্তে ইডির ঢুকে পড়া অসম্ভব নয়। গত মাসে এই তদন্তকারী সংস্থা দিল্লির স্বাস্থ্যমন্ত্রী সত্যেন্দ্র জৈনকে গ্রেফতার করে জেলে পুরেছে।

বাংলায় ইডির মামলায় উল্লেখযোগ্য নাম হল তৃণমূল সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এছাড়া, সারদা ও নারদ মামলায় অভিযুক্তদের অনেকের বিরুদ্ধেই তদন্ত চালাচ্ছে ইডি। হালে জম্মু-কাশ্মীরের দুই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ ও তাঁর পুত্র ওমরকে তলব করে এই এজেন্সি। মহারাষ্ট্রে এনসিপি-র দুই মন্ত্রী অনিল দেশমুখ ও নবাব মালিক ছাড়াও ওই দলের নেতা উপমুখ্যমন্ত্রী তথা শরদ পাওয়ারের ভাইপো অজিত পাওয়ারের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছে ইডি। শিবসেনার গুরুত্বপূর্ণ নেতা সঞ্জয় রাউত এবং তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে ইডি অনেক দিন ধরে তদন্ত চালাচ্ছিল। সম্প্রতি তাদের কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে এই তদন্তকারী সংস্থা। ইডির পুরনো মামলায় আদালতে হাজির হতে বলা হয়েছে কর্নাটক প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ডি শিবকুমারকে। সব মিলিয়ে ইডি এখন এক আতঙ্কের নাম। বিশেষ করে নেতাদের জন্য তো বটেই। এক নেতার কথায়, এই তদন্তকারী সংস্থার পক্ষে নেতাদের টার্গেট করা সহজ। কারণ, অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন বলতে গেলে রাজনীতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই সংস্থার সবচেয়ে বড় অস্ত্রটি হল বেআইনি লেনদেন প্রতিরোধ আইনটিই। নেতারা এখন সিবিআইয়ের থেকে ইডিকে অনেক বেশি ভয় পায়।

ইডি (ED) কি নতুন কোনও প্রতিষ্ঠান?

না। ইডি অর্থাৎ এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের জন্ম ১৯৫৭ সালে। অর্থাৎ স্বাধীনতা প্রাপ্তির দশ বছরের মাথায়। অর্থমন্ত্রকের রাজস্ব বিভাগের অধীনে ইডি তৈরি করা হয়েছিল দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার মজবুত করা এবং আয়কর এবং অন্যান্য খাতে রাজস্ব ফাঁকি আটকাতে।

তাহলে ইদানীং ইডি এত সক্রিয় কীভাবে?

১৯৫৭ সালে যাত্রা শুরু করলেও আর পাঁচটা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার থেকে ইডি পিছিয়ে ছিল আইনি প্রতিবন্ধকতার কারণে। যে আইনগুলিকে হাতিয়ার করে তারা শুরুতে যাত্রা শুরু করেছিল সেগুলির দ্বারা বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত অনিয়ম আটকানো সহজ ছিল। কিন্তু দেশের মধ্যে বেআইনিভাবে অর্থ উপার্জন বা লেনদেন আটকানোর কোনও আইনি ক্ষমতা ছিল না। আয়কর দফতর আয়কর ফাঁকি সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্ত করে। তারা আয়ের উৎস নিয়ে মাথা ঘামায় না। কেউ বেআইনি পথে উপার্জন করলেও আয়কর দিয়ে দিলেই সাতখুন মাফ করে দেয় ওই বিভাগ। ইডিও আয়কর এবং কাস্টমস আইনে পদক্ষেপ করে থাকে। এছাড়া তাদের প্রধান আইনটি ছিল ফরেন এক্সচেঞ্জ মেইন্টেন্যান্স অ্যাক্ট।

ইডি’র নয়া নখ-দাঁত—পিএমএলএ প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট বা বেআইনি উপায়ে অর্থ লেনদেন আইন, ২০২২ তৈরি করেছিল অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার। তখন আইনটি তারপরও কার্যকর করা যায়নি বেশ কিছু খামতির কারণে।

পিএমএলএ-কে প্রাণ দিলেন চিদম্বরম

আইনটি এনডিএ জমানায় সংসদে পাশ হলেও সেটি ২০০৫-এর ১ জুলাই থেকে দেশে কার্যকর করেন পি চিদম্বরম। তিনিই ছিলেন তৎকালীন ইউপিএ সরকারের অর্থমন্ত্রী। তার আগে আইনটির কয়েকটি ধারা সংসদে বিল এলে সংশোধনও করেন তিনি। সংশোধনীগুলির একটি ছিল আইনটি কার্যকর করতে নতুন কোনও ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে না। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট এই আইন বলে পদক্ষেপ করতে পারবে। তাঁর এই প্রস্তাবে তুমুলভাবে সমর্থন জোগায় সিপিএম। দলের লোকসভার দলনেতা বাসুদেব আচারিয়া দৃষ্টান্ত দিয়ে দেখান কীভাবে বেআইনি পথে আর্থিক লেনদেন হচ্ছে। তিনি উগ্রপন্থী কার্যকলাপ, মাদক চোরাচালালেও আর্থিক লেনদেনের সমস্যার কথা তোলেন সংসদের বিতর্কে। কংগ্রেস নেতা প্রয়াত প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি তখন কেন্দ্রের জলসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী। তিনি ‘মন্দির মানি’ বেআইনি করার কথা বলেন। বাসুদেব আচারিয়াও মন্দির নির্মাণের নামে গোপনে টাকা তোলা এবং লেনদেনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

