Latest News

তিলোত্তমা বহু বদলেছে, গড়ের মাঠ তো কাঁদছে, সেই উন্মাদনা কোথায়!

শ্যাম থাপা

কলকাতা বহু বদলেছে, সবদিক থেকে।

আমি ১৯৬৬ সালে কলকাতায় আসি, সেইসময় আমার বয়স ১৮। দেরাদুন থেকে এসেছিলাম। আমাকে সুব্রত কাপ ফুটবল থেকে স্পট করেছিলেন তৎকালীন ইস্টবেঙ্গল কর্মকর্তা জ্যোতিষ গুহ। তারপর আর দেশে ফিরিনি, কলকাতাই আমার শহর।

বেশ মনে রয়েছে, আগে সেইসময় ইস্টবেঙ্গলের মেস ছিল কলেজস্ট্রিটে, আমরা সকালে ট্রামে করে পাঁচ পয়সার টিকিট কেটে প্র্যাকটিসে আসতাম।

পিকে বন্দ্যোপাধ্যায় ও শ্যাম থাপা। মোহনবাগানকে ৫ গোল দেওয়ার পরে ম্যাচে।

 

আবার এমনও হয়েছে, পকেটে পয়সা নেই, ট্রাম লাইনের পাশ দিয়ে হেঁটেই চলে আসতাম কলকাতা ময়দানে।

পকেটে সেইসময় পয়সা থাকত না, তাও কত আনন্দ ছিল। এখন পকেটে অর্থ থেকেও মানুষ কতটা নিঃস্ব, এগুলিই আমাকে ব্যথা দেয় মনে।

কলকাতা মাঠে যে কোনও বড় ক্লাবে গেলে এখন দেখতে পাই নামীদামী গাড়ির সম্ভার। তার মানে ফুটবলেও অর্থ এসেছে, কিন্তু খেলার সেই উৎকর্ষতা, গুণ হারিয়ে গিয়েছে।

আমি এই প্রজন্মকে ছোট করছি না, কিন্তু সফলতা কোথায়? একটা সুনীল ছেত্রী ছাড়া সেই তারকা কোথায় এই মুহূর্তে, বলতে পারেন?

প্রসূন ও বিদেশের সঙ্গে শ্যাম থাপা (মাঝে)।

 

খেলার মাঠে সেই প্রাণও নেই। গড়ের মাঠ যেন কাঁদছে, খেলাও হয় না জমজমাট। কর্তারা বদলে গিয়েছেন মানসিকভাবে, ফুটবলাররাও বদলেছেন, সেই সততা নেই।

ক্লাবের প্রতি আনুগত্য, ভালবাসা, কথার দাম, এগুলি এই সমাজে নিরর্থক হয়ে গিয়েছে। তাই মানুষের মধ্যে হানাহানি বাড়ছে, হিংসা বাড়ছে, এই কলকাতার দশা দেখে আমার কষ্ট হয়।

আমি তো রাজনীতির মানুষ নই, তবুও ভাবতে খারাপ লাগে, কলকাতার সেই সংস্কৃতিমনস্কতা কোথায় গেল? আগে আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে রবীন্দ্রসদনের সামনে হাঁটতে যেতাম। কিংবা নন্দন চত্বরে ঘুরতে যেতাম, একটা ভাল নাটক দেখে বাড়ি ফিরতাম, কিংবা গ্লোব, নিউ এম্পায়ারে ভাল একটা ইংরাজি মুভি দেখে বাড়ি ফিরতাম, এখন কোথায় যাব? সবই তো মাল্টিপ্লেক্সের সমাহার। সেই আন্তরিকতাই হারিয়ে গিয়েছে। কেউ কাউকে এখন চেনে না, সেই সম্মানও আর পাই না।

করোনা কালের শেষ দুটি বছর আমাদের কাছে ভয়ানক গিয়েছে। এখনও হয়তো স্বাভাবিক হয়নি জীবনযাত্রা, তবুও মাস্ক মুখে নিয়েই বাকি জীবন কাটাতে হবে, বুঝতে পারছি। শিক্ষার মান নেমে গিয়েছে, ঘরে শিশু থেকে আমাদের মতো প্রবীণরাও মোবাইলে আসক্ত। এটা ঠিক নয়, বই পড়ার অভ্যাসই চলে গিয়েছে আমাদের। তাও আমি সকালে সব খবরের কাগজ পড়ে বাকি কাজ সারি, সেটা অনেকদিনের অভ্যাস বলে রয়ে গিয়েছে।

ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সংবর্ধনা সভায়।

 

সত্যি বলতে এই কলকাতায় মাঝেমধ্যে থাকতে দমবন্ধ লাগে। ময়দানে যেতেও আর ভাল লাগে না। এই প্রজন্ম আমাদের চিনলই না।

মোহনবাগানে আমি সাতবছর খেলেছি, একবছর অধিনায়কও ছিলাম, ইস্টবেঙ্গলে খেলেছি টানা ৫বছর, দেশের হয়ে খেলেছি, গোল করেছি, তবুও আক্ষেপ হয়। অন্য কোনও দেশ হলে হয়তো আরও সম্মান পেতাম। তবে বলতে দ্বিধা নেই, কলকাতাকে তারপরেও ভালবেসে ফেলেছি, না হলে কবেই দেরাদুনে চলে গিয়ে বসে থাকতাম। কলকাতাই আমার শহর, মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এখানেই থাকব।  (মতামত ব্যক্তিগত)

You might also like