Latest News

২ জুলাই জেলমুক্তি, এই তারিখেই প্রান্তিকদের জন্য কাজ শুরু নাইজেলের! চলছে অটিস্টিকদের নিয়ে নাটকের মহড়া

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘মোর পদ্মাসনতলে রহিবে আসন তোর,
নিত্য নব নব গীতে সতত রহিবি ভোর।
বসি তোর পদতলে কবিবালকেরা যত
শুনি তোর কণ্ঠস্বর শিখিবে সঙ্গীত কত!
এই নে আমার বীণা দিনু তোরে উপহার
যে গান গাহিতে সাধ ধ্বনিবে ইহার তার!’

দেবী সরস্বতীর বরে দস্যু রত্নাকর হয়ে উঠেছিলেন আদিকবি বাল্মিকী। এই পৌরাণিক কাহিনি যেন জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন অভিনেতা নাইজেল আক্কারা ভিকি (Nigel Akkara Vicky)। ২ জুলাই (2nd July), নাইজেলের জীবনে উল্লেখযোগ্য তারিখ। কারাগারের অন্ধকার জীবন কাটিয়ে এই তারিখেই সংশোধনাগার থেকে বেকসুর খালাস (Freedom) পেয়েছিলেন নাইজেল। সেদিন থেকেই নাইজেলের নতুন এক লড়াই শুরু, সমাজের চোখে স্বীকৃতির লড়াই।

সেই স্বীকৃতি মিলেছে, এবার তার উদযাপনের পালা। তাই এই তারিখেই নাইজেল প্রতিষ্ঠা করেছেন তাঁর দুটি নিজস্ব সংস্থা ‘কোলাহল থিয়েটার ওয়ার্কশপ’ ও ‘কলকাতা ফেসিলিটিস ম্যানেজমেন্ট’। তারও ১২ বছর হয়ে গেল। গতকাল বেহালায় নিজের সংস্থার জন্মদিনে ছোট শিশুদের নিয়ে কেক কাটলেন নাইজেল। শিশুরাই তো আগামীর কথা বলবে!

Image - ২ জুলাই জেলমুক্তি, এই তারিখেই প্রান্তিকদের জন্য কাজ শুরু নাইজেলের! চলছে অটিস্টিকদের নিয়ে নাটকের মহড়া

নাইজেলের জীবনের শুরুটা কিন্তু এমন আঁধারঘেরা ছিল না। সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল থেকে পড়াশোনা, তারপর সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের অ্যাকাউট্যান্সি অনার্সের ঝকঝকে তরুণ তখন ভিকি। ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯.৪০ অব্দি কলেজ। কিন্তু ভুল বন্ধুবৃত্তের কবলে পড়ে ভুল পথে চলে আসা তাঁর। আর সেখান থেকেই শুরু বিপদের। ফাইনাল ইয়ারে নাম উঠল পুলিশের খাতায়। ১৮টি অপরাধমূলক মামলায় জড়িয়ে সাজা হল কারাবাস।

২০০০ সালে যখন পৃথিবী দেখছে নতুন যুগের স্বপ্ন, তখনই এক তরুণের স্বপ্নের সমাধি হতে চলেছে গারদের ওপারে। তবে এই শাস্তির মধ্যেই লুকিয়েছিল তাঁর উত্তরণের বীজ। তাই দীর্ঘ ন’বছরের লড়াই শেষ করে ২০০৯ সালের ২ জুলাই সমস্ত মামলায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পান নাইজেল। যদিও নাইজেল নিজে এই ন’বছরের জীবনকে লড়াই বলতে রাজি নন। তাঁর মতে, এটা তাঁর ন’বছরের শিক্ষা।

‘দ্য ওয়াল’কে টেলিফোনে নাইজেল জানালেন, ‘আজ থেকে ১৩ বছর আগে, ২০০৯ সালের ২ জুলাই আমি সংশোধনাগার থেকে ছাড়া পেয়েছিলাম। জেলখানাকে আমরা সংশোধনাগার বলি। কারণ এটা আমাদের কাছে একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংশোধনের জায়গা। সেখানেই আমি জীবনের সবথেকে বড় পড়াশোনাটা করেছি। পাশাপাশি জেলে থাকাকালীন স্নাতক স্তরের ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষাও দিই। তারপর হিউম্যান রাইটস নিয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করি। জেল থেকে বেরিয়ে প্রথম কম্পিউটার শিখি। ছোটবেলা থেকে সাইকোলজি পড়ার ইচ্ছে ছিল, তাই সাইকোলজি কোর্সও করি।

