Latest News

আমার সেজকাকু (দ্বাবিংশ পর্ব)

সুদেব দে

সেজকাকুর কথা প্রসঙ্গে বিভিন্নসময় সঙ্গীত জগতের নানা গুণী মানুষের কথা মনে পড়ে। কাকার স্মৃতিচারণে আমার মধ্যে একটা অগোছালো ভাব থাকে। আমার মনে হয়, এটাই আমার বিশেষত্ব। আসলে কাকার সঙ্গে তো ধারাবাহিকভাবে এমন আলোচনা হত না। আমি সাল তামামি নিয়ে গবেষণা করতেও বসিনি। গানবাজনার প্রসঙ্গে কাকা বিভিন্ন সময়ে যা বলেছেন, তা দিয়েই একটা মালা গাঁথার চেষ্টা করছি। আমি একাধারে ছিলাম তাঁর ভাইপো, সন্তানতুল্য, আবার গানবাজনার জগতে তাঁর ছাত্রও।
আজকে খুব বলতে ইচ্ছে করছে পরমশ্রদ্ধেয় সুরকার নচিকেতা ঘোষের কথা। সেজকাকুর সঙ্গে নতিকেতা ঘোষের প্রথম আলাপ বম্বেতে, অভিনেতা বিশ্বজিতের ছবি ‘ছোট্ট জিজ্ঞাসা’র হিন্দি ভার্সন ‘ছোটা সা সওয়াল’-এর শ্যুটিং ফ্লোরে। কাকা জন্মসূত্রে বাঙালি হলেও সেই ৪২ সালেই তিনি বম্বে চলে যান, এবং সেখানেই সেটল করেন। সেইজন্য তাঁর যাবতীয় কর্মসূত্র বম্বেতেই।
আমাকে গান শেখাতে গিয়ে তো বটেই, এমনকি কথাপ্রসঙ্গেও সেজকাকু বারবার বলতেন, ‘দুজন মানুষ না থাকলে আমার বাংলা গান গাওয়া হত না।’ প্রথমজন নিঃসন্দেহে আমার ঠাকুমা, মানে সেজকাকুর মা মহামায়া দেবী। উনি ছেলেকে প্রায়ই তাড়না করতেন এই বলে যে ‘তুই এত হিন্দি গান গাস, বাংলা গান গাস না কেন?’ আর দ্বিতীয় জন, শ্রদ্ধেয় সুরকার সুধীন দাশগুপ্ত। সেজকাকুকে দিয়ে বাংলা গান গাওয়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান সুধীন দাশগুপ্তেরই। যদি ৫৮ সাল নাগাদ ‘ডাকহরকরা’ ছবিতে সুধীন দাশগুপ্ত সেজকাকুকে দিয়ে গান না গাওয়াতেন, এবং গানবাজনার ক্ষেত্রে সেজকাকুর যে বহুমুখী পারদর্শিতা, তা যদি তিনি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পারতেন, তাহলে বাঙালি জাতি মান্না দে’র কণ্ঠে কখনও এত ভালো ভালো বাংলা গান পেতনা।

‘ডাক হরকরা’ ছবিতে সুধীন দাশগুপ্তর সুরে সেজকাকু গাইলেন দুটি গান ‘ওগো তোমার শেষ বিচারের আশায় আমি বসে আছি’ আর ‘লাল পাগুড়ি বেঁধে মাথায়’। ছবিতে শান্তিদেব ঘোষের লিপে ছিল এই গান দুটো। শান্তিদেব ঘোষ বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, এবং উনি চেয়েছিলেন এই গান দুটো উনিই গাইবেন। কিন্তু সুধীন দাশগুপ্তর মনে হয়েছিল এই গানদুটো মান্না দা গাইলে তার একটা অন্য ডাইমেনশন তৈরি হবে। কোনও শিল্পীকে ছোটো না করেই বলছি। সুধীন দাশগুপ্ত আগেই সেজকাকুকে অনুরোধ করে বলেছিলেন ‘কিছু মনে করবেন না, আপনি একবার শান্তিদেব ঘোষের সামনে গানদুটো কাইন্ডলি গেয়ে শোনান’। কাকা তাঁর নিজস্ব অধীত যে স্কিল, তাই দিয়েই গানদুটো তুলে নোটেশন করে এক্সপ্রেশন দিয়ে গেয়ে শুনিয়েছিলেন শান্তিদেব ঘোষকে। সে গান শুনে শান্তিদেব ঘোষ নিজেই স্বীকার করে নেন যে, ‘এ গান মান্নাবাবুর মতো আমি গাইতে পারব না। এ গান মান্নাবাবুই গাক’। এই হল প্রকৃত শিল্পীর মর্যাদা।

