Latest News

Ukraine: ২২৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে মারিউপোল থেকে নিরাপদ শহরে এলেন বৃদ্ধ! সঙ্গী পোষ্য কুকুর

দ্য ওয়াল ব্যুরো: তিনি যেন অদৃশ্য এক মানুষ। বা ভূত। তাঁর দেহ নেই। কেউ যেন দেখতেই পায়নি তাঁকে। তা নইলে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ২২৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে পার করা যায়! তাও আবার সঙ্গে একটি ট্রলিব্যাগ এবং একটি কুকুর নিয়ে! ইউক্রেনের (Ukraine) মারিউপোলের বাসিন্দা, ৬১ বছরের ইগর পেডিন এমনটাই ঘটিয়েছেন। রুশ সেনা অধিকৃত, অবরুদ্ধ বন্দর শহর মারিউপোল থেকে পৌঁছেছেন ইউক্রেনীয়-নিয়ন্ত্রিত শহর জাপোরিঝিয়া-তে! সঙ্গী ৯ বছর বয়সি মংরেল টেরিয়ার প্রজাতির এক কুকুর, ঝুঝু।

যুদ্ধের ট্যাঙ্কার, সাঁজোয়া গাড়ি, অস্ত্রধারী রুশ সৈন্যদের ভিড়ে ছেয়ে গেছিল মারিউপোল। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ঘোষণাও করেন সে শহর অধিগ্রহণের কথা। এমনই অবস্থায় প্রাণ বাঁচাতে রওনা দেন ইগর পেডিন। পোষ্য ঝুঝুকেই বা কীভাবে ছেড়ে আসেন, তাই সঙ্গী করে নেন তাকেও। পথ বড় সহজ ছিল না। পদে পদে মৃত্যুভয়, ধরা পড়ার ভয়, নানা রকম বিপদ। কিন্তু প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর বুদ্ধিমত্তার জেরে সে সবই পার করা সম্ভব হয়েছে।

পেডিন পেশায় জাহাজের একজন প্রাক্তন বাবুর্চি। জীবনে কোনও দিন তেমন কোনও অ্যাডভেঞ্চারের পথে পা রাখেননি। তেমন অনিশ্চয়তাও ছিল না জীবনে। কোনও দিন ভাবতে পারেননি, এই বয়সে পৌঁছে এমন কঠিন দিন আসবে তাঁর জীবনে। তাঁর এই যাত্রার অভিজ্ঞতা শুনলে চমকে উঠতে হয়। এমনও একটা সময় এসেছে, তিনি রুশ সেনাদের চেকপোস্ট গিয়ে পৌঁছন। নিজের গল্প করেন সেই শত্রুসেনাদের সঙ্গেই। তাঁরা সব শুনে শুভেচ্ছা জানিয়ে এগিয়ে দেন পেডিনকে! তাই শত যন্ত্রণার পরেও সব মিলিয়ে নিজেকে ‘সৌভাগ্যবান’ বলছেন তিনি।

তারিখটা ২০ এপ্রিল। মারিউপোল ঘিরে ফেলে রুশ সেনারা। ঘরে ঘরে পৌঁছে চালাতে থাকে তাণ্ডব। গুলি চালাতে থাকে ইচ্ছেমতো। খাবার নেই, জল নেই, মৃতদেহের স্তূপ জমতে থাকে রাস্তায়। পরিস্থিতি দেখে ব্যাগ গুছিয়ে নেন পেডিন। ৭০ কিলোগ্রাম ওজনের সেই ট্রলি ব্যাগ আবারও খুলে সেটি হাল্কা করেন তিনি। ৫০ কিলোগ্রামে পৌঁছন কিছু জিনিস কমিয়ে। এর পরেই সঙ্গে নেন ঝুঝুকে। ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন ২৩ এপ্রিল।

