Latest News

বাঁধের ধারে ভাঙা ঘর ভেসে গেল আলোয়, মাধ্যমিকে ৬১১ নম্বর পেল দিন মজুরের মেয়ে বর্ধমানের শ্যামলী

মাটির উঠান, বাঁশের বেড়া দেওয়া বারান্দা, টিন দিয়ে ঘেরা দুটি ঘরে শুধুই দারিদ্রের ছাপ। বিষ্ণুপদবাবু জানালেন, ‘‘লকডাউনের তিনমাস কোনও কাজ মেলেনি। বাড়িতে চরম আর্থিক টানাটানি। তার মধ্যেই ও কিন্তু নিজের কাজটা করে গেছে। সন্তানের সাফল্যে সব বাবা মাই খুশি হন। আমরাও হয়েছি। একইসঙ্গে যন্ত্রণা হচ্ছে খুব। আগামীতেও কি পাশে দাঁড়াতে পারব ওর?’’

দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: মাটির দাওয়া, টিনের ঘেরাটোপের মধ্যে দুটো কুঠুরি। মাথায় অ্যাজবেস্টাসের ছাদ। এমনি সূর্যের আলো ঢোকে না বড় একটা। কিন্তু মাধ্যমিকের ফল বেরোতেই আলোয় ভেসে গেল সেই ঘর। সমস্ত বাধা আর প্রতিকূলতাকে হারিয়ে দিয়ে সফল হয়ে ফিরল ঘরের মেয়ে। অনেক লড়াইয়ের পরেও ৭০০র মধ্যে ৬১১ নম্বর পেয়েছে শ্যামলী মণ্ডল।

বরাবরই বিজ্ঞান শ্যামলীর পছন্দের বিষয়। বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার ইচ্ছে থাকলেও বাধা আর্থিক অনটন। তাই সেই আশা ছেড়ে এখন ঝুঁকতে হয়েছে ভূগোলের দিকে।

বর্ধমান শহরের কাঞ্চননগর খর্গেশ্বরপল্লিতে দামোদরের বাঁধের ধারে বাস শ্যামলীদের। বাবা বিষ্ণুপদ মণ্ডল দিনমজুর। সংসার সামলান মা শেফালি মণ্ডল। মাটির উঠান, বাঁশের বেড়া দেওয়া বারান্দা, টিন দিয়ে ঘেরা দুটি ঘরে শুধুই দারিদ্রের ছাপ। বিষ্ণুপদবাবু জানালেন, ‘‘লকডাউনের তিনমাস কোনও কাজ মেলেনি। বাড়িতে চরম আর্থিক টানাটানি। তার মধ্যেই ও কিন্তু নিজের কাজটা করে গেছে। সন্তানের সাফল্যে সব বাবা মাই খুশি হন। আমরাও হয়েছি। একইসঙ্গে যন্ত্রণা হচ্ছে খুব। আগামীতেও কি পাশে দাঁড়াতে পারব ওর?’’

কাঞ্চননগর দীননাথ দাস উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবার সে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয় শ্যামলী। বুধবার সকালে ফল বেরোতেই চমকে ওঠেন সবাই। সাতশোর মধ্যে শ্যামলীর প্রাপ্ত নম্বর ৬১১। অঙ্কে ৯৮, ভূগোলে ৯৭। ইংরেজি ছাড়া সব বিষয়েই আটের ঘরে নম্বর। মাটির ঘরের দাওয়ায় বসে শ্যামলী জানায়, বাড়িতে মায়ের সঙ্গে হাতে হাতে কাজে সাহায্য করা ছাড়া বাকি সময়ে পড়াশোনা নিয়েই থাকত সে। স্কুলের টিচার, বাবা-মা সবাইতাকে পড়াশোনার জন্য উৎসাহ দিতেন। তাঁদের সবার উৎসাহেই এই সাফল্য। শ্যামলীর মা শেফালী বলেন, ‘‘স্কুলের শিক্ষকরা শ্যামলীকে শুধু পড়াশোনাতেই সাহায্য করেছেন এমন নয়, আর্থিকভাবেও পাশে দাঁড়িয়েছিলেন আমাদের।’’

অনেক অনটনের মধ্যেও দু’টি জায়গায় মেয়েকে প্রাইভেট টিউশন পড়তে পাঠাতেন বিষ্ণুপদবাবু। শ্যামলী বলে,‘‘বাকি সাহায্য পেয়েছি স্কুলের শিক্ষকদের কাছে। স্কুলেই গান শিখেছি। বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার ইচ্ছা ছিল। প্রাণীবিদ্যা আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু বাড়ির যে আর্থিক পরিস্থিতি তাতে বিজ্ঞান নিয়ে পড়া যাবে না। তাই আশা ছেড়ে ভূগোল নিয়েই ভবিষ্যতে পড়াশোনা করার কথা চিন্তা করেছি। শ্যামলীর বাবাও জানান, তিনমাস কাজ নেই। বাকি সময়েও কাজ নিয়ে নিশ্চয়তা থাকে না। তাই মেয়েকে বলে দিয়েছেন বিজ্ঞান নিয়ে পড়াতে পারবেন না। কেউ যদি সাহায্য করেন ভালো না হলে কপালে যা আছে তাই হবে।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক সুভাষচন্দ্র দত্ত বলেন, ‘‘শ্যামলী শুধু পড়াশোনা নয়। ভালো গান করে, ক্যুইজ করে। গান ও ক্যুইজে বিভিন্ন জায়গা থেকে পুরষ্কার পেয়েছে। স্কুলের কন্যাশ্রী ক্লাবের সদস্য হিসাবেও অনেক কাজ করেছে সে। ওর আরও ভালো ফলাফল আশা করেছিলাম। আগামীদিনে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে ওর যাতে কোনও সমস্যা না হয় সেই বিষয়টি আমরা দেখব।’’

You might also like