যাই হোক, আগের প্রসঙ্গে ফিরি। সেজকাকু নচিবাবুর সুরে প্রথম প্লে-ব্যাক করেন ১৯৫৫ সালে ‘কুরবানি’ ছবিতে ‘সিপাই হু ম্যায়’ গানে। কিন্তু ছবিটা পরে রিলিজড হয়নি (তথ্যসূত্র- সপ্তর্ষি)। সেই যে বম্বের স্টুডিওতে নচিবাবুর সঙ্গে সেজকাকুর আলাপ হল, তারপর নচিবাবুও বুঝেছিলেন সেজকাকুকে দিয়ে তাঁর বিভিন্ন কম্পোজিশনে ভালো কাজ হবে। আমাকে একটা কথা প্রায়ই বলতেন সেজকাকু, বলতেন, ‘আমি তো নচিবাবুর সুর শুনে অবাক হয়ে যেতাম! সুরের মধ্যে কীভাবে নাটকীয়তা আনা যায়, এক্সপ্রেশন তৈরি করা যায়, সেটা নচিবাবুর সঙ্গে কাজ না করলে জানতে পারতাম না’।

সেজকাকু এমন একজন শিল্পী যিনি তৎকালীন বম্বের সমস্ত প্রতিষ্ঠিত সুরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন, এবং কলকাতাতেও প্রচুর মিউজিক ডিরেক্টরের সঙ্গে কাজ করেছেন, ফলে তাঁর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সত্যিই অপরিসীম। আমার প্রবল সৌভাগ্য যে এমন একজন মানুষের সান্নিধ্যে থেকেছি। যখন আমায় সঙ্গে করে তালিম দিতে বসতেন তখন বিভিন্ন মিউজিক ডিরেক্টরের সম্বন্ধে বলতেন সেজকাকু। তাঁদের মেরিটস মানে ভালো দিকটাই বেশি বলতেন সেজকাকু, আবার কোথায় সমস্যা আছে সেটাও বলতেন। সেসব কথোপকথনের স্মৃতিও একটা বিরাট সাংগীতিক দলিল হিসাবে কাজ করে আমার জন্য।

নচিবাবুর একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। তখন শ্যামবাজারে থাকতেন নচিকেতা ঘোষ। ঘড়িওয়ালা বাড়ির উল্টোদিকের বাড়ির উপরে তিনতলায় রিহার্সাল হত। তো একদিন হঠাৎ করে নচিবাবু সেজকাকুকে বললেন “মান্নাবাবু একটা নতুন গানে সুর করছি, আপনি একটু শুনুন।” সেদিন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়েরও আসার কথা। ফোন করে জানা গেল, ওঁর খুব জ্বর, আসতে পারবেন না। কিন্তু সেদিন সুরের নেশায় আচ্ছন্ন নচিকেতা ঘোষ। তিনি ফোনেই পুলকবাবুকে বললেন ‘আপনি দুলাইন অন্তত বলুন, আমি সুর করি। বাকি পরে দেখা যাবে।’ তো পুলকবাবু ফোনেই বললেন একটা লাইন ‘ক ফোঁটা চোখের জল ফেলেছ যে তুমি ভালোবাসবে!’ এ গান ইতিহাস হয়ে গেছে আজ। কিন্তু গানটা গড়ে ওঠার আগেই এই গানের সুর যেন ভেবে রেখেছিলেন নচিকেতা ঘোষ। এসবই আমার সেজকাকুর মুখে শোনা কথা। নিজের চোখে দেখিনি, দেখার কথাও নয়। তখন হয় আমি জন্মাইনি, বা জন্মালেও খুব ছোট্ট। পরে সেজকাকু বলেছিলেন, ‘দুটো লাইনের এমন অসাধারণ সুর করলেন নচিবাবু, আমি শুনে এত টাচড হলাম! গানের প্রতি এতখানি জাস্টিস! এর থেকে ভালো সুর হতেই পারে না…’
গানবাজনার ব্যাপারে একটু জেদি মানুষ ছিলেন নচিবাবু। তিনি ওই দুলাইন সুর করেই এমন খেপে উঠলেন, পুলকবাবুকে ফোন করে বললেন, ‘যতই জ্বর হোক, আপনাকে আজ একবার আসতেই হবে’। জ্বর গায়েই পুলকবাবু এলেন। গানবাজনা শুরু হয়েছিল সকাল ১০টা-১১ টার সময়, সেই গান বেঁধে সুর করে শেষ হল বিকেল ৪টের সময়। যতক্ষণ না গানটা কমপ্লিট হল, উনি ছাড়লেন না। এমনই ছিলেন নচিকেতা ঘোষ।

