Latest News

দেশের বুকেই আছে এক মজার গ্রাম, যেখানে মায়েরা বারবার যমজ সন্তান প্রসব করে

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: মানবজন্মে রহস্যের অন্ত নেই। কোন্ শারীরবৃত্তীয় কারণে নারীর গর্ভ থেকে একই রকম দেখতে যমজ সন্তানের জন্ম হয়, তা আজও রহস্যময়। বিজ্ঞান অবশ্য তার মতো করে একটা ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পৃথিবীর বিশেষ বিশেষ অঞ্চলেই কেন বারবার মায়েদের কোলজুড়ে যমজ শিশুর জন্ম হয়, কোনও তত্ত্ব দিয়েই সে রহস্য কিনারা করা যায়নি। ১৫৯৪ সালে এরকমই দু’জোড়া যমজকে নিয়ে শেক্সপিয়ার লিখেছিলেন Comedy of Errors. সেটা ছিল অ্যান্টিফোলাস আর ড্রোমিওকে নিয়ে এক চরম মজার কমেডি। পরে স্বয়ং বিদ্যাসাগর মশায় এই কমেডির বাংলা অনুবাদ করেছিলেন ‘ভ্রান্তিবিলাস’ নাম দিয়ে। মজার কথা, লেখক শেকসপিয়ার নিজেও ছিলেন যমজ সন্তানের বাবা। সেই যমজ সন্তানদের মধ্যে মেয়ের নাম জুডিথ ও ছেলে হ্যামনেট।

Image - দেশের বুকেই আছে এক মজার গ্রাম, যেখানে মায়েরা বারবার যমজ সন্তান প্রসব করে

বিজ্ঞান বলছে, স্বাভাবিকভাবে একটি শুক্রাণু ও একটি ডিম্বাণুর নিষেকের ফলে একটি ভ্রূণ তৈরি হয় এবং সেটিই জরায়ুতে প্রতিস্থাপিত হয়ে মানবসন্তান হিসেবে ভূমিষ্ঠ হয়। কখনও কখনও একটার বদলে দুটো বা তিনটে ডিম্বাণু একই মাসিকচক্রের সময়ে নিষিক্ত হলে দু-তিনটি বাচ্চা একই সঙ্গে হতে পারে। বিশ্বে সর্বাধিক আটটি শিশু একই সঙ্গে ভূমিষ্ঠ হওয়ার রেকর্ড আছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই বহু সন্তান হতে পারে বহু ডিম্বাণু থেকে, আবার হতে পারে একটিই ভ্রূণ বিভাজনের মাধ্যমে। তবে প্রথমটির সম্ভাবনাই বেশি।

কিন্তু জানেন কি, পৃথিবীতে এমন কিছু দেশ আছে যেখানে নারীরা নিরন্তর যমজ সন্তানের জন্ম দেয়। সেইসব অঞ্চলে পা রাখলেই মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে দেখে, চারপাশে একই রকমের দেখতে দুজন করে মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে। (Twin Village)

ব্রাজিলের দক্ষিণাঞ্চল অবস্থিত একটি প্রত্যন্ত গ্রামের নাম ক্যানডিডো গডোই। সাত হাজার লোকের এই গ্রাম ঐ অঞ্চলের অন্যান্য দশ বারোটা গ্রামের মতো হলেও একটা কারণে এটি সবার থেকে স্বতন্ত্র। এই গ্রামের ঘরে ঘরে যমজ শিশুর জন্ম-হার অত্যন্ত বেশি, যা প্রায় অবিশ্বাস্য।

Image - দেশের বুকেই আছে এক মজার গ্রাম, যেখানে মায়েরা বারবার যমজ সন্তান প্রসব করে
ক্যানডিডো গডোইইয়ের যমজ শিশুরা

কেন এই গ্রামে এত বিপুল হারে যমজ শিশুর জন্ম হয় তা কেউ জানে না। প্রজনন-বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞের একটি দল গত কয়েক বছর ধরে এই গ্রামটির ওপর গবেষণা করেছে, গ্রামের লোকজনের ডিএনএ সংগ্রহ করেছে এবং বিভিন্ন পরিবারের মানুষদের জীবনাচরণ ও খাদ্যাভ্যাসের খোঁজ-খবর নিয়েছে। কিন্তু অস্বাভাবিক তেমন কিছুই চোখে পড়েনি তাঁদের।

