Latest News

আমার সেজকাকু (একবিংশ পর্ব)

সুদেব দে

সেজকাকুকে নিয়ে কিছু অজানা অভিজ্ঞতার কথা বলব এই পর্বে। দেশ বিদেশে কোটি কোটি বাঙালি- অবাঙালি শ্রোতা আছেন যারা আজও মান্না দে’র গানে মুগ্ধ। এই শ্রোতাদের বড়সংখ্যক আবার গানবাজনার ছাত্র। তাঁদের মধ্যে যাঁরা আমার এই লেখা পড়েন, নানা সময়ে তাঁদের নানা প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়েছে আমাকে। প্রথমেই বলে রাখি আমি নেহাতই এক নগণ্য মানুষ, এবং আজও সঙ্গীতের ছাত্র মনে করি নিজেকে। গুরুদের দয়ায় গানবাজনা যেটুকু শিখেছি,তার থেকে ঢের বেশি শেখা বাকি রয়েছে । এ এমন বিদ্যে, একজীবনে শিখে শেষ করা যায়না। যাই হোক, কিছু মানুষের প্রশ্ন শুনে আমি নিজেও আগ্রহ বোধ করেছি। যেমন যেমন মনে পড়ছে লিখছি…

গানের চর্চা করেন এমন বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী আমায় জিজ্ঞাসা করেছিলেন, গানবাজনা শিখে মান্না দে হওয়া যায় কী না! আমার খুব ভালো লেগেছিল প্রশ্নটা। বিশ্বের নানা প্রান্তের বাঙালি পাঠকেরাও মেল করে এমন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছেন। আমার নিজের উপলব্ধি যোগ না করলে এই প্রশ্নের উত্তর অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আমার মনে হয়, শুধু গানবাজনা শিখে একজন মান্না দে কি লতা মঙ্গেশকর হওয়া যায় না। শুধু  শিখে একজন পণ্ডিত রবিশংকর বা বিলায়েত খাঁ হওয়া যায়না। গানের ছাত্র হিসাবে এই আমার অনুধাবন।এই প্রসঙ্গে একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। কাকা যখন আমায় নিয়ে তালিমে বসতেন তখন দেখেছি একটা রেফারেন্স থেকে উনি যে কোথায় চলে যেতেন, কোন উচ্চতায় বিচরণ করতেন- সে ভাষায় প্রকাশ করে বলা অসম্ভব। শেখানোর সময় বা গান নিয়ে আলোচনা করার সময় তাঁর কিছু কিছু অংশ মনে পড়লে আমি বড়জোর সেই ডেমনস্ট্রেশনটা শোনাতে পারি। যেমন আমার মনে পড়ছে কাকার খুব প্রিয় রাগ ছিল ইমন। সচরাচর গান শেখার শুরুর দিকেই ওস্তাদেরা বা শিক্ষকমশাইয়েরা ছাত্রছাত্রীদের ইমন, ভৈরব, বিলাবল এই রাগগুলো শেখান। তো সেই ‘ইমন’ রাগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তাতে তীব্রমধ্যম বা কড়িমধ্যম কীভাবে লাগে, বা কীভাবে সেই স্বরটাকে বিউটিফাই করা যায়, তা নিয়েই হয়তো ২০-৩০ মিনিট টানা কথা বলে যাচ্ছেন সেজকাকু। বিভিন্ন নোট থেকে উদাহরণ দিয়ে দিয়ে দেখাচ্ছেন কতভাবে কড়িমধ্যম লাগছে এই রাগে। আমি শুধু অবাক হয়ে শুনতাম আর ভাবতাম একজন মানুষের গানবাজনা নিয়ে কতখানি চিন্তা আর কতটা অগাধ জ্ঞান থাকলে একটা জিনিসকে এভাবে বিশ্লেষণ করা যায়! তখন তো আমার ক্যামেরাও ছিল না, টেপ রেকর্ডারও ছিল না। স্মৃতি ছাড়া আর কোথাও সেসব মুহূর্ত জমিয়ে রাখতে পারিনি।কাকা একটা কথা বলতেন। বলতেন, কোনও মানুষকে গানবাজনা শেখানো যায় না। বড়জোর পথ দেখানো যায়। এই পথ দেখানোই হল তালিম দেওয়া। কাকা বলতেন, If you dont have that ability to sing, you will not become a singer. পরাধীন যুগের মানুষ তো, আমার বাবা কাকারা কথায় কথায় খুব ইংরিজি শব্দ বলতেন। সোজা কথায়, গাইবার ক্ষমতা নিয়ে জন্মাতে হবে, তবেই গান গাইতে পারবে। এই গান গাইবার ক্ষমতা শিখিয়ে তৈরি করা যায় না। তাহলে, শিখিয়ে বা পথ দেখিয়ে কী হতে পারে? একজনের গাইবার ক্ষমতা আছে, ভালো গুরুর কাছে তালিম নিয়ে তাঁকে আরও নিখুঁত করে তুলতে পারে সে। একটা গান কীভাবে উপস্থাপিত করতে হয়, কীভাবে তা আরও পারফেক্ট চেহারা নিতে পারে-  তা জানার জন্য গান শিখতে হবে, রেওয়াজ করতে হবে, যা যা দরকারি সাধনা, সব করতে হবে। কিন্তু যে গাইবার ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়নি, সে যতই শিখুক গানটা গাইতে পারবে না।এই যে  বড় বড় যন্ত্রসংগীত-শিল্পীরা আছেন, তাদের ভিতরে কিন্তু সুরের বোধ প্রবল, পাণ্ডিত্যও প্রচুর। হয়তো গাইবার ক্ষমতা নেই বলে তাঁরা কোনও একটা বাদ্যযন্ত্র ধরেছেন। কিন্তু মানুষের প্রথম প্রেমই থাকে কণ্ঠসংগীত বা ভোকাল মিউজিকের উপর। এ আমার সম্পূর্ণ নিজের বিশ্লেষণ। আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে যা বুঝেছি, সেটুকুই বললাম। সেজকাকু বলতেন, যদি কারও গাইবার ক্ষমতা না থাকে, হাজার শিখিয়েও তার ভেতরে সে ক্ষমতা তৈরি করা যায়না। উনি বলতেন, রাগরাগিণী পরের কথা, আগে সংগীতের যে বেসিক ফাউন্ডেশন, সা থেকে নি পর্যন্ত যে ১২ টা নোট বা স্বর আছে, তাদের ভালো করে চেনা দরকার। চেনা মানে কী! আমাদের ব্রেন অনেকটা কম্পিউটারের হার্ড ডিস্কের মতো। এখন প্রত্যেকটা স্বরের আলাদা ফ্রিকোয়েন্সি আছে, সেই ফ্রিকোয়েন্সিগুলোকে চিনতে হবে, ব্রেনে গেঁথে ফেলতে হবে। আর তাদের বিভিন্ন পারমুটেশন কম্বিনেশনের যে রেওয়াজ আছে, মন দিয়ে সেগুলো করতে হবে।প্রপার গুরুর কাছে রেওয়াজ করা… এ ব্যাপারে সেজকাকু বলতেন, পথ যদি কোনও গুরু ঠিকভাবে না দেখান, অথবা দুর্ভাগ্যবশত কোনও ছাত্র যদি অপটু হাতে পড়ে যান, তাহলে তাঁর শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়না। সা থেকে নি, এই স্বরসপ্তকই গানের বেসিক। প্রতিটি স্বরের ফ্রিকোয়েন্সিগুলোকে আলাদা করে চেনা দরকার, যাতে সেই স্বর আমাদের মাথার সেনসেশন থেকে গলায় নেমে আসতে পারে।