পেডিন বলেন, “আমাদের প্রাথমিক এবং সবচেয়ে কঠিন কাজটি ছিল, শহরের প্রথম পাঁচ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে বাইরে বেরোনো। আমি ভেবেছিলাম, পারব না। গুলি খেয়ে মরে যাব।” ওই ৫ কিলোমিটার পার হতে দু’ঘণ্টা লেগেছিল পেডিনের। তিনি বলেন, “যেন কোনও অ্যাকশন ফিল্মের শ্যুটিং চলছে, তার মধ্যে দিয়ে আমি পেরোচ্ছি ঝুঝুকে নিয়ে। পায়ে পায়ে পেরোচ্ছি মৃতদেহ, রক্ত। আমি অভিনয় করছিলাম ভবঘুরে পাগলের। যেন আমি কেউ না। আমার কোনও পরিচয় নেই যেন। আমার সারা গায়ে ধুলো ছিল, জামাকাপড় নোংরা। যখন শহর থেকে প্রায় বেরিয়ে এসেছি, বিকট একটা বিস্ফোরণ হল। আমার মনে হল, মৃত্যুকে বোধহয় পার করে ফেললাম তাহলে।” ভীতসন্ত্রস্ত ঝুঝুকে নিয়েও প্রবল চিন্তিত ছিলেন তিনি।

প্রথমে পেডিনের লক্ষ্য ছিল, ২০ কিলোমিটার দূরের নিকোলস্কে শহরে পৌঁছনো। একটানা হাঁটার পরে যখন সেখানে তিনি পৌঁছন, তখন সেখানে অন্ধকার নেমে এসেছে। ঠান্ডায় কাঁপছেন তিনি আর ঝুঝু। চারদিকে কেউ নেই। এমন সময়েই অদ্ভুত এবং মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার মুখে পড়েন তিনি। পেডিন বলেন,”হঠাৎ দেখি একটা লোক বাড়ির বাইরে ঘুরছে। আমি এগিয়ে গেলাম। লোকটা আমায় বলল, ‘আমার সঙ্গে একটু বসবে, ড্রিঙ্ক করবে? আমি আজই আমার ছেলেকে কবর দিয়ে এলাম।’ শুনে আমি চমকে উঠি। আমি ১৫ বছর আগে মদ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু ওঁকে ফেরাতে পারলাম না।”

ওই ভদ্রলোকের মৃত সন্তানের নামে ওই রাতে ভডকা খান তাঁরা। পেডিন জানান, ওই ভদ্রলোক সে রাতে তাঁকে বলেছেন, “আমার ১৬ বছরের তাজা ছেলেকে মারিউপোলে কুপিয়ে মেরে ফেলেছিল রুশ সেনারা। আমি গিয়ে খুঁজে খুঁজে ওর কবর বার করি। ছেলের দেহটুকুও দেখিনি। সেনারা আমায় বলে, দেখতে হলে নিজে নিজে কবর খুঁড়ে নাও। আমি কী করে নিজের ছেলের কবর খুঁড়ব! আর বাঁচতে চাই না, আমিও মরে যেতে চাই”…. বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

পেডিন বলে চলেন, “আমি সারারাত সোফায় শুয়েছিলাম। ঘুম আসেনি। ভোর ছ’টা বাজতেই উঠে বেরিয়ে যাই। হাঁটা দিই জাপোরিঝিয়া-র দিকে। পথে অনেকবার অনেক রকম বাধা পাই। আমায় একবার ধরেও নিয়েছিল রুশ সেনা। আমার নোংরা জামাকাপড়, সঙ্গের কুকুর– এই মনে হয় আমায় বাঁচিয়ে দেয়। আমার প্রতি সন্দেহ করেনি কেউ। ছেড়ে দেয় আমায়। এরকমও হয়েছে, পিঠে বন্দুক ধরা হয়েছে আমার। বন্দি করা হয়েছে সেনা শিবিরে। কিন্তু পার পেয়ে গেছি কোনও মতে। এমনও হয়েছে, একটানা ১৪ ঘণ্টা হেঁটেছি।”

