Latest News

অমানবিক! দেড়শো বছরের পুরনো কলকাতা পুলিশ আইন বাতিলের সুপারিশ রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের

অমল সরকার

১৮৬৬ সালের কলকাতা পুলিশ আইনটি বাতিল করার সুপারিশ করল রাজ্য মানবাধিকার কমিশন। কমিশনের চেয়ার‍ম্যান কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি গিরীশচন্দ্র গুপ্ত রাজ্যের মুখ্যসচিব হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদীকে কমিশনের সুপারিশ লিখিতভাবে জানিয়েছেন।

আজ শুক্রবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। তার আগের দিন ১৫৫ বছরের পুরনো আইনটি বাতিলের সুপারিশ করার কারণ হিসাবে মানবাধিকারের কথাই উল্লেখ করেছেন বিচারপতি (অবসরপ্রাপ্ত) গুপ্ত। তাঁর বক্তব্য, ব্রিটিশ জমানায় পুলিশের জন্য তৈরি ওই আইনের বিভিন্ন ধারা মানবাধিকারের পরিপন্থী। সেই আইনকে পুলিশ নাগরিকের অধিকার হরণের কাজে ব্যবহার করছে। তাঁর আরও বক্তব্য, ১৯৭৩ সালের সংশোধিত ফৌজদারি দণ্ডবিধি বলবৎ হওয়ার পর ১৮৬৬ সালের ক্যালকাটা পুলিশ অ্যাক্টের আর প্রয়োজনও নেই। তাছাড়া, সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন মামলায় পুলিশের যে প্রত্যাশিত ভূমিকার কথা বলেছে, এই আইন তারও পরিপন্থী। পুলিশ মহলে কেপি অ্যাক্ট, ’৬৬ নামে পরিচিত আইনটি নিয়ে আগেও বিতর্ক হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলি আগেই আইনটি বাতিলের দাবিতে সরব হয়েছে।

 

যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে কমিশনের চেয়ারম্যান ঔপনিবেশিক আইন বাতিলের সুপারিশ করেছেন তেমন ঘটনা বিরল নয়। পুলিশের বিরুদ্ধে নিরীহ নাগরিককে মারধর, থানায় আটকে রাখা, তথ্য গোপনের মতো বহু অভিযোগই প্রতিনিয়ত ঘটে থাকে।

সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি পোস্তা থানা এলাকার। ওই থানার একজন সাব ইন্সপেক্টর ২০১৯-এর ১৮ মে বিকেলে কলাকার স্ট্রিট ও রতন সরকার গার্ডেন স্ট্রিটের ক্রসিং থেকে তিন ব্যক্তিকে থানায় তুলে নিয়ে যায়। রাস্তায় মদ্যপ অবস্থায় উশৃঙ্খলতা করার অভিযোগে তাদের ধরা হয় বলে পুলিশ জানায়। কিন্তু তারা যে নেশাগ্রস্ত ছিল সেই মর্মে পুলিশ কোনও মেডিকেল রিপোর্ট পেশ করতে পারেনি। ধৃতদের মধ্যে একজনকে কিছু পরেই থানা থেকে জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়। বাকি দু’জনকে হাজতে ঢুকিয়ে দিলেও অভিযোগ একজনকে ব্যাপক মারধর করে গ্রেফতারকারী অফিসার। মারধরের ফলে ধৃতের হাঁটাচলা করার মতো অবস্থা ছিল না।

 

কমিশন অভিযুক্ত সাব ইন্সপেক্টর সুমন বিশ্বাস এবং তদন্তে গাফিলতির কারণে অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশার অভিজিৎ ঘোষের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে। এছাড়া, অভিযোগকারী রাজেন্দ্রকুমার যোশীকে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ বাবদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন। ক্ষতিপূরণের অর্থ অভিযুক্ত সাব ইন্সপেক্টরের বেতন থেকে কেটে নেওয়া যেতে পারে, বলেছে কমিশন।

কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্য, পোস্তা থানা ধৃতকে ১৮৬৬ সালের কলকাতা পুলিশ আইনের ৬৮ নন্বর ধারায় গ্রেফতার করে। সেই ধারায় রাস্তায় অভব্যতা করার কারণে পুলিশকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কোনও নাগরিকরে গ্রেফতার করার। কিন্তু ফৌজদারি দণ্ডবিধি মোতাবেক ধৃত বা তার পরিবার-পরিজনকে পুলিশ গ্রেফতারের কারণ জানায়নি। পরিবারকে গ্রেফতার সম্পর্কেই অন্ধকারে রাখে এবং নিয়ম মতো পরদিন ধৃতকে আদালতে পেশ করেনি। কমিশনের চেয়ারম্যান মনে করেন, পুলিশ অনেক সময়ই ব্রিটিশ আইনকে হাতিয়ার করে নাগরিকের মানবাধিকার হরণ করছে।

