Latest News

ত্রিপুরা বিজেপিতে বড় ধাক্কা, টিম সুদীপ দিল্লিমুখী, মেঘের আড়ালে কে?

শোভন চক্রবর্তী

গত দু’বছরে একাধিকবার ত্রিপুরার বিক্ষুব্ধ নেতা সুদীপ রায় বর্মন হুঙ্কার দিয়েছেন। আর তাঁর অনুগামীরা পক্ষকাল অন্তর দাবি করতেন, ত্রিপুরার রাজনীতিতে হইহই ফেলে দেবেন। এমন ঘটনা ঘটবে যাতে আগরতলার নিউ ক্যাপিটাল কমপ্লেক্সের মহাকরণে কম্পন অনুভূত হবে।

কিন্তু দিনের পর দিন গিয়েছে, সেসব কিছুই হয়নি। বরং ডেট ফেল করার বিদ্রুপ নিয়ে বিপ্লব দেবের সাইবার সেল ধেয়ে যেত সুদীপদের দিকে। কিন্তু সোমবার ত্রিপুরার রাজনীতিতে সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত যা চলল তাতে কম্পন না হলেও আন্দোলিত হয়েছে বলাই যায়। পর্যবেক্ষকদের মতে, এদিন যা ঘটল তাতে শাসকদল বিজেপির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়াটাই স্বাভাবিক। যদিও বিজেপি প্রকাশ্যে কোনও উদ্বেগ দেখাতে চাইছে না।

সোমবার সকালে বিধানসভার স্পিকারের কাছে বিধায়কপদ থেকে ইস্তফা দেন ৬ আগরতলার বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মন ও বরদোয়ালির বিধায়ক আশিস সাহা। তারপর দু’জনেই ভারতীয় জনতা পার্টির প্রাথমিক সদস্য পদ ছাড়েন। এরপর বিকেলের বিমানে আগরতলা থেকে দিল্লি উড়ে যান সুদীপরা।

টুইস্ট এখানেই। দিল্লিগামী বিমানে শুধু ইস্তফা দেওয়া সুদীপ আর আশিষ যাননি। সঙ্গে গিয়েছেন আরও তিন বিজেপি বিধায়ক। তাঁরা কারা? তাঁরা হলেন, বুর্বুমোহন ত্রিপুরা, দীবাচন্দ্র রাঙ্খেল এবং অতুল দেববর্মা।

ঘটনা হল, ত্রিপুরার জনবিন্যাসের সমীকরণের ক্ষেত্রেও এই পাঁচ জনের দিল্লি যাওয়া তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, দু’জন বাঙালি, তিনজন জনজাতি অংশের।

এখন প্রশ্ন হল, এই পাঁচজন দিল্লি গিয়ে কী করবেন?

সুদীপ ঘনিষ্ঠদের অনেকেই বলছেন, ফের কংগ্রেসে ফিরতে চলেছেন এই পাঁচ বিজেপি বিধায়ক। যাঁদের মধ্যে দু’জন ইস্তফা দিলেও বাকি তিনজন দেননি। আবার কেউ কেউ বলছেন, বাজেট অধিবেশনের কারণে তৃণমূলের বড় অংশের সাংসদরা রাজধানীতে রয়েছেন, তাঁদের সঙ্গেও দেখা করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তবে আগরতলায় কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, পোস্ট অফিস চৌমুহনীর সাদা প্রাসাদে (প্রদেশ কংগ্রেস দফতর) ফিরতে চলেছেন সুদীপরা।

গত ১২ জানুয়ারি দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুমে একটি রক্তদান শিবিরে গিয়ে হামলার মুখে পড়তে হয়েছিল সুদীপকে। সেদিনই ৬ আগরতলার বিধায়ক জানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি আর বিজেপিতে থাকবেন না। যে পার্টি লোক লেলিয়ে দিয়ে বিবেকানন্দের জন্মদিনে নিজের দলের বিধায়ককেই হামলার মুখে ফেলে সে পার্টি ত্রিপুরার কলঙ্ক। ওই দিন দ্য ওয়ালকে সুদীপ এও বলেছিলেন, এক মাসের মধ্যেই দেখতে পাবেন কী হতে চলেছে। দেখা গেল এক মাসের আগেই সুদীপ বিধায়ক পদ এবং বিজেপির প্রাথমিক সদস্যপদ ছেড়ে দিলেন।

কিন্তু কথা হল, সুদীপরা কংগ্রেসে গেলে কোন সমীকরণে ত্রিপুরার রাজনীতি আরও টানটান হতে পারে?