সবচেয়ে কঠিন সময় আসে, যখন পথে একটা ৩০ মিটার গভীর খাদ পেরোতে হয়। উপরের ব্রিজটি গেছে ভেঙে। দুটি বিম এবং সরু কিছু তার জুড়ে রয়েছে কেবল। ঝুলছে ধাতব ফ্রেম। পেডিন বলেন, “মানুষের চোখে ধুলো দেওয়া যায়। কিন্তু অত বড় একটা ব্রিজকে আমি কী করে ঠকাব! কিন্তু আমার উপায় ছিল না। ঝুঝুকে ব্যাগের সঙ্গে বেঁধে রেখে আমি নিজে এগিয়ে গিয়ে ভাঙা ব্রিজটা পরীক্ষা করি। পড়লে আমি একাই পড়তাম। তার পরে আবার গিয়ে ওকে নিয়ে আসি, ব্যাগ নিয়ে আসি। পেরোনোর পরে আনন্দে চিৎকার করে উঠেছিলাম আমি।”

সেতু পার হয়েই একটা চেকপয়েন্টের মুখে পড়েন পেডিন। সেনারা অবাক হয়ে যান, পেডিন কুকুর নিয়ে, ব্যাগ নিয়ে কীভাবে ওই ভাঙা ব্রিজ পেরোলেন! এর পরে একটি ভ্যানে রাত কাটান তিনি। স্থানীয় মানুষজনের থেকে কিছু সাহায্য পান। তিনি বলেন, “এর মধ্যে আমার কুকুরটা অসুস্থ হয়ে পড়ল। এত পরিশ্রম ওর সহ্য হওয়া কঠিন। ও আর চলতে পারল না। কিন্তু আমার থামার উপায় ছিল না। ব্যাগ নিয়ে, ওকে কোলে নিয়ে হাঁটতে থাকি। একসময় ওকে আমি বুঝিয়ে বলে, ‘তোমায় হাঁটতে হবে। তুমি না হাঁটলে আমরা দু’জনেই মরব।’ এ কথা বলার পরেই ঝুঝু হাঁটতে শুরু করে আবার নিজে।”

জাপোরিঝিয়া কোন দিকে, জিজ্ঞেস করে করে এগোতে থাকেন তাঁরা। একসময়ে দেবদূতের মতো এক ইউক্রেনীয় ট্রাকচালকের দেখা পান পেডিন। তখন তিনি জাপোরিঝিয়া থেকে আর খুব বেশি দূরে নয়। “আমি মারিউপোল থেকে এসেছি, একথা শুনেই ওক ট্রাক চালক আমায় তুলে নেন। ঘণ্টা দুয়েকের রাস্তা বাকি ছিল। আমি কোনও কথা বলিনি সারা রাস্তা। আমার যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না, আমি আর ঝুঝু অক্ষত অবস্থায় জাপোরিঝিয়া পৌঁছতে চলেছি।”

একসময়ে ইউক্রেনের পতাকায় মোড়া জাপোরিঝিয়া শহরে পৌঁছন পেডিন। ওই ড্রাইভার তাঁকে নামিয়ে দেন এক শিবিরে। কোনও রকমে তাঁকে ধন্যবাদটুকু জানান পেডিন। তার পরে নিজেরই দেশে কার্যত শরণার্থী হয়ে ঠাঁই পান আরও বহু মানুষের সঙ্গে। পেডিন ঘরছাড়া। সর্বহারা। বিধ্বস্ত। তবু নিজের সন্তানসম পোষ্যকে নিয়ে জীবিত রয়েছেন তিনি। এটাই বিরাট প্রাপ্তি তাঁর।

পেডিনের এই যাত্রা সামনে আসতেই তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ বলছেন, এ নিয়ে তো আস্ত একটা সিনেমা করা যায়, কেউ আবার ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন এমন কপালের জন্য। ২২৫ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে পেরিয়ে আসা কি সোজা কথা! আপাতত জাপোরিঝিয়ার শিবিরে ভালই আছেন পেডিন-ঝুঝু।

পিছন থেকে গুলি করে ২ নিরীহ মানুষকে মারছে রুশ সেনা, ধরা পড়ল ক্যামেরায়

You might also like