Latest News

প্রাপ্তবয়স্ক পরকীয়ায় আপত্তি কোথায়? বালির ‘কাদম্বরী’দের নিয়ে দু’ভাগ সমাজ

অঙ্গীরা চন্দ

বালির নিশ্চিন্দার কর্মকার বাড়ি। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁদের নিয়ে চর্চার শেষ নেই। সেই বাড়ির দুই বউই একসঙ্গে পালিয়েছিলেন ‘পরপুরুষের’ হাত ধরে। দুই রাজমিস্ত্রির প্রেমে কর্মকারদের দুই বউ হাবুডুবু। পুলিশের হস্তক্ষেপে সব ‘কেচ্ছা কেলেঙ্কারি’র পর্দাফাঁস হয়েছে। সমাজে এখন মুখ দেখাতেই পারছেন না কর্মকারবাড়ির বাকিরা।

অনন্যা এবং রিয়া কর্মকারকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রোল তো আছেই, সেই সঙ্গে সুযোগ মতো সকলেই কটূক্তি করছেন মন ভরে। স্বামী, সংসার, শ্বশুরবাড়ি ফেলে শেষমেশ কিনা রাজমিস্ত্রি! বলিহারি পছন্দ! পুলিশের হাতে ওরা ধরা পড়েছে, বেশ হয়েছে। এমনটাই বলছেন নেটিজেনদের একাংশ!

তবে সোশ্যাল মিডিয়াতেই কর্মকার পরিবারের এই কেচ্ছা নিয়ে গত কয়েকদিনে মাথা তুলেছে আরও এক মত। সেই মত বলছে ‘বেশ করেছি প্রেম করেছি’। পুলিশের জেরার মুখে অনন্যা কর্মকারকে ঠিক এই সুরেই ফুঁসে উঠতে শোনা গিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘বেশ করেছি প্রেম করেছি। আপনারা মাথা ঘামাচ্ছেন কেন?’ ফেসবুকের দেওয়ালে দেওয়ালে, কমেন্ট বক্সে কিংবা স্টেটাসের পাতায়, অনেকেই এখন ঠিক এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে শুরু করেছেন। সত্যিই তো, কেন মাথা ঘামাচ্ছে পুলিশ! কেনই বা মাথা ঘামাচ্ছি আমরা?

অনন্যা, রিয়া যে প্রেম করেছেন, যুগে যুগে সেই প্রেম করে এসেছেন বাঙালি বাড়ির বিদ্রোহিনীরা। পুরাণের তারা হোক কিংবা ঠাকুরবাড়ির কাদম্বরী, গোকুলের রাইকিশোরীকেই বা সমাজ ভোলে কী করে?

টেলি দুনিয়ার চেনা মুখ ঊষসী চক্রবর্তী। সোশ্যাল মিডিয়ায় আরও অনেকের মতো তাঁকেও মুখ খুলতে দেখা গেছে বালির পরকীয়া নিয়ে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, গরিব রাজমিস্ত্রিদের সঙ্গে প্রেমের কারণেই কি এত আলোচনা হচ্ছে অনন্যা আর রিয়াকে নিয়ে? পারস্পরিক সহমতেই তো তাঁরা বাড়ি ছেড়েছেন, এটা কি শাস্তিযোগ্য অপরাধ? শেখর আর শুভজিতের হাজতবাস মানতে পারেননি ঊষসী।

২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী পরকীয়া সম্পর্ক আইনের চোখে অপরাধ নয়। আইনত শুধুমাত্র বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের কারণে শাস্তি হতে পারে না কারও। বালির ঘটনায় দেখা গেছে, অনন্যা এবং রিয়া শেখর আর শুভজিতের হাত ধরে সংসার ফেলে পালিয়েছেন প্রেমের টানে। যাওয়ার বেলায় রিয়া সঙ্গে নিতে ভোলেননি তার একমাত্র সন্তান সাত বছরের আয়ুষকে। প্রেমিকের হাত ধরে মুর্শিদাবাদ হয়ে সোজা মুম্বই পালিয়েছিলেন তাঁরা। স্বপ্ন দেখেছিলেন নতুন করে ঘর বাঁধার। ঊষসীর মতো অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এতে অন্যায়টা কোথায়?

বিশেষ করে দুই বউই যখন নিজের মুখে অপহরণ বা পাচার সংক্রান্ত সম্ভাবনাগুলিকে নস্যাৎ করে দিয়ে জোর গলায় বলেছেন ‘বেশ করেছি প্রেম করেছি’, তখন এই ঘটনায় আইন বা সমাজের আর কিছু বলার থাকতে পারে কি? তাঁরা দুজনেই জানিয়েছেন, স্বামীর সংসারে তাঁরা কেউ সুখী ছিলেন না। নিঃসঙ্গ জীবনে একঘেয়েমি গ্রাস করেছিল। সময় দিতেন না স্বামীরা। শেখর আর শুভজিতের সঙ্গে আলাপের পর মন দিয়ে ফেলেছেন ওই দুজনকেই। এই প্রেম তো অপরাধ নয়। তবে কেন হাজতবাস করতে হচ্ছে তাঁদের প্রেমিকদের? কেন চারদিকে এই ছিছিক্কার? কেন মায়ের কোল থেকে ছোট্ট আয়ুষকে ছিনিয়ে নেওয়া হল, উঠেছে সেই প্রশ্নও।

এখানেই শেষ নয়, সংবাদমাধ্যমে জোর গলায় কর্মকার বাড়ির ছেলেরা জানিয়েছেন, বংশধরকে গ্রহণ করলেও তাঁরা এখনও ‘সিদ্ধান্ত’ নেননি অনন্যা আর রিয়াকে ঘরে ফেরানো হবে কিনা। অর্থাৎ বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যে ‘গর্হিত’ কাজ তাঁরা করেছেন, তারপরে তাঁদের ‘শোধন’ প্রয়োজন। বাচ্চাটিকে ফেরালেও কর্মকার বাড়িতে দুই বউয়ের তাই ঠাঁই নেই। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাকে শ্বশুরবাড়ির ‘সম্পত্তি’ হিসেবে দেখা না হলে এমনটা বলা যায় কি? আইনের চোখে আসলে সেটাই তো বড় অপরাধ!

অসম আর্থিক পরিমণ্ডলে প্রেমের কী পরিণতি হতে পারে তার নির্মম নিদর্শন দেখেছিল পশ্চিমবঙ্গ। শিল্পপতির মেয়ের সঙ্গে অ্যানিমেশন ট্রেনিং সেন্টারের মাস্টারমশইয়ায়ের প্রেম— পাতিপুকুর আন্ডার পাশের অদূরে দেহ মিলেছিল রিজওয়ানুর রহমানের। সেই হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে গিয়েছিল লালবাজারের বড় কর্তাদের নাম। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রশাসনকে কার্যত খাক করে দিয়েছিল গণক্ষোভের আগুন।

বাড়ি থেকে হঠাৎ নিখোঁজ হয়েছিলেন কর্মকার বাড়ির দুই বউ। তদন্ত করে তাঁদের খুঁজে দিয়েছে পুলিশ। কেন এখানেই তাদের কাজ শেষ হচ্ছে না? শেখরদের কারও পকেটে নোটের গরম নেই বলেই কি? প্রশ্ন উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। নিশ্চিন্দার এই ঘটনা নিয়ে যেন আক্ষরিক অর্থেই দুই ভাগ হয়ে গিয়েছেন নেট নাগরিকরা।

You might also like