এখনও কেউ জানেন না কেন এমনটা হয় ক্যানডিডো গডোই গ্রামে। অনেকেই মনে করেন এই গ্রামের জলে কিছু একটা আছে, যার ফলে নারীরা এত যমজ সন্তানের জন্ম দেয়। তবে সেখানকার মানুষেরা এটা স্বীকার করে না। প্রতি দু বছর অন্তর এই গ্রামটিতে শতাধিক যমজদের এক বিরাট উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

ব্রাজিলের নাজি গ্রাম ক্যানডিডো গডোই-এর গল্পটা একেবারেই কাকতালীয় নয়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে এমন অদ্ভুতুড়ে গ্রাম আরও আছে। যেমন, ইউক্রেনের ভেলিকায়া কপানইয়া গ্রাম, অথবা নাইজেরিয়ার ইগবো ওরা। এই গ্রামগুলোতেও যমজ সন্তানের জন্মহার অত্যন্ত বেশি। এমনকি বিয়ের পর অন্য গ্রাম থেকে কোনও মহিলা এই গ্রামে এলে তিনিও যমজ সন্তান প্রসব করেন।

এইসব অঞ্চলের মধ্যে নাইজেরিয়ার ইগবো-ওরাকে বলা হয় ‘পৃথিবীর যমজ রাজধানী’ (Twin Capital of the World)। বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, এই গ্রামে একটি পরিবারেই তিন বা তারও বেশি যমজ রয়েছে। গ্রামের কোনও বাড়িতে কোনো পরিবারে যমজ সন্তান না থাকলে সেটাকেই অস্বাভাবিক বলে মনে করা হয়।

Image - দেশের বুকেই আছে এক মজার গ্রাম, যেখানে মায়েরা বারবার যমজ সন্তান প্রসব করে
ইগবো-ওরার যমজ

কোডিনহি বা কোদিনহি নামে দক্ষিণ ভারতের কেরালায় প্রত্যন্ত একটি গ্রাম আছে ৷ সমগ্র পৃথিবীতে এই গ্রাম এখন ‘যমজদের গ্রাম’ নামে প্রসিদ্ধ ৷ বিজ্ঞানীরাও অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছেন এই গ্রামের যমজ শিশুদের ক্রমবর্ধমান জন্মহার দেখে! (Twin Village)
এই আশ্চর্য গ্রামের পথে-ঘাটে, খেলার মাঠে, স্কুলে বা অফিস-কাছারিতে কেবলই একইরকম দেখতে দুজন মানুষের ছড়াছড়ি ৷ একটি স্কুলেই রয়েছে ১৭ জোড়া যমজ ছাত্র ৷ ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, কাবাডি খেলার মাঠেও যমজ খেলোয়াড়দের নিয়ে দর্শকেরা রীতিমতো বিভ্রান্ত হন৷ বিষয়টি যেমন মজার তেমনই বিস্ময়জনক৷ কোচি বন্দর থেকে মাত্র ১৫০ কিমি দূরত্বে রয়েছে এই গ্রাম।

মালাপ্পুরম জেলার কোডিনহি গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই রয়েছে একাধিক যমজ ভাই-বোনের সেট৷ গ্রামের প্রবেশপথে রয়েছে বিশাল সাইনবোর্ড। তাতে লেখা আছে : ‘ঈশ্বরের একান্ত আপন যমজদের গ্রাম – কোডিনহি৷’ (Twin Village)

২০০৮ সালে এখানে জন্ম নিয়েছিল ২৬৪ যমজ শিশু। এখন সংখ্যাটা বছরে ৪৫০ ছাড়িয়ে গেছে৷ সমগ্র পৃথিবীতে যমজ সন্তান প্রসবের যে প্রবণতা, কেরালার এই আশ্চর্য গ্রামে সেই হার প্রায় ছয় গুণ বেশি৷ গ্রামবাসীদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। তবে যমজ সন্তান প্রসবের দিক থেকে হিন্দু এবং মুসলিম নারীদের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই।