সেজকাকু ও নচিকেতা ঘোষ

নচিকেতা ঘোষের সুরে সেসময় একের পর এক অসাধারণ গান গেয়েছেন সেজকাকু। তাঁর খুব প্রিয় গান ছিল ‘আমার ভালোবাসার রাজপ্রাসাদে নিশুতি রাত গুমড়ে কাঁদে’, ‘ওগো বর্ষা তুমি ঝোরো না গো অমন করে’ কিংবা ‘যদি কাগজে লেখ নাম’… এগুলো সবই বেসিক গান। এছাড়া ছবির গান তো প্রচুর আছেই। ১৯৫৭ সালে ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’ ছবিতে প্রথম নচিবাবুর সুরে বাংলা গান গাইলেন সেজকাকু। ডুয়েট গান, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তারপর ধরুন, ‘সন্ন্যাসী রাজা’ ছবিতে ‘কাহারবা নয়, দাদরা বাজাও’-এর মতো কালজয়ী গান বা স্ত্রী ছবির গান ‘হাজার টাকার ঝাড়বাতিটা’, ‘সখী কালো আমার ভালো লাগে না’ কিংবা নিশিপদ্ম ছবির অসামান্য সেসব গান ‘যা খুশি ওরা বলে বলুক’ আর ‘না না না আজ রাতে আর যাত্রা শুনতে যাব না’। কত বলব! ‘সন্ন্যাসী রাজা’ ছবিটা তো শুধু গানের জন্যই বিখ্যাত।

সেজকাকুর মুখে শুনেছি নচিকেতা ঘোষের একটা বিরাট ক্ষমতা ছিল। একটা গানে সুর দিয়ে যখন তিনি পরের গানে যাচ্ছেন, সম্পূর্ণ আলাদা সুর। কোথাও মিল পাওয়া যাবে না। কাকা বলতেন ‘আমি অনেক সুরকারের সঙ্গে কাজ করেছি। তাঁদের সুর করা পরপর দুটো গানে একটা সাদৃশয় থাকত। সিগনেচার বলা যায়। কিন্তু নচিবাবু ছিলেন একেবারে অন্য গোত্রের। তাঁর গানে দেখেছি একেবারে চমকে দেওয়ার মতো আলাদা সুর। আগের গানের সঙ্গে কোনও সাদৃশ্যই খুঁজে পাওয়া যেত না।
অনেকেই জানেন না, নচিকেতা ঘোষ কিন্তু একজন পাশ করা ডাক্তার। কিন্তু সুরের টানে ডাক্তারি পেশাকে তুচ্ছ করে গানের জগতে আসেন। কাকা বলেছিলেন ‘প্রথম যখন নচিবাবুর সুর করা শুনি, আমি অবাক হয়ে গেছিলাম ওঁর ক্ষমতা দেখে। ক্লাসিক্যাল গানের চলন সম্পর্কে ওঁর যথেষ্ট পারদর্শিতা যেমন ছিল, তেমন ওয়েস্টার্ন গানেরও ইনফ্লুয়েন্স ছিল ওঁর মধ্যে। মানে নিয়মিত ওয়েস্টার্ন গান শুনতেন তিনি।’ আসলে তখনকার যুগে একজন বাঙালি সুরকার হিসাবে নচিবাবুর দৃষ্টিভঙ্গি এতটাই ওপেন ছিল, ইন্ডিয়ান মিউজিক এবং ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকাল দুটো ব্যাপারেই খুব গভীর জ্ঞান ছিল তাঁর। আর এই গুণগুলোই নচিকেতা ঘোষ সম্পর্কে সেজকাকুকে বিশেষ শ্রদ্ধাশীল করে তুলেছিল।

গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, উত্তম কুমার আর নচিবাবুর সঙ্গে সেজকাকু

