Latest News

মতান্তর হয়েছে, রেগে গিয়েছি, আবার ভালও বেসেছি সুভাষদাকে

বাইচুং ভুটিয়া

 

সুভাষ ভৌমিক আমাদের কাছে ছিলেন ‘ফাদার ফিগার’। বাড়িতে বাবা-মা যেমন শাসন করেন, আবার বেগড়বাই করলে বকাঝকা করেন। আমাদের ফুটবলারদের কাছে সুভাষদা তেমনই ছিলেন। সবসময় আমাদের আগলে রাখতেন।

কত সব স্মৃতি মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সকালে প্র্যাকটিস শেষ করে বাড়ি ফিরব, দেখি গাড়ির চাবি লুকিয়ে রেখেছেন সুভাষদা। প্রথমে বুঝতে দেননি, তারপর ডাকছেন, ‘‘হ্যাঁ, রে বাইচুং কোথা দিয়ে বাড়ি ফিরবে রে? আমাকে একটু ড্রপ করে দিস তো।’’ জানেন, আমি চাবি খুঁজতে গেলেই পাব না, তারপর আবার রসিকতা করে বলবেন, ‘‘ঠিক আছে, দরকার নেই, তুই যা বেরিয়ে পড়।’’

সুভাষদা-র ম্যান ম্যানেজমেন্ট দারুণ ছিল, এটা সকলের কাছে শিক্ষনীয়। জানতেন কোন দেবতা কিসে সন্তষ্ট। সুভাষদা-র বড় গুণ ছিল, তিনি সোজাসাপটা কথা বলতে পারতেন। তাতে অনেকেই রেগে যেত, আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। কিন্তু পরে বুঝেছি তিনি আমাদের ভালর জন্যই বলছেন, সেইসময় রাগ জল হয়ে গিয়ে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আসত, তাঁকে ভালও বেসেছি।

হয়তো বলতেন, বাইচুং তুই শেষ, তোকে বিপক্ষ দল ধরে ফেলেছে। একটা ফুটবলারের কোথায় আঘাত করলে তার থেকে সেরা ফুটবলটা বেরবে, তিনি জানতেন। স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট নিয়ে রীতিমতো পড়াশুনো করতেন তিনি। রাত জেগে খেলা দেখতেন বিদেশী লিগের।

একবার একটা পর্যায়ে, ম্যাচে শেষ দশ মিনিটের জন্য নামাতেন দীপেন্দুকে। একদিন দীপেন্দু রেগে কাঁই, বলে যে, আপনি আমার ফুটবল কেরিয়ার শেষ করে দিচ্ছেন। কোচিতে এফসি কোচি ম্যাচে দীপেন্দুকে বললেন সুভাষ দা, ‘‘আজও তোকে শেষ ১০ মিনিটের জন্য নামাব, আর তুই গোল করে আমাদের জেতাবি।’’

করেছিলেনও তাই, দীপু মাঠে নেমেই গোল করেছিল। শেষে ড্রেসিংরুমে ফিরে সুভাষদা-কে জড়িয়ে কী কেঁদেছিল দীপু। আমার ক্ষেত্রেও নানা কৌশল নিতেন, কোনওসময় পছন্দ হতো না, আবার কোনওসময় ওই ছকেই বাজিমাত করে যেতেন তিনি।

আমাদের কাছে আসিয়ান কাপে সুভাষদা-র ট্যাকটিক্স সবদিক থেকে সেরা। ওই টুর্নামেন্টে নিজেকে ছাপিয়ে গিয়েছিলেন কোচ হিসেবে। বিপক্ষ দলগুলি আমাদের থেকে ভাল ছিল, কিন্তু তিনি নিজে যেহেতু বড় ফুটবলার ছিলেন, জানতেন মানসিকতা দিয়ে কিভাবে ম্যাচ বের করতে হয়।

বেশ মনে রয়েছে, বেক তেরো সাসানার বিপক্ষে চাইম্যানকে রোখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন ছোটখাটো ষষ্ঠী দুলেকে। আগেরদিন রাতে ষষ্ঠী বায়না ধরল, ‘‘সুভাষদা আমি অনেকদিন ভাত খাইনি, আমাকে ভাত দিতে হবে, তা হলে আমি তাইম্যানকে আটকে দেব।’’ তারপর তো ষষ্ঠীকে ভাত খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছিলেন জাকার্তায়। সফলও হয়েছিল মাঠে, ষষ্ঠীর সেই কথা তো ইতিহাস হয়ে রয়েছে, ‘‘ইউ আর চাইম্যান, আই অ্যাম ইন্ডিয়ান চাইম্যান’’, বলেই পা থেকে বল কেড়ে নিয়েছিল ওই স্ট্রাইকারের!

এগুলি সম্ভব হয়েছিল কোচ সুভাষ ভৌমিকের জন্য। যিনি দলের ভালর জন্য কর্তাদের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়াতেন। কিন্তু হার মানতেন না, নিজের প্রাপ্যটুকু বুঝে নিতেন। আলভিটোকে দিনের পর দিন নিজের নিউ আলিপুরের বাড়িতে রেখে সুস্থ করে তুলেছিলেন। আলভিটো সেইসময় ফর্মেই ছিল না। আমি দেখেছি সুভাষ চক্রবর্তীকে ফুটবলার হিসেবে কোন স্তরে তুলে এনেছিলেন তিনি। সুভাষকে খেলা শেষেও বাড়তি ট্রেনিং দিতেন।

এরকম মানুষ খুব কম আসে খেলার মাঠে, আকাশের দেশে ভাল থেকো সুভাষদা, তোমায় আমরা সবাই খুব মিস করব।

 

 

 

You might also like