Latest News

নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে মামলার পাহাড়, সন্দেহের গ্লানিতে বিব্রত গোটা শিক্ষক সমাজ

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঘটনা-১- শিক্ষকের চাকরিতে যোগ দিতে বছর ছাব্বিশের তরুণ সেদিন স্কুলে গিয়েছেন। হেড মাস্টারমশাইয়ের ঘরে আলাপ পর্বে ম্যানেজিং কমিটির একজন জানতে চাইলেন, আপনি কোন প্যানেলের? এমন প্রশ্নে অপ্রস্তুত নবীন শিক্ষক জানতে চান, কোন প্যানেল বলতে? ম্যানেজিং কমিটির কর্তা বলেন, আজকাল তো প্যানেল নিয়েই যত গোলমাল। টিভি খুললেই তো ভুয়ো প্যানেলের খবর শুনতে পাই। নবীন শিক্ষকের অস্বস্তি কাটাতে প্রসঙ্গ পাল্টান হেড মাস্টার মশাই।

ঘটনা-২- কিছুদিন ক্লাস নেওয়ার পর হেড ক্লার্ক একদিন ডেকে পাঠিয়ে সদ্য যোগ দেওয়া শিক্ষিকাকে রীতিমত জেরা করার মতো করে শিক্ষা জীবন এবং এসএসসি-র পরীক্ষার খুঁটিনাটি ফের জানতে চাইলেন। কথায় কথায় স্পষ্ট হল, স্কুল আসলে বুঝতে চায় ‘ডাল মে কুছ’ কালা নেই তো?

হালে অশিক্ষক কর্মী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে স্কুলে স্কুলে নতুন চাকরি পাওয়া শিক্ষকদের কেমন অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে যে কথাই বলছিলেন তৃণমূলের এক শিক্ষক নেতা। তাঁর দাবি, সংগঠনের নেতাদের বলেছি, পরিস্থিতিটা সত্তরের দশক-আশির দশকের গণ টোকাটুকির দিনগুলির মতো হতে চলেছে।

কী সেই পরিস্থিতি? সেই নেতা বলেন, তখন কেন্দ্রীয় সরকার এবং ভিন রাজ্যের চাকরিতে বাংলার কৃতী ছেলেমেয়েদেরও পারতপক্ষে নেওয়া হত না। সন্দেহ করা হত, সব টুকে পাশ করেছে।

একটি শিক্ষক সংগঠনের নেতা স্বপন মণ্ডলের বক্তব্য, স্কুলে স্কুলে নতুন শিক্ষকদের নিয়ে প্রবীণ মাস্টারমশাইদের আলোচনার মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি হচ্ছে। ধারণা হবে, বিগত কয়েক বছরে যাঁরা শিক্ষকতার চাকরি পেয়েছেন, তাঁরা সবাই বুঝি দাদা-দিদি ধরে পাশ করেছেন। দিনের পর দিন শিক্ষক নিয়োগের প্যানেল নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের কারণে সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকছে না কেউই। এতে গোটা শিক্ষক সমাজের অসম্মান হচ্ছে। এরপর আগামী দিনে ছাত্রছাত্রীদের মুখেও বিরূপ কথা শুনতে হতে পারে।

বাম জমানা থেকেই এ রাজ্যে সরকারি চাকরি বলতে মূলত শিক্ষকতার চাকরি। কখনওসখনও পুলিশে নিয়োগ হয়। বাকি সরকারি চাকরির পাট চুকেই গিয়েছে বলা যায়। আর বাম জমানা থেকেই স্কুলের শিক্ষক-অশিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়েই অভিযোগের বন্যা, মামলার পাহাড়। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।

রাজ্য শিক্ষা দফতরের এক পদস্থ অফিসারের কথায়, কেউ জানে না, দফতরের ঘাড়ে কত মামলা ঝুলছে। এক অফিসারের কথায়, পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে তাতে নিয়োগ-সহ, বদলি-সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তিতে বিশেষ আদালত চালু জরুরি হয়ে পড়েছে।

শিক্ষা দফতর সংক্রান্ত মামলায় সর্বশেষ সংযোজন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের স্কুলে অশিক্ষক কর্মী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ। সেই মামলায় হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চ সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয়। রাজ্য সরকারের আর্জিতে ডিভিশন বেঞ্চ আপাতত কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তদন্তে স্থগিতাদেশ দিয়ে রেখেছে। কিন্তু মাত্র জনা পঁচিশের ভুয়ো নিয়োগের অভিযোগ নিয়ে মামলায় হাইকোর্ট সিবিআই তদন্তের কথা ভাবল কেন? জানা যাচ্ছে, গ্রুপ-ডি, গ্রুপ সি কর্মী নিয়োগে অনিয়ম নজিরবিহীন।

সূত্রের খবর, প্রাথমিক হিসাবে জনা পঁচিশের নিয়োগে অনিয়মের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে সংখ্যাটা পাঁচশ ছাড়িয়ে গিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আদালত সূত্রের খবর, সিবিআই তদন্তের ভাবনার পিছনে কাজ করেছে অনিয়মের ধরন। দেখা যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে দরখাস্ত চেয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়ার কোনও প্রমাণ নেই। বালাই নেই লিখিত পরীক্ষা, ইন্টারভিউয়ের। তাহলে নিয়োগ হল কীসের ভিত্তিতে? কে দিল নিয়োগপত্র?