নচিকেতা ঘোষের সুরে সেজকাকুর গাওয়া গানের যে অমূল্য ভাণ্ডার রয়েছে, তার তালিকা করতে যদিও আমি বসিনি, কিন্তু বিভিন্ন সময় কথা প্রসঙ্গে নচিবাবুর প্রতিভার প্রতি সেজকাকুর যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দেখেছি, তারই সূত্র ধরে কিছু কথা উল্লেখ না করে পারছি না। এই প্রসঙ্গে বলি, নতিকেতা ঘোষের মেয়ে শ্রাবণী ঘোষ মন্ডল একজন ভালো গায়িকা। আমারও বিশেষ বন্ধু। শ্রাবণীর মুখেও শুনেছি ১৯৭৪ সালে ‘মৌচাক’ ছবির রেকর্ডিং হয়েছিল বম্বেতে। ‘মৌচাক’ ছবিতে কাকার গাওয়া সেইসব অনবদ্য গান, যা আজও বেঁচে আছে বাঙালির মনে। এখনও লোকে আমার কাছে শুনতে চায় কাকার গাওয়া ‘এবার মলে সুতো হব’ বা ডুয়েটে ‘পাগলা গারদ কোথায় আছে’র মতো গান। কিংবা ধরুন ‘সুজাতা’ ছবির গান ‘কত না নদীর জন্ম হয়’, যেটা আশ্চর্যভাবে আমার আর সেজকাকুর দুজনেরই খুব প্রিয় গান। একবার আমিই সেজকাকুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘কীভাবে গেয়েছ এই গানটা?’ সেজকাকু কোনওদিনই আত্মপ্রচার পছন্দ করতেন না। বলেছিলেন ‘সবই নচিবাবুর সুরের গুণে’… আহা! যারা শোনেননি ওই গানটা অতি অবশ্যই শুনবেন।
‘ছুটির ফাঁদে’, ‘কাজললতা’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’ কত নাম করব! ‘সন্ন্যাসী রাজা’র সব গানই তো সুপারহিট, আজও মুখে মুখে ফেরে। আরেকটা গানের কথা বলি, ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ ছবিতে ‘কিচিমিচি কিচিমিচি’, পাগলের গলায় তুতলে তুতলে গান… একজন প্লে-ব্যাক সিঙ্গার কতখানি ভার্সেটাইল হলে এমন গান গাওয়া যায় ভাবতে পারেন! পাঠকদের অনুরোধ করব কখনও মন দিয়ে গানটা শুনতে। ‘আনন্দমেলা’ ছবিতে একটা গান ছিল ‘আমি উকিল না হয়ে যদি কোকিল হতাম’, অসাধারণ গান। ১৯৭৬ এ ‘হোটেল স্নো ফক্স’ ছবিতে অনেকগুলো গান গেয়েছিলেন সেজকাকু। কিন্তু কেন জানিনা গানগুলো হিট করেনি। ‘সেই চোখ’ বলে আরও একটা ছবিতে নচিকেতা ঘোষের সুরে একাধিক গান ছিল সেজিকাকুর। ছবিটার সঙ্গে সেই গানগুলোও চলেনি। সেজকাকুর একটা দুঃখ ছিল সেটা নিয়ে। আসলে গান ভালো হলেই তা সবসময় দর্শকের মনে জায়গা পায়না। তার জন্য আরও নানা রসায়ন লাগে। কিন্তু কোয়ালিটির হিসাবে হোটেল স্নো ফক্স’-এর গানগুলো অনবদ্য। তার মধ্যে আমার খুব প্রিয় গান ‘সুরাপানে নেশা হয়না’। গানের তালিকা তো বলে শেষ করা যাবে না। পরিশেষে ‘ব্রজবুলি’ বলে একটা ছবির কথা বলি। এই ছবির গানগুলো শুনলে বোঝা যাবে সুরকার গীতিকারের কতটা দক্ষতা থাকলে এমন গান সৃষ্টি হয়। সেজকাকুর গায়নদক্ষতার কথা আর কী বলব!

পরিশেষে একটা কথা বলি, অনেকেই জানেননা সুরকার নচিকেতা ঘোষ আর গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, এরা দুজন সমবয়সী আর এক ক্লাসের বন্ধু ছিলেন। ফলে লেখা আর সুরারোপ করা গানে এক আশ্চর্য রসায়ন ছিল। যে রসায়ন এখনও অমর হয়ে আছে বাংলা গানের জগতে।

ক্রমশ…

মেল যোগাযোগ – [email protected]

 

আমার সেজকাকু (একবিংশ পর্ব)

You might also like