চিদম্বরমকেও তাড়া করেছে সেই পিএমএলএ

কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন প্রথম ইউপিএ সরকারের অর্থমন্ত্রী থাকাকালে পি চিদম্বরম মিডিয়া সংস্থা আইএনএক্স-এর বিদেশে বিনিয়োগ সংক্রান্ত ছাড়পত্র দিয়েছিলেন। বিনিময়ে তাঁর পুত্র কার্তি চিদম্বরম ঘুষ নিয়েছেন বলে অভিযোগ। সেই অভিযোগের তদন্ত করছে ইডি। তারা পিএমএলএ বা বেআইনি অর্থ লেনদেন প্রতিরোধ আইনে মামলা ঠুকেছে। ওই মামলায় চিদম্বরম এবং কার্তি উভয়ের বিরুদ্ধেই তদন্ত চালাচ্ছে ইডি। ওই মামলায় এক দফা জেল খেটে এসেছেন চিদম্বরম। আপাতত তিনি জামিনে মুক্ত।

সিবিআই, এনআইএ এবং ইডি—কোনটি সবচেয়ে শক্তিশালী

প্রশাসনিক আধিকারিকদের মতে, পিএমএলএ বা বেআইনি পথে অর্থ লেনদেন প্রতিরোধ আইন ২০০২-এর সুবাদে ইডি এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। এই আইনে ইডির সবচেয়ে বড় সুবিধা হয়েছে দুটি। এক. সিবিআইয়ের মতো ইডি-কে সরকার বা আদালত, কারও কাছ থেকেই মামলা হাতে নিতে অনুমতি নিতে হয় না। দিল্লি পুলিশ আইনে তৈরি সিবিআইয়ের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ, রাজ্য সরকারের অনুরোধ এবং আদালতের রায় ছাড়া কোনও মামলা গ্রহণের সুযোগ নেই। পশ্চিমবঙ্গ, পাঞ্জাব, কেরল, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড, ছত্তীসগড়, রাজস্থান, মিজোরাম—এই আট রাজ্য আবার সিবিআই-কে সাধারণ অনুমতি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে আদালতের নির্দেশ ছাড়া এই আট রাজ্যে তারা তদন্ত করতে পারে না।

অন্যদিকে, এনআইএ বা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি শুধুমাত্র উগ্রপন্থী কার্যকলাপ এবং রাষ্ট্র বিরোধী নাশকতামূলক অপরাধের তদন্ত করতে পারে। কিন্তু পিএমএলএ-কে হাতিয়ার করে ইডি যে কোনও ধরনের মামলায় ঢুকে পড়তে পারে। ফলে সিবিআই, ইডির হাতে থাকা মামলাও তাদের তদন্তের আওতায় চলে আসে।

আরও একটি কারণে ইডি অনেক বেশি ভয়ঙ্কর, বিশেষ করে রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের কাছে। তারা আদালতের অনুমতি ছাড়াই অভিযুক্তের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারে। এই আইনি ক্ষমতা অন্য এজেন্সিগুলির নেই। তাদের আদালতের অনুমতি নিয়ে এগোতে হয়।

ইডির তৃতীয় ক্ষমতা হল, তল্লাশি অভিযানের জন্যও তাদের সরকার বা আদালতের অনুমতি নিতে হয় না। যে কোনও জায়গায় যে কোনও সময় তল্লাশি করার অধিকার আছে তাদের। যে কারণে, ২০০৫-এ এই আইনে ইডি কাজ শুরুর পর বিভিন্ন মামলায় ৩ হাজার ৮৬ বার তল্লাশি করেছে। আর মামলা দায়ের করেছে ৪ হাজার ৯৬৪টি। এর মধ্যে অনেকগুলিতেই মূল মামলা সিবিআই, এনআইএ, আয়কর, এমনকী বিভিন্ন রাজ্য সরকারের সিআইডি, আইবি-র। বেআইনিভাবে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ থাকায় তদন্ত ইডিও করছে।

যেমন বাংলার শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি। মূল তদন্তকারী সংস্থা হল সিবিআই। তারা দেখছে কীভাবে দুর্নীতি হয়েছে। কারা কারা যুক্ত। অভিযোগ, শিক্ষক-অশিক্ষক পদে বেআইনিভাবে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে মোটা টাকার বিনিময়ে। আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি দেখছে ইডি।

রাজস্ব বিভাগের এক কর্তার কথায়, ইডি-কে নিয়ে নেতা-মন্ত্রী-ব্যবসায়ী-শিল্পপতি মহল অনেক বেশি চিন্তিত কারণ, তারা যখন তখন অভিযান, তল্লাশি চালাতে এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নিতে পারে।

আরও পড়ুন: মন্ত্রী গ্রেফতার, অতঃপর…

You might also like