Latest News

উপাচার্যের ফোনেও অনড়, তৃণমূল নেতার ছেলের হাতে মার খাওয়া যাদবপুরের রক্ষী বলছেন ‘বিচার চাই’

অঙ্গীরা চন্দ

অন্যায়ের বিরুদ্ধে হোক কলরবের নেশা যাদবপুরে চিরকালীন। ইউনিভার্সিটি চত্বরে ঢুঁ মারলেই তার আঁচ পাওয়া যায়। প্রতিবাদী স্লোগানে ছয়লাপ দেওয়ালের পর দেওয়াল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিদ্রোহী মেজাজ ছড়িয়ে পড়ছে ক্যাম্পাসের বাইরেও। সাম্প্রতিক ঘটনায় ধরা পড়ল তেমনই ছবি।

ইউনিভার্সিটির চার নম্বর গেটের সামনে মোটামুটি চেনা নাম বলরাম সাহা। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান বিল্ডিংয়ে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করতেন। কিন্তু বেশ কয়েক বছরের ধারাবাহিক চাকরি জীবন তোলপাড় হয়ে যায় মাস দুয়েক আগে। অভিযোগ, ক্ষমতার চোখ রাঙানিতে চাকরিটাই চলে যায় তাঁর।

কী অভিযোগ? মে মাসের ১৪ তারিখ গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়য়ের চার নম্বর গেটের সামনে কর্তব্যরত ছিলেন বলরামবাবু। সেই সময় গাড়ি নিয়ে এক যুবক ইউনিভার্সিটি ঢুকতে চান। দরজা খুলে দিতে খানিক দেরি হওয়ায় মদ্যপ অবস্থায় তাঁর উপর চড়াও হন সেই যুবক। মারধর করেন বলরামবাবুকে।

অভিযুক্তের নাম অভিষেক সিং। তিনি স্থানীয় তৃণমূল নেতা বিনয় সিংয়ের ছেলে। এই ঘটনার পরই যাদবপুরের চাকরি ছাড়েন বলরামবাবু। একটি এজেন্সির সুবাদে অন্য এক প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তারক্ষীর চাকরি হয় তাঁর। কিন্তু স্বস্তি ক্ষণিকের। কিছুদিনের মধ্যেই বলরামবাবুকে বিদায় নিতে বলেন এজেন্সির কর্মকর্তারা।

ক্ষমতাশালীদের অঙ্গুলি হেলনেই চাকরি গেছে, আন্দাজ করে কোমর বেঁধে মাঠে নামেন তিনি। বিচার চেয়ে চিঠি লেখেন মুখ্যমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়য়ের উপাচার্য সুরঞ্জন দাসের কাছে। লড়াইয়ে পাশে পান বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ছাত্র সংগঠনকেও।

বিতর্ক বেড়ে উঠলে বলরামবাবুর কাছে ফোন যায় খোদ সুরঞ্জন দাসের। উপাচার্য নিজে তাঁকে চাকরিতে পুনর্বহালের আশ্বাস দিয়েছেন। নিরাপত্তাও সুনিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু না। উপাচার্যের আশ্বাসে চিড়ে ভেজেনি। যাদবপুরে আর চাকরি করতেই চান না বলরাম সাহা। তিনি চান সেদিন রাতে তাঁর সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের বিচার। আর অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তারক্ষীর দায়িত্ব।

সোমবার দ্য ওয়ালের তরফে যোগাযোগ করা হয়েছিল বলরাম সাহার সঙ্গে। তিনি জানান, স্বয়ং উপাচার্যের ফোন পেয়ে তিনি খুশি। উপাচার্য নিজে তাঁকে দেখা করতে বলেছেন। কিন্তু নবদ্বীপের বাড়ি থেকে কোভিড বিধিনিষেধ পেরিয়ে এখনই কলকাতা আসা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। খানিক সময় চেয়ে নিয়েছেন তিনি।

ঠিক কী হয়েছিল সেদিন রাতে? বলরামবাবু বলেন, “সেদিন আমি একা ছিলাম না। আমি ছাড়া আরও দুজন ছিলেন। উনি (পড়ুন অভিযুক্ত মলয় সিং) মত্ত অবস্থায় ঢোকেন। আমাদের কাছে জানতে চান, কেন দরজা খুলতে দেরি হয়েছে? দেরি বলতে দু-চার মিনিট দেরি হয়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম, রাস্তার গাড়ি হর্ন বাজাচ্ছে। এরপর আমাদের গালাগালি দিতে শুরু করেন। আমরা কেন মিটিং মিছিলে যাই না, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।” ব্যক্তিগতভাবে তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন বলে দাবি করেছেন বলরাম বাবু।

উল্টোদিকে অভিযুক্ত অভিষেক সিংয়ের বাবা তৃণমূল ঘনিষ্ঠ নেতা বিনয় সিং দ্য ওয়ালকে জানিয়েছেন, গোটা বিষয়টা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। রাজনৈতিক স্তরে তাঁর ভাবমূর্তিতে কালি লাগাতেই এমন অভিযোগ তোলা হয়েছে। তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন তিনি। তাঁর আরও বক্তব্য, অভিযোগের কথা শুনে তিনি নিজে যোগাযোগ করেছিলেন ওই সিকিউরিটি গার্ডের সঙ্গে। বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও চাকরিতে ফিরতে চাননি তিনি।

বলরামবাবুর অভিযোগ, “আমার নতুন চাকরিতে যোগদানের ব্যাপারে জানতে পেরেই বিনয় সিং মহাশয় সিকিউরিটি এজেন্সির সুপারভাইজারকে ফোন করে ভয় দেখান যেন আমাকে কোথাও কাজে না নেওয়া হয়। তাহলে তাদের এজেন্সিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাতিল করে দেওয়া হবে।”

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনের নেতা এসএফআইয়ের শুভায়ন আচার্য মজুমদার বলেন, বলরাম সাহার কথা শুনে আমরা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আমাদের দাবি, এর যথাযথ তদন্ত হোক। কী হয়েছিল সত্যিটা সামনে আসুক। বলরামদা যদি এখানে আসতেন আমাদের সুবিধা হত।

জুন মাসের ৪ তারিখ চাকরি হারিয়েছেন বলরাম সাহা। প্রায় দেড় মাস রোজগার নেই। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষদের কাছে আপাতত তাঁর একটাই অনুরোধ। “এই লকডাউন পরিস্থিতিতে আমার মতো দারিদ্রসীমার নীচে বসবাসকারী মানুষকে কর্মচ্যুত করা অমানবিকতার পরিচয়। আপনাদের কাছে সুবিচার প্রার্থনা করছি।”

You might also like