বিচাবরপতি গুপ্তর এই সুপারিশকে কেন্দ্র করে কমিশনের অন্দরে ইতিমধ্যে আপত্তি উঠেছে। কমিশনের সদস্য নপরাজিত মুখোপাধ্যায় স্বয়ং প্রাক্তন পুলিশ কর্তা। রাজ্য পুলিশের ডিজি পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে কমিশনের সদস্য করে পাঠান। ২০১৪ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত কমিশনের সদস্য থাকার পরও তাঁর কার্যকালের মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়িয়ে দিয়েছে নবান্ন।

কলকাতা পুলিশ কমিশনার সৌমেন মিত্র

 

গিরিশ গুপ্তর আইন বাতিলের সুপারিশ সম্পর্কে ‘ডিসেন্ট নোট’ দিয়েছেন নপরাজিতবাবু। নোটে তাঁর বক্তব্য, আইন বাতিলের সুপারিশ চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত অভিমত। কমিশনের নয়। ওই সুপারিশ ১৯৯৩ সালের প্রোটেকশন অফ হিউম্যান রাইটস আইনের পরিপন্থী। নপরাজিতবাবুর ডিসেন্ট নোটও কমিশনের ওয়েবসাইটে তুলে দেওয়া হয়েছে।

এই ব্যাপারে বিচারপতি গিরিশ গুপ্তর বক্তব্য, আমি মানবাধিকার কমিশনের আইন মেনেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি এবং সুপারিশ পাঠিয়েছি। তাঁর আরও বক্তব্য, নপরাজিতবাবু একটা সময় কমিশনের অস্থায়ী চেয়ারম্যান ছিলেন। তখন তিনি কমিশনের যে বিধি তৈরি করেন তাতে বলা আছে চেয়ারম্যান মনে করলে একাই কোনও বিষয়ে সুপারিশ করতে পারেন এবং সেটাই কমিশনের সুপারিশ বলে গ্রাহ্য হবে।

চেয়ারম্যান এবং কমিশনের সদস্যের বিরোধের মধ্যে চাপা পড়ে যায়নি আইন বাতিলের সিদ্ধান্ত। কারণ, দেশে হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র শহর আছে যেখানে ব্রিটিশ জমানায় তৈরি পুলিশের নিজস্ব আইন আজও বলবৎ আছে। যদিও কলকাতা পুলিশের কমিশনার সৌমেন মিত্রের বক্তব্য, ‘মানবাধিকার কমিশনের সুপারিশ সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল নই। আমি সংবাদমাধ্যমের মুখ থেকে শুনে এই বিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া দেব না।’

দীর্ঘদিন কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান এবং কমিশনার ছিলেন গৌতমমোহন চক্রবর্তী। অবসরপ্রাপ্ত এই পুলিশ কর্তার বক্তব্য, ‘পুলিশ যদি কাউকে থানায় তুলে এনে মারধর করে এবং অন্যান্য বিধি ভঙ্গ করে থাকে তার জন্য কোনও আইনকে কাঠগড়ায় তোলার পক্ষপাতী আমি নই। কোনও আইনেই পুলিশকে ধৃতের গায়ে হাত তোলার অনুমতি দেওয়া হয়নি।’

প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার গৌতমমোহন চক্রবর্তী

 

আইন বাতিলের সুপারিশ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদল ঘটে ঠিকই। কিন্তু আইন তৈরি, সংশোধন ইত্যাদির সময় সংশ্লিষ্ট শহরের পরিবেশ, নাগরিক সচেতনতার মান ইত্যাদি পর্যালোচনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট আইনে প্রকাশ্যে মল-মুত্র ত্যাগের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান আছে। দেখতে হবে নাগরিকের এমন আচরণ বা অপব্যবহার কী বন্ধ হয়ে গিয়েছে?’

পোস্তা থানার ঘটনাটিতে অভিযোগ পাওয়ার পর কমিশনের তদন্তে উঠে আসে গ্রেফতারের ভিন্ন কারণ। থানার নথি খতিয়ে দেখা যায়, জনৈক ব্যবসায়ী থানার ওসিকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন, ধৃতদের যেন ছেড়ে দেওয়া হয়। কারণ বিবাদ মিটে গিয়েছে। চিঠিতে তিনি আরও জানান, যে টাকা পাওয়া নিয়ে সমস্যার সূত্রপাত, তা তিনি পেয়ে গিয়েছেন। অথচ, ওই ব্যবসায়ীর তরফে তার আগে থানায় কোনও অভিযোগ দায়েরের ঘটনা নেই।

তদন্তে কমিশনের মনে হয়েছে, ধৃতদের মারধর করে ব্যবসায়ীর টাকা আদায় করে দেওয়ার জন্যই পুলিশ প্রকাশ্যে মদ খেয়ে মাতলামির অভিযোগ এনে তিন ব্যক্তিকে থানায় তুলে এনেছিল। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের বক্তব্য, এমন অভিযোগ শোনা যায় যে ভাড়াটে তোলা বা কারও টাকা আদায় করে দেওয়ার জন্য পুলিশ কাউকে থানায় তুলে নিয়ে গিয়েছে। এই সব ক্ষেত্রে থানা-পুলিশ ব্রিটিশ আইনকে কাজে লাগায়।

You might also like