আমাদের একটা খুব ভুল ধারণা আছে যে আমরা গলা দিয়ে গান করি। গলা দিয়ে নয়, আমরা গান করি মাথা দিয়ে। গলা বা কণ্ঠনালী শুধু সুরের নির্গমনটুকু ঘটায়। এটা আমার কথা নয়, সেজকাকুরই কথা। সেজকাকু যেহেতু কোনওদিনই প্রফেশনালি গান শেখাননি কাউকে, এক আমি কিছুটা তাঁর তালিম পাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলাম। তাই গান নিয়ে তাঁর এই মূল্যবান কথাগুলো সবার কাছে তুলে ধরলাম। সেজকাকু বলতেন,  ‘আগে তোমাকে নিজের ব্রেনের উপর কর্তৃত্ব নিয়ে আসতে হবে। প্রত্যেক স্বরের আলাদা ফ্রিকোয়েন্সি জানতে হবে। তাঁর জন্য সা থেকে নি পর্যন্ত বিভিন্নরকম পালটা, বিভিন্নরকম কম্বিনেশন অফ নোটস তৈরি করে রেওয়াজ করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যে সুর কানে শুনছি গলাও যেন সেই ফ্রিকোয়েন্সির সঙ্গে মেলে। এই শিক্ষাটুকু বা ক্ষমতাটুকুও কিন্তু নিজেকেই তৈরি করতে হবে। এটা শেখানো যায় না। কানে যা শুনছি আর গলায় যে স্বর বেরোচ্ছে, দুটো মিলছে কী না সেটা নিজেকেই যাচাই করতে হবে। প্রকৃত গুরু নিশ্চয়ই ভুল ধরিয়ে দেবেন, পথ বাতলে দেবেন। কিন্তু চলাটা তোমার হাতে।’ এই প্রশ্নটা যাঁরা করেছেন, যে শিখে কি মান্না দে হওয়া যায়, তাঁদের বলব, না, শুধু শিখে কোনও বড় শিল্পী হওয়া যায় না। শিক্ষা পারফেকশন দেয়। কিন্তু তার আগে গায়ক হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে জন্মাতে হয়।’