নিয়োগ প্যানেল তৈরির দায়িত্ব স্কুল সার্ভিস কমিশনের। নিয়োগ দেওয়া কথা মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদের। আদালতে এসএসসি জানিয়েছে, তারা সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের নাম পর্ষদকে পাঠায়নি।

বছরভর আদালতের কাঠগড়ায় এসএসসি

শিক্ষক সংগঠনগুলি জানাচ্ছে ২০১৩ সালে পঞ্চম-দ্বাদশে শিক্ষক নিয়োগের যৌথ মেধা তালিকা থেকে র‍্যাঙ্ক জাম্প করে নিয়োগ হয়। তা নিয়ে মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত।
২০১৬-তে সেই একই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি। অর্থাৎ প্যানেলে নাম থাকা আগের প্রার্থীকে বঞ্চিত করে পরের প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া। তা নিয়ে হাইকোর্টে হওয়া মামলার আজও নিষ্পত্তি হয়নি। সেই মামলায় উঠে আসে উত্তরবঙ্গের বাসিন্দা এক মন্ত্রীকন্যার নাম। হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে নিয়োগে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অপেক্ষমান তালিকায় আচমকাই তাঁর নাম দেখে হইচই হলেও তিনি দিব্যি চাকরি করছেন।

প্রশিক্ষিত আর অপ্রশিক্ষিত বিবাদে আপার প্রাইমারির নিয়োগ

বছর দুয়েক আগে প্রকাশিত প্যানেলে প্রশিক্ষণহীনদেরও নাম থাকায় তা নিয়ে হাইকোর্টে গুচ্ছ মামলার প্রেক্ষিতে নতুন করে ভেরিফিকেশন এবং ইন্টারভিউ হয়। আদালতের নির্দেশে প্রভিশনাল মেধা তালিকা প্রকাশ হলে, সেখানে টেট ওয়েটেজ বৃদ্ধি, অপ্রশিক্ষিত প্রার্থীকে প্রশিক্ষিত করে স্থান দেওয়া, বেশ কিছু প্রার্থীকে মেধা তালিকায় স্থান না দেওয়া ইত্যাদি অভিযোগে হওয়া মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ১১ ডিসেম্বর আদালতের নির্দশে মেধা তালিকা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিলই হয়ে যায়।

আদালতের নির্দেশ পুনরায় নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হলে দেখা যায় ইন্টারভিউ তালিকায় কিছু কম নম্বরের প্রার্থীকে তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। অ্যাকাডেমিক স্কোর বৃদ্ধি এবং কাট অফ স্কোরের উর্ধ্বে যোগ্য প্রার্থীর অনলাইনে আপলোড করা নথি বাতিল গণ্য করে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। এই মুহূর্তে নিয়োগ প্রক্রিয়া আদালতের বিচারাধীন। আদালতের নির্দেশে অভিযোগকারী প্রার্থীদের অভিযোগ নিয়ে শুনানি চলছে।
প্রাইমারিতে ২০১৪-র টেটে প্রশ্নপত্রে ত্রুটি সংক্রান্ত মামলায় এখনও সংরক্ষিত ৭৩৮টি শূন্যপদে নিয়োগ হয়নি। ২০১৪ টেট প্রার্থীদের নিয়োগে উত্তর দিনাজপুরে ১১ জন ভুয়ো শিক্ষক নিয়োগ মামলায় ৪২০০০ প্রার্থীর নথি হাইকোর্টে জমা পড়েছে। এই সংক্রান্ত মামলার শুনানি হওয়ার কথা আগামী মাসে।

আরও কেলেঙ্কারি

চাকরি প্রার্থী এবং শিক্ষক সংগঠনগুলির বক্তব্য, বিগত কয়েক বছর যাবৎ যে ধরনের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল রেশিও মেরিট কেস। এই ধরনের মেরিট লিস্টে প্রার্থীদের নাম এক, দুই, তিন করে প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু প্রাপ্ত নম্বর বা শতাংশ প্রকাশ করা হয়নি। তাছাড়া ১:১.৪ অনুপাত মেনে ১০টি পদের জন্য ১৪ জনের পরিবর্তে অনেক বেশি প্রার্থীর নামসহ প্যানেল তৈরি করা হয়। উদ্দেশ্য, প্যানেলের পিছনের দিকে থাকা প্রার্থীদেরও চাকরি পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ করে রাখা। মেরিট লিস্টে নাম না থাকা প্রার্থীর চাকরি পাওয়া এবং নাম থাকা প্রার্থীর চাকরি না পাওয়ার ঘটনাও বিরল নয়, অভিযোগ চাকরি প্রত্যাশীদের।

শিক্ষকদের নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে দীর্ঘদিন আন্দোলনরত নেতা পিন্টু পারুইয়ের বক্তব্য, ভুল প্রশ্নপত্র সংক্রান্ত বিবাদ, প্যানেলে অনিয়ম ইত্যাদি নানা মামলায় কয়েক হাজার পদে নিয়োগ থমকে আছে। সংশ্লিষ্ট মহলের বক্তব্য, এরফলে, প্রাথমিকে বহু স্কুলে পড়ুয়া শিক্ষক অনুপাত জাতীয় গড়ের থেকে বেশ ভাল। কিন্তু উল্টো চিত্র সেকেন্ডারি ও হায়ার সেকেন্ডারিতে। অনেক স্কুলেই পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই।

কী বলছে প্রশাসন?
স্কুল শিক্ষা দফতরের কর্তারা এই বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। জেলা সফরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা মমতা বন্দ্যোাধ্যায় নিয়োগে অনিয়ম নিয়ে প্রশাসনকে সতর্ক করেছেন।

শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে নিয়ে সুজন চক্রবর্তী বলেন, পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে স্কুল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যানকে চেয়ার টেবিল নিয়ে হাইকোর্টে গিয়ে বসে থাকতে হবে। গত দশ বছরে শিক্ষক সমাজের গায়ে কলঙ্ক লেপে দিয়েছে রাজ্য সরকার।

You might also like