Image - দেশের বুকেই আছে এক মজার গ্রাম, যেখানে মায়েরা বারবার যমজ সন্তান প্রসব করে

এই গ্রামে যমজ সন্তান প্রসবের সূচনা হয়েছিল প্রায় ৭০ বছর আগে৷ তখন থেকে যমজের শিশুর সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে৷ সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হল বিয়ের পর কোনও নারী অন্য গ্রাম থেকে এই গ্রামে এলে দেখা যাচ্ছে তিনিও যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন৷ এখানে সন্তানের জন্মের জন্য কোনো কৃত্রিম পদ্ধতি গ্রহণ করা হয় না৷ প্রথমবার মা হবার সময়েই অনেকে যমজ সন্তান প্রসব করেছেন৷ গ্রামের মানুষেরা অবশ্য মনে করেন, যমজ সন্তানের এই জন্মরহস্য আসলে ঈশ্বরের অলৌকিক আশীর্বাদ ছাড়া আর কিছু নয়৷

গ্রামের সর্বাপেক্ষা প্রবীণা দুই যমজ বোন কুনহি পাথুটি এবং পাথুটি। উভয়ের বয়স সত্তর বছর। এই দুই বোনই জানিয়েছেন : এই সবকিছুই ঈশ্বরের আশীর্বাদ৷ বিজ্ঞান এর ব্যাখ্যা করতে পারবে না৷

এখন এই গ্রামে যমজ ছাড়াও তিনটি বা চারটি বাচ্চাও একসঙ্গে জন্মাচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা আপ্রাণ জানার চেষ্টা করে চলেছেন, এই যমজ শিশুর জন্মের মূল কারণটি কি জেনেটিক (জিনগত)? নাকি আবহাওয়া বা খাদ্যাভ্যাসের কোনও রহস্য? দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীরা ঈশ্বরের এই আপন দেশে এসে যমজদের বিভিন্ন জৈবিক নমুনা (ডি এন এ) সংগ্রহ করে রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করে চলেছেন নিরন্তর৷ যমজদের সুরক্ষার জন্য এই গ্রামে একটি সমিতিও গড়ে উঠেছে৷ ২০০৬ সালে এর সূচনা হয়। বস্তুত অভাবগ্রস্ত যমজদের আর্থিকভাবে সাহায্য জন্যই এই সমিতি গড়ে তোলা হয়েছিল৷ গোটা দেশে এরকম সেবা-সমিতি আর নেই৷ থাকার কথাও নয়।

চিকিৎসকেরা লক্ষ করে দেখেছেন, কোনও নারীর মা, দিদিমা, ঠাকুরমা যদি পূর্বে যমজ সন্তান জন্ম দেয় তাহলে সেই নারীরও গর্ভধারণ করার সময় যমজ সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রকৃতির এ এক রহস্য। তবে এতে দৈবের কোনও ভূমিকা নেই। সবটাই জৈবিক তথা শারীরবৃত্তীয় ঘটনা, যা মূলত জেনেটিক।

যমজদের প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১) মনোজাইগোটিক (Monozygotic) বা অভিন্ন যমজ (Identical Twin)

২) ডাইজাইগোটিক (Dizygotic) বা ভিন্ন যমজ (Non-identical Twin)

অভিন্ন যমজ :
একটি মাত্র নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে যদি দুটি শিশুর জন্ম হয় তাকে অভিন্ন যমজ (Monozygotic Twin) সন্তান বলে। এক্ষেত্রে নিষিক্ত ডিম্বাণুটি বিভাজিত হয়ে দুটি পূর্ণাঙ্গ শিশুতে পরিণত হয়। এর ফলে দুটি শিশুর জন্য কেবল একটি মাত্র ফুল (Placenta) থাকে। যেহেতু শিশুদুটি পুরোপুরি একই জিন (Gene) বহন করে এবং সমস্ত বৈশিষ্ট্য একই রকম হয় তাই এদের কে অনেক সময় অভিন্ন যমজ (Identical Twin) বলা হয়। শিশু দুটির লিঙ্গ এবং সমস্ত শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যও এক হয়ে থাকে। অনেক সময় এই ধরনের যমজ শিশু একজন অপরজনের কাছ থেকে পুরোপুরি আলাদা হয় না। কিছু কিছু অঙ্গ সংযুক্ত থাকে (Siamese twin)।