সেজকাকুকে বরাবরই লক্ষ্য করতাম আমি। কেবল ভাইপো তো নয়, আমি তাঁর ছাত্রও ছিলাম। তো অনেকসময় দেখেছি, সেজকাকু হয়তো একটু ঘুমোচ্ছেন, কিন্তু তাঁর পায়ের বুড়ো আঙুলটা নির্দিষ্ট মাত্রা অন্তর নড়ছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি কত বড় সাধক ছিলেন উনি।  কোনও একটা মিউজিক নিয়ে ভাবতে ভাবতে হয়তো ঘুমিয়েছেন। তাই ঘুমোচ্ছেন, কিন্তু অবচেতনে সেই তালটা পড়ছে। এমন মানুষকে সাধক ছাড়া কী বলবেন!

এই প্রসঙ্গে আরও কিছু কথা না বললে বিষয়টা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাঁর সুদীর্ঘ সংগীত জীবনে এমন কোনও দিকপাল মিউজিক ডিরেক্টর নেই, যাঁর সঙ্গে সেজকাকু কাজ করেননি। তিনি তো মূলত সুগম সংগীত চর্চা করেছেন। আর সেই অর্থে যাঁরা সুগম সংগীতের ভগবান, খ্যাতির চূড়ায় উঠেছিলেন তাঁদের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি। আমি সেই সৌভাগ্যবান, যার কাছে এইসব কাজের অভিজ্ঞতা ঘরোয়াভাবে অ্যানালিসিস করতেন সেজকাকু। তিনি মূলত আমার শেখার জন্যই এসব উদাহরণ দিতেন। যাঁদের কথা বলতেন তাঁরাও প্রত্যেকে ভারতবর্ষের গৌরব। তাঁদের গানবাজনার গভীরতা, গায়নকৌশল- এসব নিয়ে তালিমের সূত্রে নানান ব্যাখ্যা দিতেন সেজকাকু। সেসব গুরুবাক্য, সেজকাকুর অবর্তমানে প্রকাশ করব না। তবে ভালো করে গান শেখার জন্য সেজকাকুর একটাই উপদেশ, ভালো গুরু ঠিক কর। কারণ গুরুই পথ দেখাবেন। গানবাজনার শুরুতেই ছাত্রছাত্রীদের একটা বেসিক স্কেল ঠিক করতে হয়, যে স্কেলে সে সরগম সাধনা করবে। শিক্ষার্থীর গলার পিচ অনুযায়ী সেই স্কেল ঠিক করে দেবেন গুরু।

কথাতেই বলে ভগবান মুখ দিয়েছেন একটা, কিন্তু কান দিয়েছেন দুটো। বলার বেশি শুনতে হবে। গানবাজনার ক্ষেত্রেও এই শ্রবণ খুব জরুরি। অনেকসময় আমাদের শোনাটা মস্তিষ্ক অবধি পৌঁছয় না। শোনায় খামতি থেকে যায়। লোয়ার, মিডল বা হাই অকটেভ, এই বিভিন্ন স্বরস্থান দাঁড়িয়ে আছে নোটসের উপর। সরগমের সেই নোটগুলোকে চিনতে হবে। সা থেকে নি, কোমল শুদ্ধ মিলিয়ে ১২টা স্বর, তাদের পারমুটেশন কম্বিনেশন করে জটিল থেকে জটিলতর সরগম প্র্যাকটিস করে যেতে হবে। গলার উপর যদি কন্ট্রোল এসে যায়, মানে আমি যেখানেই চাইব গলা লাগাতে পারব, তাহলেই সংগীতশিক্ষার অর্ধেক কাজ শেষ। ব্যাপারটা খুব সহজ নয়, কিন্তু যথাযথভাবে গান শিখতে গেলে এইভাবেই গলা তৈরি করতে হবে। আমার গুরু, আমার বাবা প্রণব দে আর সেজকাকু মান্না দে। এঁরা নিজেরাও এই একই পথে তাঁদের গুরু, আমার দাদু কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কাছে সংগীতশিক্ষা করেছেন।

 

ক্রমশ…

মেল যোগাযোগ – [email protected]

 

আমার সেজকাকু (বিংশ পর্ব)

You might also like