Image - ২ জুলাই জেলমুক্তি, এই তারিখেই প্রান্তিকদের জন্য কাজ শুরু নাইজেলের! চলছে অটিস্টিকদের নিয়ে নাটকের মহড়া

কিন্তু জেলের ছাপ পড়ে গেলে বায়োডেটাতে কাজ পাওয়া মুশকিল। সেটাই ভীষণভাবে ফেস করেছি। তাই ২০১০ সালের ২জুলাই আমি ‘কলকাতা ফেসিলিটিস ম্যানেজমেন্ট’ কোম্পানি তৈরি করি, কয়েকজন লোককে নিয়ে ট্রেনিংয়ের কাজ শুরু করি। ম্যানপাওয়ার সাপ্লাইয়ের কোম্পানি। আমরা মূলত ক্লিনিংয়ের কাজ করতাম। কিন্তু জেল থেকে বেরোনো মানুষকে কে বিশ্বাস করবে! প্রথম ক্লিনিংয়ের কাজ আমরা করেছিলাম কলকাতার আইজি-র বাংলোতে। তৎকালীন আইজি, বি ডি শর্মা আমায় এই সুযোগ দেন। তারপর এই কাজের দৌলতে একটি বেসরকারি চ্যানেল থেকে পুরস্কারও পেয়েছিলাম।

তাছাড়া মঞ্চে অলকনন্দা রায়ের পরিচালনায় ‘বাল্মিকী প্রতিভা’তে অভিনয় করে দর্শকের সামনে আসি। এরপরই আমায় শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় ডেকে নেন ‘মুক্তধারা’র হিরোর চরিত্রে। আর তার পর তো ইতিহাস। এখন আমার সংস্থায় সমাজের বহু প্রান্তিক মানুষদের, জেল থেকে ছাড়া পাওয়া তরুণদের কর্ম সংস্থান দিই আমি। এর পর মনে হল ভাল ছবি করার ফাঁকে নাটকের গ্রুপ তৈরি করি। সেখান থেকেই ২০১৭ সালের ২জুলাই শুরু হল ‘কোলাহল থিয়েটার ওয়ার্কশপ’-এর পথ চলা।

Image - ২ জুলাই জেলমুক্তি, এই তারিখেই প্রান্তিকদের জন্য কাজ শুরু নাইজেলের! চলছে অটিস্টিকদের নিয়ে নাটকের মহড়া

আমার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত মামলায় আমি নির্দোষ প্রমাণিত হই ২ জুলাই। তাই এই নবজন্মের দিনটিকে মনে রেখেই শুরু করি আমার নতুন পথ চলা। এই সংস্থা দুটি প্রতিষ্ঠা করি এই তারিখেই। এই তারিখ আমার জীবনে আলোর দিশা।

নাইজেলের ‘কোলাহল থিয়েটার ওয়ার্কশপ’ অনেক দিন ধরেই সমাজের প্রান্তিক ও অবহেলিত মানুষদের নিয়ে মঞ্চ-নাটক আয়োজন করেছে। ট্রান্সজেন্ডার দিয়ে নাটক ‘বিষাক্ত পাঁচালি’, যৌনকর্মীদের নিয়ে ‘ঝরাফুলের রূপকথা, ড্রাগ অ্যাডিক্টেডদের অন্য জীবন দিতে ‘বেওয়ারিশ’ নাটক– এই সমস্তর ভাবনায় ছিলেন নাইজেল। এখন তিনি অটিস্টিক মানুষদের নিয়ে নতুন নাটকের মহড়া দিচ্ছেন দিনভর। তাঁদের নিয়ে ‘চুপচাপ চার্লি’-র প্রথম শো হবে আগামী ডিসেম্বরে।

Image - ২ জুলাই জেলমুক্তি, এই তারিখেই প্রান্তিকদের জন্য কাজ শুরু নাইজেলের! চলছে অটিস্টিকদের নিয়ে নাটকের মহড়া