পর্যবেক্ষকদের মতে, সুদীপ কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল হয়ে বিজেপিতে যাওয়ার পর ত্রিপুরা কংগ্রেসের হাল ধরেছিলেন রাজবাড়ির সন্তান প্রদ্যোৎ কিশোর দেববর্মন। তারপর সেই প্রদ্যোৎও প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং ২০২০ সালের শেষে নতুন দল গঠন করেন—‘তিপ্রা মথা।’ সেই মথা স্বশাসিত জেলা পরিষদ নির্বাচনে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। তিন মাসের দল বাম, বিজেপি-আইপিএফটি জোট সবাইকে পরাস্ত করে এডিসির ক্ষমতা দখল করে। ইদানিং পুরনো দল কংগ্রেসের সঙ্গে সখ্য তৈরি হয়েছে প্রদ্যোতের। অনেকের মতে, সুদীপরা কংগ্রেসে ফিরলে প্রদ্যোৎও জোটের প্রশ্নে মথাকে নিয়ে পুরনো দলের কাছাকাছি আসতে পারেন। তা যদি হয় তাহলে অনেক ছবি ওলটপালট হয়ে যেতে পারে।

এখানে বলে রাখা ভাল, ৬০ বিধানসভার ত্রিপুরার অন্তত ২০টি আসনে জনজাতিরাই ফ্যাক্টর। আরও দু’চারটি আসনে জনজাতিদের উল্লেখযোগ্য ভোট রয়েছে।

ত্রিপুরার রাজনীতির ইতিহাস বলছে, যে যখন ক্ষমতায় এসেছে তারা জনজাতিদের অঢেল সমর্থন নিয়েই এসেছে। বাম জমানায় জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় গণমুক্তি পরিষদ সিপিএমের সমান্তরাল সংগঠন হিসেবে কাজ করত।

আবার বিজেপি যখন ক্ষমতায় এল তখন আইপিএফটির সঙ্গে জোট করেই ক্ষমতায় এসেছিল। তবে এখন আর আইপিএফটি বলে কিছু নেই। গোটাটাই মথায় মিশে গিয়েছে। এডিসি ভোটেই তার প্রমাণ মিলেছিল।

পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি কখন কোন দিকে মোড় নেবে তা হলফ করে কেউ বলতে পারে না। কিন্তু ত্রিপুরার সাম্প্রতিক সমীকরণ দেখে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, প্রদ্যোৎ হতে চলেছেন মেঘনাদ। যিনি পিছন থেকে গোটা বিষয়টাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।

রাজনৈতিক মহলের অনেকের মতে, ভোটের এক বছর আগে ত্রিপুরার রাজনীতি সোমবার অন্যদিকে বাঁক নিল। এখন অনেক ভাঙাগড়া চলবে। সমীকরণও বদলাবে। সিপিএম সমতলে কত আসন পাবে, আগামী এক বছর পাহাড়ে বামেদের গণমুক্তি পরিষদই বা কতটা সক্রিয় হবে তার উপরেও অনেককিছু নির্ভর করছে। তবে সব দিক থেকেই চাপ বাড়ছে বিজেপির উপর।

যদিও আগরতলার কৃষ্ণনগরের প্রদেশ বিজেপি কার্যালয়ের অনেক নেতাই বলছেন, শূন্য থেকে যে দল ত্রিপুরার ক্ষমতা দখল করেছিল, তারা জানে এই পিছন থেকে ছুরি মারার শক্তিকে কী ভাবে মোকাবিলা করতে হয়। তবে ত্রিপুরার রাজনীতি যে সুদীপরা জমিয়ে দিলেন, সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।

You might also like