Image - দেশের বুকেই আছে এক মজার গ্রাম, যেখানে মায়েরা বারবার যমজ সন্তান প্রসব করে
অভিন্ন যমজ

ভিন্ন যমজ :
যখন সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে দুটি শিশু জন্ম নেয় আর এদের নিষিক্ত করা শুক্রাণু দুটিও পুরো ভিন্ন ভিন্ন, তখন তাদের ডাইজাইগোটিক যমজ বলা হয়। ফলে শিশু দুটির আলাদা আলাদা দুটি ফুল (Placenta) থাকে এবং এদের লিঙ্গও এক বা ভিন্ন হতে পারে। যমজ হলেও এদের লিঙ্গ, রক্তের গ্রুপ, গড়ন, গায়ের রঙ বা অন্যান্য অনেক বৈশিষ্ট্য এক নাও হতে পারে।

ভিন্ন যমজ

যমজ সন্তানের জন্মরহস্য বিষয়ে এখনও প্রচলিত আছে বেশ কিছু অনুমানসাপেক্ষ আর অবৈজ্ঞানিক ধারণা, যেমন-

১) কারও যদি কোনো যমজ ভাই বা বোন থাকে বা সেই নারী নিজেই যদি যমজের একজন হয় তাহলে তারও যমজ সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

২) বেশি বয়সে মা হলে যমজ সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। বিশেষত নারীর বয়স ৩৫ বা ৪০ বছরের বেশি হলে।
কারণ নারীরা যতই মেনোপজের দিকে এগিয়ে যান, ততই তাদের শরীরে হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। ফলত অধিক বয়সে গর্ভধারণ করলে যমজ সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

৩) খুব বেশি দীর্ঘাকৃতি নারীদের যমজ সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

৪) অতিরিক্ত ওজনসম্পন্ন বা ওবেসিটিতে আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রে যমজ সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। শরীরের অতিরিক্ত চর্বি ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। আর উচ্চ মাত্রার ইস্ট্রোজেন ডিম্বাশয়ের অত্যধিক উদ্দীপনার কারণ হতে পারে।

৫) যাঁরা ভেগান খাদ্যাভাসে অভ্যস্ত বা দুধ (দুগ্ধজাত খাদ্য) বেশি খান তাঁদের যমজ সন্তান হবার সম্ভাবনা বেশি।

৬) যাঁরা আইভিএফ (In vitro fertilization) পদ্ধতিতে মা হন তারা গর্ভধারণে সফল হলে অনেক সময় একাধিক ভ্রূণ শরীরে প্রবেশ করান। ফলে যমজ সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

৭) যাঁরা এক সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো অবস্থায় গর্ভবতী হন তাদেরও যমজ সন্তান হতে পারে।

৮) যাঁরা অনেকবার গর্ভধারণ করেছেন তাদের মধ্যেও যমজ সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

৯) শ্বেতাঙ্গদের মায়েদের তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গ মায়েদের মধ্যে যমজ সন্তান ধারণের সম্ভাবনা বেশি।

কিন্তু এইসব যুক্তির কোনওটা দিয়েই ব্রাজিল, ইউক্রেন, নাইজেরিয়া কিংবা কেরালার মালাপ্পুরম জেলার কোডিনহি গ্রামের যমজ শিশুজন্মের রহস্য ভেদ করতে পারেনি। ওইসব আশ্চর্য যমজ শিশুদের গ্রামের সন্তানবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে এসব সূত্র ও সম্ভাবনার কোনওটাই বিশেষভাবে প্রযোজ্য নয়। তবে গবেষণা চলছে নিরন্তর। আমরাও অপেক্ষা করে আছি, ভবিষ্যতে বিজ্ঞান এর কী ব্যাখ্যা দেয়, সেটা জানার জন্য।

You might also like