নাইজেল বললেন, ‘অটিজম আক্রান্ত সব বয়সের মানুষদের নিয়ে এই নাটক। আছে অনেক ছোটরাও। তারাই অভিনয় করছে, গান গাইছে। আমি একটা অটিস্টিক স্কুলে চিফ গেস্ট হয়ে গেছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম ওরা প্রতিবন্ধকতা জয় করে নাচগানও করতে পারে। তবে ওরা খুব মুডি। ওদের ভেবেই এই নাটকের ভাবনা ও ওয়ার্কশপ। স্পিচ থেরাপি থেকে অভিনয় সবটাই শিখছে ওরা। ‘চুপচাপ চার্লি’র চিত্রনাট্য লিখছেন এক মা, যাঁর সন্তান অটিস্টিক। আমার সঙ্গে পরিচালনার দায়িত্বে আছেন জহর দাস।

এই নাটকে আবার মঞ্চে অভিনয় করব আমিও। সঙ্গে দেখা যাবে দেবলীনা কুমারকে। গানে অটিস্টিক মানুষদের সঙ্গে গাইবেন ইমন চক্রবর্তী, দুর্নিবার সাহা, শোভন গাঙ্গুলি, তিমির বিশ্বাস, প্রাজ্ঞ দত্ত। এছাড়াও নাটকে কবি সুবোধ সরকার একটি কবিতা লিখেছেন, যা আবৃত্তি করবেন ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়।’

Image - ২ জুলাই জেলমুক্তি, এই তারিখেই প্রান্তিকদের জন্য কাজ শুরু নাইজেলের! চলছে অটিস্টিকদের নিয়ে নাটকের মহড়া

‘মুক্তধারা’, ‘অনন্যা’, ‘অন্য অপালা’, ‘গোত্র’র মতো ছবি করার পরে বর্তমানে অরিন্দম শীল পরিচালিত ‘তীরন্দাজ শবর’ ছবিতে সেরা প্রাপ্তি ‘সুমিত’ নাইজেল আক্কারা ভিকি। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেভাবে অভিনয় করেছেন নাইজেল, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। তবু ফিল্মে নাইজেলের বেশিরভাগ চরিত্রই হয় এমন, যারা জেল ফেরত আসামী। জেলকেন্দ্রিক গল্পের নায়ক বা কোনও ধূসর চরিত্রেই তাঁকে নির্বাচন করেন পরিচালকরা। তবে এই নিয়ে নাইজেলের আক্ষেপ নেই।

নাইজেলের স্পষ্ট জবাব, ‘যে চরিত্রের জন্য পরিচালক আমাকে যোগ্য ভাবছেন সেটাকে আমি অমর্যাদা কখনও করি না। পরিচালককে কতটা বেস্ট আমি দিতে পারব, সেটা আমি দেখে নিই। আজকাল আমি কম কাজ করি, ভাল ছবি, ভাল রোল পেলে তবেই করি। ‘গোত্র’র পর অনেক ছবির অফার এলেও কোনও না কোনও কারণে করিনি। তারপর ‘তীরন্দাজ শবর’ করলাম। এমন চরিত্রই করি বা করতে চাই, যাতে দর্শকরা সিনেমাহল থেকে বেরিয়েও আমাকে মনে রাখেন। যে কোনও মানুষ যতই পজিটিভ হোন, তাঁর চরিত্রে কিছু নেগেটিভ শেড থাকেই। জেল কেন্দ্রিক ছবির হিরো হওয়া নিয়েও আমার আপত্তি নেই, যদি ভাল চিত্রনাট্য হয়। কারণ দর্শক ইউসুফ, তারেক আলিকে মনে রেখেছে। আমার কোনও আক্ষেপ নেই। টালিগঞ্জ পাড়ার হিরোদের সঙ্গে আমি কোন প্রতিযোগিতার দৌড়ে নেই। আমি আমার মতো করে দর্শককে আনন্দ দিতে চাই।’

বম্বেতে হিন্দি ছবি করতে যাওয়াই মিঠুর কাল হল! কেমন আছেন স্বয়ংসিদ্ধা মর্জিনা

You might also like