Latest News

আকাঙ্খা খুনে সিরিয়াল কিলার উদয়নকে যাবজ্জীবন কারদণ্ডের সাজা দিল বাঁকুড়ার ফাস্ট ট্র‍্যাক কোর্ট

দিল্লি হয়ে আমেরিকায় চাকরি করতে যাওয়ার নাম করে বাঁকুড়ার ভাড়া বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন আকাঙ্খা। তারপর আর ঘরে ফেরা হয়নি তাঁর। প্রেমিকের হাতেই জীবন দিতে হয় তাঁকে।

দ্য ওয়াল ব্যুরো, বাঁকুড়া: আকাঙ্খা খুনে যাবজ্জীবন সাজা হল সিরিয়াল কিলার উদয়নের। মঙ্গলবারই বাঁকুড়ার ফাস্ট ট্র‍্যাক কোর্ট দোষী সাব্যস্ত করে উদয়নকে। বুধবার হল সাজা ঘোষণা।

২০১৬ সালে আকাঙ্খা শর্মা খুনের ঘটনায় রীতিমত তোলপাড় হয় গোটা দেশ। দিল্লি হয়ে আমেরিকায় চাকরি করতে যাওয়ার নাম করে বাঁকুড়ার ভাড়া বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন আকাঙ্খা। তারপর আর ঘরে ফেরা হয়নি তাঁর। ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই তাঁকে শ্বাসরোধ করে খুন করে উদয়ন।

সরকারি আইনজীবী অরুণ চ্যাটার্জি জানান, ২০০৮ সালে সোস্যাল মিডিয়ায় উদয়নের সাথে সম্পর্ক তৈরি হয় আকাঙ্খা শর্মার। উদয়ন নিজেকে আমেরিকার একটি মাল্টি ন্যাশনাল সংস্থার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে দাবি করে। আকাঙ্খাকে আমেরিকায় ইউনিসেফে চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার নাম করে দিল্লিতে ডেকে নিয়ে যায় উদয়ন। ইউনিসেফে চাকরির একটি নিয়োগপত্রও পাঠিয়েছিল উদয়ন। পরবর্তীতে জানা যায় ওই নিয়োগপত্র ছিল পুরোপুরি ভুয়ো।

উদয়নের কথা মতো আকাঙ্খা বাঁকুড়ার বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমে দিল্লি যায়। দিল্লি থেকেই আমেরিকায় যাওয়ার কথা ছিল আকাঙ্খা ও উদয়নের। দিল্লি যাওয়ার পর প্রথম প্রথম পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও ধীরে ধীরে আকাঙ্খার সঙ্গে তাঁর পরিবারের যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। টেলিফোনে কথাবার্তা না হয়ে শুধুমাত্র মেসেজ আসতে থাকে আকাঙ্খার মোবাইল থেকে।

পরবর্তীতে পুলিশের জেরায় উদয়ন জানায় আকাঙ্খা দিল্লি পৌঁছনোর পর সেখান থেকে তারা ভোপালে যায়। ২০১৬ সালের ২৭ জুন ভোপালের একটি কালী মন্দিরে আকাঙ্খাকে বিয়ে করে উদয়ন। উদয়নের সঙ্গে থাকতে থাকতেই তার স্বরূপ বুঝতে পারে আকাঙ্খা। ভূল ভাঙতেই বাড়ি ফিরতে চায়। ২০১৬ সালের ১২ জুলাই বাঁকুড়ায় ফেরার জন্য উদয়নকে লুকিয়ে অন লাইনে ট্রেনের টিকিটও কাটে আকাঙ্খা। বিষয়টি জানতে পেরেই ১৫ জুলাই আকাঙ্খাকে শ্বাসরোধ করে খুন করে উদয়ন।  এরপর মৃতদেহ টিনের বাক্সে ভরে ঘরের মধ্যেই সিমেন্টের বেদি তৈরি করে লুকিয়ে ফেলে।

আকাঙ্খাকে খুনের পরই তার পরিবারের মনোভাব বুঝতে ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর আকাঙ্খার বাঁকুড়ার বাড়িতে আসে উদয়ন। আকাঙ্খার পরিবারকে জানায় আকাঙ্খা আমেরিকায় রয়েছে। প্রয়োজনে সেখানে গিয়ে তাঁরা মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে পারেন। ভিসার জন্য আকাঙ্খার মা বাবাকে দিল্লিতে যাওয়ার কথাও বলে উদয়ন। পরে উদয়নের কথা মতো দিল্লি যান আকাঙ্খার বাবা ও দাদা। কিন্তু সেখানে গিয়ে আর উদয়নের সাথে যোগাযোগ করতে পারেননি। অগত্যা বাড়ি ফিরে আসেন আকাঙ্খার বাবা ও দাদা।

এরপরই আকাঙ্খার পরিবারের সন্দেহ গাঢ় হয়। এরপরেই ২০১৬ সালের ৫ ডিসেম্বর আকাঙ্খার বাবা একটি রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কের বাঁকুড়া শাখার ম্যানেজার শিবেন্দ্র নারায়ণ শর্মা বাঁকুড়া সদর থানার দ্বারস্থ হয়ে নিখোঁজ ডায়েরি করেন। এর ঠিক এক মাস পর ৫ জানুয়ারি বাঁকুড়া সদর থানায় উদয়ন দাসের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। এরপরেই তদন্তে গতি আসে। আকাঙ্খার মোবাইল টাওয়ার লোকেশন ট্র‍্যাক করে জানা যায় মোবাইল ফোনটি রয়েছে ভোপালের সাকেতনগর এলাকায়।

ভোপালের উদ্দেশে রওনা দেয় বাঁকুড়া সদর থানার তদন্তকারী দল। ২ ফেব্রুয়ারি ওই তদন্তকারী দল ভোপালের সাকেতনগরে আকাঙ্খার প্রেমিক উদয়ন দাসের বাড়িতে হানা দিয়ে উদয়নকে গ্রেফতার করে। উদয়নের বাড়ির মেঝেতে থাকা সিমেন্টের বেদী খুঁড়ে উদ্ধার হয় আকাঙ্খার দেহ। পরে উদয়নকে নিয়ে ছত্রিশগড়ের রায়পুরে যায় তদন্তকারীরা। ৫ ফেব্রুয়ারি রায়পুরের সুন্দরনগরে উদয়ন দাসের বাড়ির উঠোনের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার হয় উদয়ন দাসের বাবা বীরেন্দ্রনাথ দাস ও মা ইন্দ্রানী দেবীর মৃতদেহ।

এরপর পুলিশ উদয়নকে বাঁকুড়ায় নিয়ে আসে। তার বিরুদ্ধে বাঁকুড়া ফাস্ট ট্র‍্যাক কোর্টে অপহরণ, খুন ও প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ আনা হয়। এই মামলায় মোট ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করে আদালত। তারপরেই মঙ্গলবার আকাঙ্খার প্রেমিক উদয়নকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত। আজ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দেওয়া হল তাকে।

You might also like